মাদকবিরোধী মহা সমাবেশ—দলীয় নেতাকর্মীরাও ছাড় পাবে না: এমপি মিলন
ছাতক সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি:
সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজারে মাদক নির্মূল ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার প্রত্যয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে এক মহা সামাজিক সচেতনতামূলক সমাবেশ। স্থানীয় প্রশাসন ও সুশীল সমাজের যৌথ উদ্যোগে গত শনিবার (১৬ মে) বিকালে উপজেলা অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত এ সমাবেশে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি প্রমাণ করেছে যে মাদকবিরোধী আন্দোলন এখন একটি সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সমাবেশের প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন সুনামগঞ্জ–৫ (দোয়ারাবাজার–ছাতক) আসনের সংসদ সদস্য এবং বিএনপি কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সহ–সাংগঠনিক সম্পাদক কলিম উদ্দিন আহমেদ মিলন। তিনি তার বক্তব্যে পরিষ্কারভাবে ঘোষণা করেন—মাদক ব্যবসা, উৎপাদন বা সেবনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি দলীয় পরিচয়ধারী হলেও কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। তরুণ প্রজন্মকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে হলে রাজনৈতিক, সামাজিক ও প্রশাসনিক প্রতিটি স্তরকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
এমপি মিলন বলেন, “মাদক একটি পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রবিনাশী ব্যাধি। যুবকদের অধঃপতন ঘটে যখন তারা মাদকের ফাঁদে পড়ে। তাদের সুস্থ জীবনধারা ফিরিয়ে আনতে হলে আমরা সবাইকে একটি বড় পরিবার হিসেবে কাজ করতে হবে। দলীয় কর্মী, সমর্থক কিংবা প্রভাবশালী যে-ই হোক—মাদকের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকলে কঠিন ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” তিনি আরও যোগ করেন, “দোয়ারাবাজার–ছাতকবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আমাদের সবার দায়িত্ব। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যদি কঠোর হয়, তবে সমাজের দায়িত্বশীল নাগরিকদেরও সমানভাবে সচেতন হতে হবে।”
সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন দোয়ারাবাজার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অরুপ রতন সিংহ। তিনি সমাবেশের সূচনা বক্তব্যে বলেন, “মাদক নির্মূলের প্রথম ধাপ সচেতনতা। পরিবার থেকে সমাজের প্রতিটি স্তরে যদি নজরদারি বাড়ে, তবে মাদকচক্র যত শক্তিশালীই হোক, তারা টিকতে পারবে না।”
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) রাশেদুল ইসলাম, দোয়ারাবাজার থানার অফিসার ইনচার্জ তারিকুল ইসলাম তালুকদার, জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ও সাবেক চেয়ারম্যান সামছুল হক নমু, আলহাজ্ব আব্দুল বারী, উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আলতাফুর রহমান খছরু, দোয়ারাবাজার উপজেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি মোহাম্মদ কামাল উদ্দিন, উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক হারুন অর রশিদ, সুরমা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হারুন অর রশিদ এবং সমাজসেবক খলিলুর রহমানসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।
বক্তারা একমত প্রকাশ করেন যে শুধু আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কঠোরতা দিয়ে মাদকমুক্ত সমাজ গড়া সম্ভব নয়। এ জন্য প্রয়োজন পরিবারিক সচেতনতা, বিদ্যালয়ে নৈতিক শিক্ষা, সমাজপতিদের সঠিক দিকনির্দেশনা ও গণমাধ্যমের ইতিবাচক ভূমিকা। পরিবারে বাবা–মা যদি সন্তানদের আচরণ পর্যবেক্ষণ করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যদি শিক্ষার্থীদের মাঝে নিয়মিত সচেতনতামূলক আলোচনার আয়োজন হয়, এবং সমাজে যদি সবাই সন্দেহজনক কার্যকলাপের তথ্য প্রশাসনকে সরবরাহ করে—তবে যেকোনো মাদকচক্র দ্রুত ভেঙে ফেলা সম্ভব।
এ সময় দোয়ারাবাজার থানার ওসি তারিকুল ইসলাম তালুকদার বলেন, “আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় আমরা সর্বদা সক্রিয়। তবে মাদকবিরোধী যুদ্ধে পুলিশ–প্রশাসনের পাশাপাশি জনগণের সহযোগিতা ভীষণ জরুরি। সমাজের যেকোনো কোণে কেউ মাদক নিয়ে কাজ করছে এমন তথ্য পেলেই আমাদের জানাতে হবে।”
সমাবেশে অংশগ্রহণকারীরা জানান, সাম্প্রতিক সময়ে মাদক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছিল। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে ইয়াবা, ফেন্সিডিল ও গাঁজা–সেবনের প্রবণতা বৃদ্ধি সমাজে নতুন সংকট তৈরি করছে। তাই এ ধরনের সমাবেশ শুধু অনুপ্রেরণা নয়, বরং একটি প্রয়োজনীয় সামাজিক আন্দোলনের শক্তিশালী বার্তা।
শিক্ষক, সাংবাদিক, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক কর্মী, ব্যবসায়ী, অভিভাবকসহ বিভিন্ন শ্রেণি–পেশার ব্যক্তিদের অংশগ্রহণে উপজেলা অডিটোরিয়ামের পরিবেশ ছিল উৎসাহমুখর। বক্তাদের বক্তব্যে উঠে এসেছে মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে সবাইকে একযোগে এগিয়ে আসার অঙ্গীকার। অনেকেই বলেন, কেবল সরকারি উদ্যোগ নয়, জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণই মাদকবিরোধী আন্দোলনকে আরও কার্যকর করবে।
সর্বশেষ বক্তব্যে এমপি মিলন দোয়ারাবাজার–ছাতকের জনগণকে মাদকবিরোধী অভিযানে সরাসরি ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়ে বলেন, “আজকের এই সমাবেশ শুধু বক্তব্যের নয়—এটি একটি অঙ্গীকারের দিন। আমরা যদি সবাই মিলে দৃঢ় অবস্থান নেই, তাহলে দোয়ারাবাজার–ছাতকের মাটি মাদকমুক্ত হবেই।”
সমাবেশ শেষে অংশগ্রহণকারীরা মাদকবিরোধী শপথ গ্রহণ করেন এবং ভবিষ্যতে নিয়মিত এ ধরনের সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানোর প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
সংবাদদাতা:
Leave a Reply