আজ শান্তার জন্মদিন 🌸
আনোয়ার হোসেন রনি
১২ই অক্টোবর—এক শুভক্ষণ। সেদিন সিলেট শহরের এক সাধারণ পরিবারে জন্ম নিয়েছিলো এক অসাধারণ শিশু, যার নাম আজ দেশের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে এক গর্বের প্রতীক। পিতা-মাতার প্রথম সন্তান, ফুটফুটে সেই কন্যাশিশুর নাম রাখা হয় নাজমা হক, ডাকনাম শান্তা।
শান্তা—যে নামটি আজ সিলেট থেকে ঢাকায়, ঢাকা থেকে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে সংস্কৃতিমনস্ক মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছে। তার জন্ম যেন শুধু এক শিশুর আগমন নয়, ছিলো এক শিল্পী আত্মার আগমন।শৈশব ও শিক্ষা জীবন ছোটবেলা থেকেই শান্তা ছিলেন মেধাবী, শৃঙ্খলাপূর্ণ ও লক্ষ্যনিষ্ঠ। সিলেটের ঐতিহ্যবাহী কিশোরী মোহন বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন তিনি।
সেই সময়ে মেয়েদের উচ্চশিক্ষায় আগ্রহ তেমন ছিল না, তবুও শান্তা নিজের মেধা ও পরিশ্রমে হয়ে ওঠেন সবার অনুকরণীয় উদাহরণ।ম্যাট্রিক পরীক্ষায় পুরো স্কুলে একমাত্র ছাত্রী হিসেবে তিনি ১ম বিভাগে উত্তীর্ণ হন, তাও আবার দুটি লেটার মার্কসহ। এটি শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যই নয়, সিলেটের শিক্ষাক্ষেত্রে এক বিরল ঘটনা ছিল।
সেবছর কুমিল্লা বোর্ডে পাশের হার ছিল মাত্র ৩১% আর সিলেট অঞ্চলে মাত্র ১৯% — এমন কঠিন প্রতিযোগিতার মধ্যেও শান্তা তার সাফল্যের স্বাক্ষর রাখেন অনায়াসে।
কলেজ জীবনে উজ্জ্বল পদচিহ্ন এসএসসি শেষে তিনি ভর্তি হন দেশের অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মুরারিচাঁদ (এমসি) কলেজে।
সেই কলেজেই তার সহপাঠী হিসেবে ছিলেন লেখক নাসির উদ্দিন হেলাল। তিনিই লিখছেন আজ এই ফিচারটি, যিনি শান্তার জীবনকে কাছ থেকে দেখেছেন ছাত্রজীবনের সেই দিনগুলোতে।
লেখকের স্মৃতিচারণে জানা যায়—“কলেজে ভর্তি হবার পর প্রথম সাক্ষাৎ আমাদের মার্চ মাসের ১৮ তারিখে। আমি ছিলাম ‘এ’ সেকশনে, আর শান্তা ‘বি’ সেকশনে। নবীনবরণ অনুষ্ঠানে ‘একটি পয়সা’ নাটকে আমাদের একসাথে অভিনয় করার কথা ছিল, কিন্তু আমার অসুস্থতার কারণে অংশ নিতে পারিনি। আশ্চর্যের বিষয়, অনুষ্ঠানের দিন শান্তাকেও মঞ্চে দেখা গেল না— হয়তো নিয়তির এক অদ্ভুত সংযোগ ছিল সেখানে।” এই ছোট্ট ঘটনা হয়তো অজান্তেই এক গভীর মানবিক বন্ধনের সূচনা করেছিল, যা পরবর্তীতে নাসির উদ্দিন হেলালের স্মৃতিতে এক চিরস্থায়ী জায়গা করে নেয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও সাংস্কৃতিক উত্থান ইন্টারমিডিয়েট শেষে শান্তা ভর্তি হন দেশের সর্বোচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। রোকেয়া হলে থেকে পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি যুক্ত হন সাহিত্য, নাটক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে।
অতুলনীয় সাংগঠনিক দক্ষতা ও নেতৃত্বের কারণে তিনি রোকেয়া হল সংসদের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক নির্বাচিত হন—তাও দুইবার টানা, কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়াই!
এ সময় থেকেই শান্তার সাংস্কৃতিক জীবন নতুন মোড় নেয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মঞ্চ থেকে টেলিভিশন, নাট্যগোষ্ঠী থেকে চলচ্চিত্র—সব জায়গায় তিনি ছড়াতে থাকেন তার সৃজনশীল আলো।
মিডিয়া জগতে শান্তার উজ্জ্বল যাত্রা পড়াশোনার পাশাপাশি শান্তা ধীরে ধীরে প্রবেশ করেন মিডিয়া জগতে। টেলিভিশন নাটক, স্টেজ ড্রামা, উপস্থাপনা—সব ক্ষেত্রেই তিনি রেখে যান নিজের স্বতন্ত্র ছাপ। তার অভিনয় ছিলো মেকি নয়, ছিলো মনের গভীর থেকে উঠে আসা জীবন্ত অনুভূতি। চরিত্রে ডুবে যাওয়ার সেই ক্ষমতা, সংলাপে আবেগের গভীরতা এবং পর্দায় উপস্থিতির গাম্ভীর্য—সব মিলিয়ে শান্তাকে করে তোলে এক ব্যতিক্রমী শিল্পী।
অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি হয়ে ওঠেন দেশের জনপ্রিয় অভিনেত্রীদের অন্যতম। বহু প্রশংসিত নাটক ও প্রযোজনায় তার অংশগ্রহণ আজও দর্শকের স্মৃতিতে রয়ে গেছে।
রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও সম্মাননা তার অভিনয়ের গুণে শান্তা পেয়েছেন একাধিক রাষ্ট্রীয় পুরস্কার ও বৈশিষ্ট্যপূর্ণ সম্মাননা। তবে, পুরস্কার নয়—নিজের কাজের প্রতি দায়বদ্ধতা ও সততা ছিল তার আসল প্রাপ্তি। তিনি সবসময় বিশ্বাস করতেন, “শিল্প মানে শুধু বিনোদন নয়, সমাজ ও মননের উন্নয়ন।” শান্তার এই দর্শনই তাকে অন্যান্যদের থেকে আলাদা করেছে। তার অভিনয়, উপস্থাপনা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে ছিল একধরনের সামাজিক দায়বদ্ধতা, যা আজকের প্রজন্মের শিল্পীদের জন্য এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।
অবসর, কিন্তু অম্লান উপস্থিতি প্রায় ১৬–১৭ বছর আগে শান্তা অভিনয় জগৎ থেকে সরে দাঁড়ান। এরপর ধীরে ধীরে টেলিভিশন উপস্থাপনাতেও বিরতি নেন। আজ তিনি মিডিয়া থেকে সম্পূর্ণ অবসরে, তবে তার অবদান ও উপস্থিতি রয়ে গেছে প্রতিটি প্রজন্মের শিল্পচর্চায়, দর্শকের হৃদয়ে।
অনেক নবীন শিল্পী এখনও তাকে “আইকনিক মেন্টর” হিসেবে দেখেন। কেউ কেউ বলেন—“শান্তা না থাকলে হয়তো আমরা জানতামই না, অভিনয় আসলে কতটা নীরব ত্যাগ আর আত্মসমর্পণের শিল্প।”
এক আইকনিক প্রতিষ্ঠানশান্তা শুধু একজন অভিনেত্রী নন—তিনি এক প্রতিষ্ঠান, এক অনুপ্রেরণা।তার জীবন প্রমাণ করে যে সাফল্যের পথ কেবল গ্ল্যামার বা আলোয় ভরা নয়; বরং তাতে থাকে অধ্যবসায়, নৈতিকতা, এবং আত্মমর্যাদার স্থির উপস্থিতি।
তিনি সিলেটের কন্যা হয়েও নিজ প্রতিভা ও পরিশ্রমে জাতীয় পর্যায়ে নিজের জায়গা তৈরি করেছেন, যা সিলেটবাসীর গর্ব ও বাংলাদেশের মিডিয়া ইতিহাসের এক গৌরবময় অধ্যায়।
শুভ জন্মদিন শান্তা আজ, ১২ অক্টোবর—তার জন্মদিনে আমরা শুধু একজন শিল্পীর জন্মদিনই উদযাপন করছি না, বরং এক অনন্য ব্যক্তিত্বের জীবনযাত্রাকে স্যালুট জানাচ্ছি।জীবনের প্রতিটি অধ্যায়, প্রতিটি ত্যাগ ও সাফল্যের পেছনে রয়েছে এক নিরবচ্ছিন্ন আলোর ধারা—যার নাম শান্তা।
লেখকের ভাষায়—“শান্তা শুধু একটি নাম নয়, সে এক ইতিহাস। সে আমাদের সময়ের সৌন্দর্য, সততা আর শিল্পসত্তার প্রতীক।”
আজকের দিনে শান্তার প্রতি আমাদের একটাই কামনা—
“তোমার জন্মদিন শুভ হোক, বার বার শতবার ফিরে আসুক।”তোমার আলোয় ভবিষ্যতের শিল্পীরা খুঁজে পাক অনুপ্রেরণার পথ।
:নাজমা হক শান্তা—বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র।সময় হয়তো তাকে পর্দার আড়ালে সরিয়ে দিয়েছে, কিন্তু তার প্রভাব ও প্রেরণা আজও সমান দীপ্ত।
শুভ জন্মদিন শান্তা—তুমি থাকো প্রাণে, তোমার শিল্প বেঁচে থাকুক প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।
Leave a Reply