গীতিকার মুস্তাফিজুর রহমান স্মরণ
এই পৃথিবীর পরে কত
ফুল ফোটে আর ঝরে
কবি ও সাংবাদিক আনোয়ার হোসেন রনি
বাংলা গানের ভুবনে যাঁরা নীরবে, নিরলসভাবে শিল্প ও সংস্কৃতির ভিত নির্মাণ করে গেছেন—গীতিকার মুস্তাফিজুর রহমান তাঁদের অন্যতম শীর্ষ প্রতিনিধি। তিনি ছিলেন এমন এক সৃজনশীল মানুষ, যাঁর জীবন ও কর্ম কেবল গানেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং অনুবাদ, নাট্যরচনা, সাংবাদিকতা, সংগঠন, সাংস্কৃতিক আন্দোলন ও মানবকল্যাণ—সবক্ষেত্রেই ছিল তাঁর সক্রিয় ও প্রভাবশালী উপস্থিতি। ডাকনাম ‘গামা’—বন্ধু-স্বজনের কাছে সহজ ও আন্তরিক—কিন্তু কর্মে ও চিন্তায় তিনি ছিলেন দৃঢ়, আপসহীন এবং প্রগতিশীল এক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব।
জন্ম ও পারিবারিক ঐতিহ্য গীতিকার মুস্তাফিজুর রহমান জন্মগ্রহণ করেন ১৯৩৯ সালের ১ জানুয়ারি, তৎকালীন অবিভক্ত ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলারভগবানগোলা থানার আজমতপুর গ্রামে। তাঁর পরিবার ছিল বিদ্যা ও সংস্কৃতির ঐতিহ্যবাহী ধারক। পিতা কেরামতুল্লাহ সরকার ছিলেন ফরাসি ভাষার সুপণ্ডিত—যা সে সময়ের প্রেক্ষাপটে এক বিরল কৃতিত্ব। তাঁর ছোট পিতৃব্য মৌলভি সামসুদ্দিন আহমেদ উপমহাদেশের প্রথম বাঙালি মুসলমান প্রত্নকলাবিদ ও ঐতিহাসিক হিসেবে সুপরিচিত ছিলেন এবং পাকিস্তানের পুরাতত্ত্ব বিভাগের প্রথম পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এমন এক আলোকিত ও মননশীল পারিবারিক পরিবেশেই মুস্তাফিজুর রহমানের চিন্তা-চেতনায় ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মানবিক মূল্যবোধের বীজ রোপিত হয়।
দেশভাগের অভিঘাত ও রাজশাহীতে নতুন জীবন ১৯৪৭ সালের দেশভাগ তাঁর জীবনে একটি বড় বাঁক নিয়ে আসে। পিতা-মাতার সঙ্গে তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজশাহীতে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। দেশভাগের বেদনা ও উদ্বাস্তু জীবনের অভিজ্ঞতা তাঁকে সংবেদনশীল করে তোলে। রাজশাহী তখন শিক্ষা ও সংস্কৃতির অন্যতম কেন্দ্র—এই শহরই পরবর্তীতে তাঁর সৃজনশীল জীবন, সাংস্কৃতিক আন্দোলন এবং পেশাগত কর্মকাণ্ডের প্রধান আশ্রয় হয়ে ওঠে।
শিক্ষা জীবন ও কৃতিত্ব মুস্তাফিজুর রহমান ১৯৫৩ সালে রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর ঐতিহ্যবাহী রাজশাহী কলেজে ভর্তি হয়ে ১৯৫৫ সালে আইএ এবং ১৯৫৭ সালে বিএ ডিগ্রি অর্জন করেন। শিক্ষাজীবনে তিনি ছিলেন মেধাবী ও মননশীল ছাত্র। এরই ধারাবাহিকতায় তিনি ১৯৬৯ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করে অনন্য কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন—যা তাঁর অধ্যবসায় ও প্রজ্ঞার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
ভাষা আন্দোলন ও রাজনৈতিক সচেতনতা পঞ্চাশের দশকে বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে মুস্তাফিজুর রহমান ছিলেন সক্রিয় অংশগ্রহণকারী। মিটিং-মিছিল, সভা-সমাবেশে তাঁর উপস্থিতি ছিল দৃশ্যমান। ভাষা আন্দোলনের চেতনা তাঁকে ছাত্রজীবন থেকেই অন্যায় ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার করে তোলে। এই চেতনা পরবর্তী জীবনে তাঁর গান, লেখনী ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
শিক্ষকতা ও আইন পেশায় স্বাধীনচেতা সিদ্ধান্ত বিএ পাসের পর তিনি রাজশাহী জেলার চারঘাট স্কুলে কয়েক বছর প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। শিক্ষক হিসেবে তিনি ছিলেন আদর্শনিষ্ঠ ও ছাত্রবান্ধব। পরবর্তীতে আইন বিষয়ে গভীর আগ্রহ থেকে এলএলবি সম্পন্ন করেন। ১৯৬৯ সালে এলএলবি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর তৎকালীন সরকারের পক্ষ থেকে তাঁকে সরাসরি মুন্সেফ (বিচারক) পদে যোগদানের প্রস্তাব দেওয়া হলেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। পরিবর্তে রাজশাহী জজ কোর্টে আইন পেশায় আত্মনিয়োগ করেন—যা তাঁর স্বাধীনচেতা মানসিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
গণ-অভ্যুত্থান ও সাংস্কৃতিক প্রতিবাদ ষাটের দশকের শেষভাগে সামরিক শাসক আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে গণ-অভ্যুত্থানে তিনি সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। এই সময় তাঁর রচিত দেশাত্মবোধক গান ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড আন্দোলনরত মানুষকে উজ্জীবিত করে। তাঁর কাছে গান ছিল নিছক বিনোদন নয়—বরং প্রতিবাদের ভাষা, সংস্কৃতি ছিল সংগ্রামের হাতিয়ার।
সাংবাদিকতা ও বাংলাদেশ বেতারে দায়িত্ব স্বাধীনতার পর তিনি কিছুদিন ঢাকায় সাংবাদিকতা করেন। এরপর ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ বেতার রাজশাহী কেন্দ্রে সহকারী আঞ্চলিক পরিচালক হিসেবে যোগদান করেন। বেতারে তাঁর কর্মজীবন ছিল সৃজনশীলতা ও দূরদর্শিতায় ভরপুর। তাঁর তত্ত্বাবধানে রাজশাহী বেতারে প্রথম লোকসংগীত উৎসব সাফল্যের সঙ্গে অনুষ্ঠিত হয়—যা লোকসংগীত চর্চায় এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। পরবর্তীতে তিনি বাংলাদেশ বেতারের রংপুর, ঢাকা ও চট্টগ্রাম কেন্দ্রে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। দীর্ঘ কর্মজীবনের শেষে ১৯৯৬ সালের শেষদিকে চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র থেকে উপ-আঞ্চলিক পরিচালক হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন।
সাহিত্য-সংস্কৃতি সংগঠন ও আন্দোলন রাজশাহীতে কবি-সাহিত্যিকদের সম্মিলিত প্রয়াসে গড়ে ওঠা ‘উত্তরা সাহিত্য মজলিশ’-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন মুস্তাফিজুর রহমান। ১৯৭৭ সালের জুন মাসে তাঁর সার্বিক তত্ত্বাবধানে রাজশাহীতে প্রথম মাসব্যাপী জাতীয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। তিনি শাহ মখদুম ইনস্টিটিউট ও পাবলিক লাইব্রেরির সহ-সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ওস্তাদ আব্দুল মালেক খান ও ওস্তাদ আব্দুল আজিজ বাচ্চুসহ গুণী শিল্পীদের সঙ্গে নিয়ে তিনি ‘সুরবাণী সংগীত বিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। রাজশাহীতে জেলা শিল্পকলা একাডেমির শাখা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান স্মরণীয়। কথাশিল্পী হাসান আজিজুল হক, কবি আবুবকর সিদ্দিক, অধ্যাপক আলী আনোয়ারসহ অনেক প্রবীণ ও নবীন সাহিত্যিককে নিয়ে তিনি ‘কতিপয় সাহিত্য গোষ্ঠী’ প্রতিষ্ঠা করেন। এখান থেকে তাঁর সম্পাদনায় একাধিক পত্রিকাও প্রকাশিত হয়।
মানবকল্যাণ ও সামাজিক দায়বদ্ধতা ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে যখন উপকূলীয় অঞ্চলে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় নেমে আসে, তখন মুস্তাফিজুর রহমান কবি, শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীদের নিয়ে পথে নামেন। নাটক, গান ও কবিতা পরিবেশনের মাধ্যমে ত্রাণ তহবিল সংগ্রহ করে তা দুর্গত মানুষের সহায়তায় প্রদান করেন—যা তাঁর মানবিক দায়বদ্ধতার উজ্জ্বল উদাহরণ।
শেষ অধ্যায় ও উত্তরাধিকার ১৯৯৮ সালের ১২ ডিসেম্বর এই সংস্কৃতিপ্রাণ মানুষটি ইহলোক ত্যাগ করেন। রেখে যান অগণিত গান, স্মৃতি ও প্রেরণা। ‘এই পৃথিবীর পরে কত ফুল ফোটে আর ঝরে’—এই পঙ্ক্তির মতোই তাঁর জীবন ছিল সত্য, সৌন্দর্য ও মানবিকতার সাধনায় নিবেদিত। গীতিকার মুস্তাফিজুর রহমান কেবল একজন শিল্পী নন—তিনি বাংলা সংস্কৃতির এক অনিবার্য অধ্যায়। তাঁর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।
Leave a Reply