ছাতকে হাওরে কৃষকদের আর্তনাদ:
ক্ষতিগ্রস্ত হাজারো পরিবারে কান্নার রোল
ছাতক (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি
সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার চরমহল্লা ইউনিয়নের চরবাড়ুকা, বাঘাচেরা ও বুরাইগিরি হাওরে বোরো ফসল বিনষ্ট হয়ে যাওয়ায় নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন হাজারো কৃষক পরিবার। আকস্মিক জলাবদ্ধতা, টানা অতিবৃষ্টি ও হাওর রক্ষা বাঁধ নির্মাণে অনিয়ম–দুর্নীতির প্রতিবাদে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের উদ্যোগেই গতকাল শুক্রবার (১ মে) বিকেল সাড়ে ৪টায় অনুষ্ঠিত হলো এক বেদনাবিধুর মানববন্ধন।চরবাড়ুকা গ্রামের পশ্চিম বাঘাচেরা হাওরের পাড়ে হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলন ছাতক উপজেলা কমিটির ব্যানারে আয়োজিত এ মানববন্ধনে অংশ নেন এলাকার সর্বস্তরের মানুষ—ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক, শ্রমজীবী, শিক্ষার্থী, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ থেকে শুরু করে হাওরপাড়ের সাধারণ পরিবার পর্যন্ত। মানববন্ধন এলাকা ছিল কান্না, ক্ষোভ আর দীর্ঘশ্বাসে ভারী।
মাঠে পানি, কৃষকের ঘরে নীরবতা মানববন্ধনে অংশ নেওয়া কৃষকদের অনেকে নিজেদের দুর্দশার কথা বলতে গিয়ে আবেগে ভেঙে পড়েন। তারা জানান—মাঠজুড়ে সোনালি ধানের চাদর বিছানোর কথা ছিল এসময়। কিন্তু সব স্বপ্ন ভেসে গেছে অতিবৃষ্টির পানিতে।কৃষক জসিম উদ্দিন চোখ মুছে বলেন,“এক বছর পরিশ্রম করে ফসল তুলতে পারিনি। ঘরে খাবারও নেই। কিভাবে ঋণ শোধ করবো, সন্তানদের চাল–ডাল কিনবো—তা জানি না।”
ফসল হারানো কৃষক আব্দুল মতিন বলেন,“সরকার সময়মতো ব্যবস্থা নিলে এমন ক্ষতি হতো না। বাধঁ ভাঙে, জল ওঠে—সবই আমাদের ভাগ্য। বছরের পর বছর একই অবস্থা।”এ সময় কৃষক ফয়জুর রহমান, জয়গম্বর, ফয়জুল করিম, মাওলানা নুর উদ্দিন ও রাজ্জাক আহমদসহ আরও অনেকে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণের কারণে প্রতি বছরই হাওরবাসীকে ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে।নেতাদের ক্ষোভ—‘অনিয়মের বিচার চাই’মানববন্ধনের সভাপতিত্ব করেন হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলন ছাতক উপজেলা আহ্বায়ক কমিটির আহ্বায়ক দিলোয়ার হোসেন। সঞ্চালনায় ছিলেন সদস্য সচিব উজ্জীবক সুজন তালুকদার।
প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন সংগঠনের সুনামগঞ্জ জেলা কমিটির সভাপতি রাজু আহমদ। তিনি বলেন,
“বছরের পর বছর ধরে হাওর রক্ষা বাঁধে দুর্নীতি হচ্ছে। পিআইসিতে অযোগ্য লোক বসিয়ে কোটি কোটি টাকা ভাগ-বাটোয়ারা হয়। এই ভোগান্তি আর চলতে পারে না।”বিশেষ অতিথি সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল হক মিলন বলেন,
“এ অঞ্চলের কৃষকরা ধান দিয়ে শুধু নিজেদের পরিবার নয়—সারা দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় অবদান রাখেন। অথচ রাষ্ট্র তাদের প্রাপ্য স্বীকৃতি ও সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে।”সহসভাপতি ওবায়দুল মুন্সি বলেন,প্রতি বছর বৃষ্টি হবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বৃষ্টি হলেই যদি ধান নষ্ট হয়, তাহলে বাঁধ নির্মাণ হচ্ছে কেন? পিআইসিতে যারা অনিয়ম করছে, তাদের বিচার না হলে হাওরবাসীর জীবন আরও বিপর্যস্ত হবে।”
পিআইসি নিয়ে বিস্তর অভিযোগ ছাতক উপজেলা কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক আব্দুর রহমান, সদস্য জামিল হোসেন, খালেদ আহমদ ও জুয়েল আহমদরা বলেন— হাওর রক্ষা বাঁধ নির্মাণে বরাদ্দ অতিরিক্ত দেখানো হয়, ঠিকাদারের সঙ্গে যোগসাজশে কাজের মান কমিয়ে দেওয়া হয়। অনেক সময় বাঁধের ৫০ শতাংশও সঠিকভাবে নির্মাণ করা হয় না।
চরমহল্লা ইউনিয়ন কমিটির আহ্বায়ক ফয়সল আহমদ মাছুম বলেন,
“এই এলাকার বাঘাচেরা, বাড়ুকা ও বুরাইগিরি হাওর দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত। আগামী বছর এই তিন হাওরকে অবশ্যই পিআইসি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।”
হাওরবাসীর ১০ দফা দাবি বক্তারা হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলনের পক্ষ থেকে মানববন্ধনে ১০ দফা দাবি উপস্থাপন করেন— হাওর রক্ষা বাঁধ নির্মাণে অনিয়ম–দুর্নীতি তদন্ত করে সংশ্লিষ্টদের বিচারের আওতায় আনা,ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রণয়ন করে পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ প্রদান, দীর্ঘমেয়াদি টেকসই হাওর–ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা গ্রহণ,বাঁধ ভাঙার আগেই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা জোরদার, স্থানীয় কৃষকদের মতামত নিয়ে পিআইসি গঠন,দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা, নদী খনন কার্যক্রম দ্রুত বাস্তবায়ন, কৃষকদের সহজ শর্তে ঋণসুবিধা
হাওর পর্যটনের নামে অপব্যবহার বন্ধ, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্য ত্রাণ ও পুনর্বাসনকৃষকদের তালিকাভুক্ত করার দাবি মানববন্ধনে কৃষক আবু তালেব, বিলাল, সাকির আহমদ, সজিব, ফয়জুর রহমান, আব্দুল মতিম, নজির, শরিফ, জুয়েল, জসিম, বশির উদ্দিন, মঈন উদ্দিন, শফিকুল রহমান, হানিফ আলী, ইসলাম উদ্দিন, মুজিবুর রহমান, সুহেল আহমদসহ কয়েকশ মানুষ উপস্থিত ছিলেন।
অনেকে বলেন—বছরের পর বছর ধরে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও কৃষকদের সঠিকভাবে তালিকাভুক্ত করা হয় না। যার ফলে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হলেও অনেকে বঞ্চিত হন।
প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলনের নেতারা মানববন্ধনে জানান—হাওরাঞ্চলের কৃষকদের দুর্দশা জাতীয় সংসদে তুলে ধরা এবং ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তার আশ্বাস দেওয়ায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে তারা ধন্যবাদ জানাচ্ছেন।
তারা আশা প্রকাশ করেন—সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নেবে এবং এ অঞ্চলের বিপর্যস্ত কৃষক পরিবারগুলো নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পাবে। হাওরবাসীর শেষ কথা—‘আমাদের বাঁচান’ মানববন্ধনের শেষ দিকে কৃষকদের কান্না ও আর্তনাদে পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। কেউ বলেন—“আমরা ভিক্ষা চাই না, আমাদের অধিকার চাই।”আবার কেউ বলেন—
“এক বছরের হাসি কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতে শেষ হয়ে গেল। এবার আমাদের বাঁচতে হলে সরকারের দ্রুত সাহায্য প্রয়োজন।”চরবাড়ুকা–বাঘাচেরা হাওরপাড়ের মানুষের জীবনের গল্প যেন বছরের পর বছর একই রকম—বাঁধ ভাঙে, পানি আসে, ফসল ডুবে যায়, কৃষক নিঃস্ব হয়। এবারও তার ব্যতিক্রম হলো না।হাওরবাসীর প্রত্যাশা—সরকার ও সংশ্লিষ্ট বিভাগ সত্যিকারভাবে এগিয়ে এলে হয়তো এক সময় বদলে যাবে এই অঞ্চলের কৃষকদের ভাগ্য। তারা অন্তত চান—আগামী বছর আর যেন এমন অমানবিক বিপর্যয়ের মুখে না পড়তে হয়।
Leave a Reply