জনবান্ধব ইউএনও তরিকুল ইসলামের
বিদায়ে ছাতকে কান্নার ঢল
ছাতক প্রতিনিধি,
আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচন কমিশনের নির্দেশে গত ৪ ডিসেম্বর দেশের ৪৭ জন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়। সেই তালিকায় নাম আসে সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. তরিকুল ইসলামের। প্রজ্ঞাপন জারির পর থেকেই ছাতকজুড়ে নেমে আসে শোকের আবহ। মাত্র এক বছর এক মাস দায়িত্ব পালন করেই সাধারণ মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছিলেন এই প্রশাসক। তাই তার বিদায়ের খবরে পুরো উপজেলায় ছড়িয়ে পড়ে বিষাদ, কান্না আর প্রিয় অভিভাবককে হারানোর বেদনা।
গত সোমবার (৮ ডিসেম্বর) ছিল ইউএনও তরিকুল ইসলামের ছাতকে শেষ কর্মদিবস। সকালে তিনি অফিসে পৌঁছাতেই উপজেলা পরিষদ চত্বরে হাজারো মানুষের ঢল নামে। কেউ তাকে শেষবারের মতো দেখতে, কেউ বিদায় জানাতে, আর কেউ চোখের জল ধরে রাখতে না পেরে ছুটে যান তার কাছে। সাধারণ মানুষ থেকে জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, সেবা প্রত্যাশী, যুবসমাজ—সবাই তাকে ঘিরে ধরেন শেষ মুহূর্তের বিদায়ে।
“স্যার, আপনি গেলে আমাদের দেখবে কে?” — কান্নাজড়িত মানুষজনের আকুতি শেষ বিদায়ী মুহূর্তে তাকে জড়িয়ে ধরে স্থানীয় অনেকেই কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন,“স্যার, আপনি এত তাড়াতাড়ি চলে যাচ্ছেন কেন? আপনি গেলে আমাদের মতো মানুষদের পাশে দাঁড়াবে কে?”তাদের এই আকুতি শুনে আবেগাপ্লুত হন ইউএনও তরিকুল ইসলামও। বহু মানুষের চোখে দেখা যায় অশ্রুর ঢল। যেন বিদায় নিতে নয়, ছাতকবাসীর মনের ভেতর জমে থাকা কষ্টগুলো শেষবারের মতো উথলে উঠেছিল।
“কখনো খালি হাতে ফেরাননি” — ফকির মানিক মিয়ার স্মৃতি কালারুকা ইউনিয়নের সিকন্দরপুর গ্রামের ফকির মানিক মিয়া জানান,“আমরা যখন যাই, স্যার কখনো খালি হাতে ফেরাননি। আমাকে দু’বার সরকারি ফান্ড থেকে টেউটিন দিয়েছেন, নগদেও সাহায্য করেছেন। কারও হয়রানি হলে সাথে সাথে ব্যবস্থা নিয়েছেন। অসৎ দপ্তরের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন।”তিনি আরও বলেন,“সকল শ্রেণি–পেশার মানুষের সঙ্গে এমনভাবে মিশতেন যে তাকে না দেখে কেউ ফিরতে চাইত না। তার মতো জনবান্ধব, সৃজনশীল আর দায়িত্বশীল ইউএনও হারানো আমাদের জন্য বড় দুঃখ। একজন প্রশাসক নয়—ছাতকবাসীর কাছে অভিভাবক ছিলেন।
২০২৪ সালের ১১ নভেম্বর ছাতক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করেন মো. তরিকুল ইসলাম। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই শিক্ষা, সংস্কৃতি, ক্রীড়া, পর্যটন, ঐতিহ্য সংরক্ষণ, দুর্নীতি প্রতিরোধ ও সামাজিক নিরাপত্তা—সব ক্ষেত্রেই হাত দেন তিনি। তার নেয়া নানা উদ্ভাবনী উদ্যোগে বদলে যেতে থাকে ছাতকের চিত্র।
যেসব উদ্যোগে ছড়িয়ে পড়েন মানুষের হৃদয়ে —স্কুল–কলেজে নৈতিক শিক্ষা কার্যক্রম চালু হারিয়ে যাওয়া সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য পুনরুদ্ধার যুবসমাজকে খেলাধুলায় ফিরিয়ে আনা পর্যটন উন্নয়নে বাস্তব পদক্ষেপ সরকারি সেবায় হয়রানি বন্ধে কঠোর মনিটরিং অসহায়দের জন্য দ্রুত সরকারি ও ব্যক্তিগত সহযোগিতা রাত-বিরাতে জরুরি প্রয়োজন শুনে ব্যবস্থা নেওয়া
মানুষের ভাষায় বলতে গেলে—“দপ্তরে গেলেই দেখা মিলতো তার হাসিমুখ, পরামর্শ আর সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান।”
এমনকি রাত গভীরেও ফোন পেলে তিনি ছুটে যেতেন কোনো অসহায় পরিবারের পাশে। একজন সৎ, নিষ্ঠাবান ও মানবিক প্রশাসকের প্রতিচ্ছবি দায়িত্বের সময় সততা, নিষ্ঠা, নেতৃত্বগুণ আর মানবিক মনোভাবের কারণে তিনি একবার জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ ইউএনও নির্বাচিত হন। এছাড়া পেয়েছেন শুদ্ধাচার পুরস্কারও। তরুণদের উদ্দেশ্যে তিনি প্রায়ই বলতেন—“মানুষ হয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানোই সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। এই নীতিই তাকে ছাতকের মানুষের কাছে অনন্য মর্যাদায় স্থান করে দেয়। বিদায়ের দিন—চায়ের দোকান থেকে বাজার পর্যন্ত একটিই আলোচনা ইউএনও তরিকুল ইসলামের বদলির খবর ছড়িয়ে পড়তেই উপজেলার চায়ের দোকান, রাস্তা, বাজার, মসজিদ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—সবখানে একটিই আলোচনা “আর কিছুদিন থাকলে ছাতক আরও অনেক দূর এগিয়ে যেত। অনেকে বলেন—এ যেন শুধু একজন সরকারি কর্মকর্তার বদলি নয়;
ছাতকবাসীর হৃদয়ে ঝড় তোলা এক মানবিক প্রশাসকের বিদায়।
উপজেলা পরিষদ থেকে বের হওয়ার সময় বহু মানুষ তার হাত শক্ত করে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন। কেউ বলেন “স্যার, আবার আসবেন,” কেউ বলেন “আপনার মতো মানুষ আর পাবো না,” আর কেউ নীরবে চোখের পানি মুছতে মুছতেই তার গাড়ি বিদায় নিতে দেখেন।এক বছরের স্বল্প সময়েও বদলে দিয়েছেন বাস্তবতা অনেকেই মনে করেন, মাত্র এক বছরে তিনি প্রমাণ করেছেন—একজন সৎ, নিষ্ঠাবান এবং মানবিক কর্মকর্তা চাইলে মানুষের জীবন ও প্রশাসনকে বদলে দিতে পারেন।অসহায় মানুষের জন্য সরকারি সহায়তা সহজ করা, বয়স্ক ভাতায় হয়রানি কমানো, কৃষকদের সমস্যায় তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া—এসব কাজ তাকে সাধারণ মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে দেয়।
একজন জনপ্রতিনিধি বলেন—“তরিকুল স্যার ছিলেন ছাতকের চলমান উন্নয়ন অগ্রযাত্রার মূল স্থপতি। মানুষের সেবায় তিনি ছিলেন অকৃত্রিম। তার বিদায় আমাদের জন্য বড় ক্ষতি। ছাতকের মানুষ বলছে—প্রশাসক নয়, একজন প্রিয় মানুষের বিদায় বিদায়ের মুহূর্তে ছাতক উপজেলায় যে কান্নার স্রোত দেখা গেছে, তা খুব কম কর্মকর্তার বিদায় উপলক্ষে দেখা যায়।
একজন নারী বয়োবৃদ্ধা কাঁদতে কাঁদতে বলছিলে“ছেলে হিসাবে পেয়েছিলাম। এখন কার কাছে যাব?”অনেকেই তার বিদায়ী দিনটিকে ‘ছাতকের জন্য ইতিহাসের একটি বেদনার দিন’ বলে আখ্যা দেন। একজন মানুষের চলে যাওয়া—কিন্তু স্মৃতি রয়ে যাবে ছাতকবাসীর হৃদয়ে ছাতকের মানুষের মতে—তরিকুল ইসলাম শুধু দায়িত্ব পালন করেননি, মানুষের জীবনে আলো জ্বালিয়েছেন।
তার মানবিকতা, সততা, সমস্যা সমাধানের ত্বরিত উদ্যোগ, সাধারণ মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা—সবই তাকে করেছে একজন প্রিয় মানুষ, একজন অভিভাবক। তার বিদায় শুধু প্রশাসনিক বদলি নয়,এ যেন এক ভালোবাসার সম্পর্কের বিচ্ছেদ।মানুষের চোখের জলেই প্রমাণ—তিনি কোন স্তরের ইউএনও ছিলেন।####
Leave a Reply