দোয়ারাবাজারে পাখিদের নীরব অভয়াশ্রম ও সীমান্তের নান্দনিক নদীমোহনা
আনোয়ার হোসেন রনি
দোয়ারাবাজার উপজেলা সদরে কামারপট্টি এলাকা একটি নীরব অভয়াশ্রম। এখানে প্রতিনিয়ত শোনা যায় পাখিদের কুহু কুহু, কিচির মিচির আর বৈচিত্র্যময় সুর। স্থানটি শুধু পর্যটকদের নয়, বরং প্রায় তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে পাখিদের স্থায়ী আবাস। বর্ষাকালে পানকৌড়ি, বকসহ নানা প্রজাতির পাখিরা ডিম পাড়ে, কিন্তু বন সংরক্ষণ ও নজরদারির অভাবে তাদের প্রজনন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ঝড়-বৈরী আবহাওয়ায় ডিমগুলো মাটিতে পড়ে বিনষ্ট হয়।
কামারপট্টির মানুষ দীর্ঘদিন ধরে পাখিদের প্রতি অকৃত্রিম ভালবাসা দেখিয়েছে। মানুষের স্নেহে পাখিরা এখানে ভয় ভুলে যায় এবং গাছে গাছে, ঝিলে নিরাপদে বাস করে। পাখি শিকারীদের অনুপস্থিতি ও মানুষের বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ এলাকার পরিবেশকে মনোরম করেছে। প্রতিদিন বিকেলে সরকারি ও বেসরকারি কর্মকর্তাসহ নানা পেশার মানুষ এখানে পাখি ও প্রকৃতির মিলন দৃশ্য উপভোগ করতে আসেন।
কামারপট্টি ঝিল ও ঘন সবুজে আচ্ছাদিত। সাদা ও সোনালী বলাকা, কালো পানকৌড়ি, কাক ও চিলের অবাধ বিচরণ পরিবেশকে আরও মোহনীয় করেছে। বৈশাখে সাদা ও সোনালী বলাকা গাছের ঢালে বাসা বানিয়ে ডিম পাড়ে। মা পাখিরা ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে ডিমের পাহারায় থাকে।
উপজেলার ইদুকোনা চিলাই নদীর মোহনা ও সীমান্তবর্তী টিলাগুলোও পর্যটকদের মন কাড়ে। ভারতে সীমান্তের দেড়শ’ গজ ভিতরের কাঁটাতারের বেড়ার পাশে সবুজের সমারোহ। ছোট-বড় টিলায় ফলজ ও বনজ গাছ, আঁকা বাঁকা মেটাপথ, চিলাই নদী ও তীরের ঘনবসতি চিত্র দর্শনীয়। পরন্ত বিকেলে ঝিল ও গাছপালায় উড়ন্ত পাখিরা দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে।
খাসিয়ামারা নদীর মোহনাও একটি পর্যটন সম্ভাবনাময় স্থান। নদীর তিন দিকে বাংলাদেশের সীমান্তে ছোট-বড় টিলা, সমতল ভূমি ও পূর্বে ভারতের কালো পাহাড়। নদীর পাশের মাঠগাঁও গ্রামে অসংখ্য টিলা, ঘনবসতি ও সমতল ফসলি জমি। চারপাশে সারি সারি গাছপালা, আঁকা বাঁকা নদীপথ প্রকৃতিকে আরও মোহনীয় করেছে।
সোনালী চেলা নদীর মোহনায় বর্ষায় উত্তাল তরঙ্গ আর শুষ্ক মৌসুমে বিশাল চর, পর্যটকদের মুগ্ধ করে। নদীর উত্তরে ভারতের সুউচ্চ কালো পাহাড়, উজান থেকে নেমে আসা নদী দোয়ারাবাজারের বিভিন্ন এলাকা দিয়ে প্রবাহিত হয়ে সুরমা নদীতে মিলিত হয়। পর্যটকরা এখানে বর্ষা বা শীতকালে নদীর সৌন্দর্য উপভোগ করেন।
জমিদার আমলে নদীর তীরে ছোট-বড় টিলায় কমলা ও লেবুর চাষ হতো। কালের বিবর্তনে চাষাবাদ ও বাগান বিলুপ্ত হয়েছে। শীতকালে বালির চরে কাশফুলের বাগান দর্শনার্থীদের মন ছুঁয়ে যায়। ভোরে সীমান্তবর্তী এলাকায় পাখির কিচির মিচির ও বারকী নৌকার বৈঠার শব্দ পরিবেশকে আরও প্রাণবন্ত করে।
নদী দিয়ে বারকী নৌকায় ভারত থেকে চুনাপাথর আনা হয়। এটি ছাতক সিমেন্ট কোম্পানিতে সিমেন্ট তৈরির কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। শুষ্ক মৌসুমে নদীতে স্থানীয়রা নুড়ি আহরণ ও মাছ ধরেন। নদী ভাঙন ও শুষ্ক মৌসুমে বালি-পলিমাটি ভরাট হওয়ার কারণে নাব্য সংকট দেখা দেয়।
স্থানীয়রা জানান, ঈদ ও বিশেষ দিনে পর্যটকদের ভীড় বেশি থাকে। তবে যাতায়াত ও অবকাঠামোর সমস্যা থাকায় দূরদূরান্ত থেকে পর্যটকরা সহজে আসতে পারেন না। উপজেলা সদর থেকে লক্ষ্মীপুর ইউনিয়নের লেয়াকতগঞ্জ (পশ্চিম বাংলাবাজার) হয়ে মাঠগাঁও ও বোগলাবাজার হয়ে ভাঙ্গাপাড়া পর্যন্ত যাতায়াত ব্যবস্থা উন্নত করলে অঞ্চলটি অন্যতম পর্যটন স্পট হিসেবে পরিচিত হবে।
দোয়ারাবাজারের সীমান্তবর্তী বিভিন্ন পর্যটন এলাকা যেমন বাঁশতলা-হকনগর শহীদ স্মৃতিসৌধ, ইদুকোনা ও বাংলাবাজার ইউনিয়নের পেকপাড়া গ্রাম, লক্ষ্মীপুর ইউনিয়নের খাসিয়ামারা নদীর মোহনা, সোনালী চেলা নদী—সবই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও গ্রামীণ সংস্কৃতির মিলনস্থল। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে পর্যটন স্পটগুলোর শোভা বর্ধন, নিরাপদ যাতায়াত ও আবাসনের ব্যবস্থা করলে দোয়ারাবাজার সত্যিই পর্যটকদের স্বর্গ হয়ে উঠবে।
উপজেলার পাখি ও সীমান্তবর্তী নদী মোহনাগুলো শুধু প্রকৃতির অপরূপ দৃশ্য নয়, বরং শান্তি, প্রাকৃতিক শিক্ষা ও পর্যটন সম্ভাবনার অনন্য কেন্দ্র। প্রতিনিয়ত প্রজাপতি, পাখি ও নদীর জীববৈচিত্র্য দেখে মানুষ মননশীল হয়ে ওঠে। প্রকৃতি, মানুষ ও সীমান্ত মিলিয়ে দোয়ারাবাজার হয়ে উঠছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অমলিন উদাহরণ
Leave a Reply