যুগভেরী, আমিঃ প্রাপ্তিতে ‘বিকল্প মা’
লেখকঃ [আনোয়ার হোসেন রনি ]
দেশের সবচেয়ে প্রাচীন সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘যুগভেরী’ শুধু একটি সংবাদপত্র নয়, এটি একটি ইতিহাস, একটি উত্তরাধিকার। সেই ঐতিহ্যের অংশ হতে পেরেছিলাম বলেই আজও মনে হয়— আমি ধন্য, কৃতার্থ। যুগভেরীতে কর্মরত থাকাকালীন ছুটির দিন কিংবা কাজের ফাঁকে আমি সময় বের করে ‘যুগভেরী’র দীর্ঘ গৌরবময় ইতিহাস সংরক্ষণের কাজে হাত দিয়েছিলাম। কাজটি ছিল অত্যন্ত কষ্টসাধ্য, কিন্তু ভালোবাসা আর সহযোগিতার ঋণ আজও আমাকে কৃতজ্ঞ করে রাখে।
সম্পাদক আমীনূর রশীদ চৌধুরী সাহেবের মতোই তাঁর সহধর্মিণী বেগম ফাহমীদা রশীদ চৌধুরীও ছিলেন আমার পাশে ছায়ার মতো। তথ্য সংগ্রহে যাতে আমি কোনো বাধার সম্মুখীন না হই, সে জন্য তিনি যুগভেরীর প্রধান হিসাবরক্ষক আতিকুল হক চৌধুরী ও অফিস সুপারভাইজার মোহাম্মদ ইসহাক-এর প্রতি বিশেষ নির্দেশ দেন— “আউয়ালকে সবধরনের সহযোগিতা দিতে হবে। জ্যোতিমঞ্জিলের হিসাব শাখার এক কোণে, যেখানে যুগভেরীর পুরোনো ও নতুন সংখ্যাগুলো বাঁধাই করা ভলিউম আকারে সযত্নে সংরক্ষিত ছিল— সেই জায়গাই হয়ে ওঠে আমার কর্মশালা, আমার গর্বের স্থান। কাজের বিরতিতে বেগম ফাহমীদা রশীদ চৌধুরীর স্নেহমাখা আপ্যায়ন, তাঁর চা-নাশতা, মমতাময়ী কথাবার্তা আমাকে যেমন মুগ্ধ করত, তেমনি তাঁর উৎসাহ আর প্রেরণাই আমাকে চালিত করত দিন-রাত পরিশ্রমে।
অবশেষে ২০০১ সালে সেই দীর্ঘ পরিশ্রমের ফসল হিসেবে বাংলা একাডেমির মহান একুশে বইমেলায় প্রকাশিত হয় আমার গ্রন্থ ‘যুগভেরী: একটি বাংলা সংবাদপত্র’। দুঃখ একটাই— সম্পাদক আমীনূর রশীদ চৌধুরী সাহেব বইটির প্রকাশের আগে পরপারে পাড়ি জমান। তবে তাঁর জীবনসঙ্গিনী বেগম ফাহমীদা রশীদ চৌধুরীর আর্থিক অনুদান, যুগভেরীর ‘লোগো’ ব্যবহারের অনুমতি এবং তাঁর লিখিত অনবদ্য ভূমিকা বইটির গুরুত্ব ও ওজন শতগুণে বাড়িয়ে দেয়।
এই ঋণ আমি কোনোদিন শোধ করতে পারব না— মায়ের মতোই তিনি ছিলেন আমার ‘বিকল্প মা’।
মানবিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত ২০০৮ সালের অশান্ত সময়— তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শাসনামলে ‘অপারেশন ক্লিনহার্ট’ চলছিল। নানা অভিযোগে একাধিক সাংবাদিককে গ্রেফতার করা হয়। তাঁদের মধ্যে যুগভেরীর নির্বাহী সম্পাদক, খ্যাতিমান সাংবাদিক ও গবেষক অপূর্ব শর্মাও ছিলেন। সংবাদমাধ্যমে এটি ছিল এক চরম ধাক্কা। এই সময়েই সম্পাদক বেগম ফাহমীদা রশীদ চৌধুরী আমাকে ফোন করে উদ্বেগভরা কণ্ঠে বলেন,“আমার সারাজীবনের অর্জন ধুলোয় মিশে যেতে বসেছে, আউয়াল। তোমাকে এখনই কিছু করতে হবে!”
আমি তখন appena সিলেটে পৌঁছেছি, কিন্তু তাঁর কণ্ঠের তাগিদে সবকিছু ফেলে জ্যোতিমঞ্জিলে ছুটে যাই। তিনি অনুরোধ করেন— “তোমার দৈনিক আজাদের মেয়াদোত্তীর্ণ আইডি কার্ড ও যুগভেরীর আইডি নিয়ে আজই ঢাকায় যেতে হবে। উকিলের সঙ্গে দেখা করে জামিননামায় স্বাক্ষর করতে হবে।”পথের ক্লান্তি ভুলে আমি সেদিনই ঢাকায় ফিরে যাই। পরদিন সকালে উকিলের চেম্বারে গিয়ে প্রক্রিয়া সম্পন্ন করি। ফলাফল— সেদিনই স্নেহভাজন অপূর্ব শর্মার জামিন মঞ্জুর হয়।
এই ঘটনার পর আমি আরও গভীরভাবে বুঝেছি, বেগম ফাহমীদা রশীদ চৌধুরী কেবল একজন সম্পাদক নন, তিনি একজন মমতাময়ী মা।
বিকল্প মা, যিনি সবাইকে আপন করেন যুগভেরীর প্রতিটি কর্মীর প্রতি তাঁর ভালোবাসা ছিল নিঃস্বার্থ, মাতৃসুলভ। তিনি শুধু ‘আমার অপূর্ব’ বলেই থেমে থাকেননি, বরং যুগভেরীর প্রতিটি সদস্যকেই আপন সন্তানের মতো স্নেহে ভরিয়ে দিয়েছেন। এই মহান মহীয়সী নারী— যিনি নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন সাংবাদিকতা, ন্যায়, এবং মানবতার সেবায়— তাঁকে আমি বলি আমার ‘বিকল্প মা’। আমি গর্বিত, আমি যুগভেরী পরিবারের একজন সদস্য।
মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা—মায়ের বিকল্প সেই মহান মমতাময়ী নারী বেগম ফাহমীদা রশীদ চৌধুরীর সুস্থ, সুন্দর, দীর্ঘ জীবন হোক আশীর্বাদে পূর্ণ।
– আ’মিন।
Leave a Reply