সুফি সাধক আফজল শাহ:
সিলেটি নাগরী সাহিত্যের আলোকবর্তিকা
আনোয়ার হোসেন রনি
বাংলার সংস্কৃতি ও সাহিত্য ঐতিহ্য হাজার বছরের পুরোনো এবং বৈচিত্র্যময়। বাঙালি জীবনের এই বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক ভাণ্ডারে সিলেট অঞ্চলের নিজস্ব স্বকীয়তা বিশেষভাবে উজ্জ্বল। এই অঞ্চলের ইতিহাস ও আধ্যাত্মিক ধারায় সুফি-ফকিররা চিরকাল আলো ছড়িয়েছেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন সুফি সাধক আফজল শাহ ওরফে আরমান আলী। লোকমুখে তিনি পরিচিত ছিলেন “সদায় সোহাগী”, “ললিতা সখী” ও “বড়হুজুর” নামেও। আধ্যাত্মিক সাধনা, মরমী গান ও সিলেটি নাগরী লিপিতে অমূল্য গ্রন্থ রচনা করে তিনি হয়ে উঠেছিলেন বাংলার মরমী সাহিত্যের উজ্জ্বল নক্ষত্র।
নাগরী সাহিত্যে এক আলোকিত নাম বাংলা ভাষা যেমন প্রমিত লিপিতে সমৃদ্ধ, তেমনি সিলেট অঞ্চলে সমান্তরালভাবে চর্চা হতো সিলেটি নাগরী লিপি। এই লিপিতে মূলত রচিত হতো ইসলামী আখ্যান, সুফিবাদ, প্রেম-প্রণয়ের কাহিনি, মরমী গান, বীরগাথা ও সামাজিক উপাখ্যান। এ ধারার অন্যতম সাধক-স্রষ্টা ছিলেন আফজল শাহ। তাঁর অমর সৃষ্টি “নূর পরিচয়” আজও সিলেটি নাগরী সাহিত্যের শ্রেষ্ঠতম নিদর্শন।
নাগরী লিপি আজ অপ্রচলিত, নতুন প্রজন্মের কাছে প্রায় অজানা হলেও এটি পৃথিবীর অন্যতম ব্যতিক্রমী এক নিদর্শন—যেখানে লিপি রয়ে গেছে, অথচ ভাষা হারিয়ে যাচ্ছে। গবেষকদের মতে, নাগরী চর্চা ও প্রকাশ পুনরুজ্জীবিত হলে অজস্র ইতিহাস-ঐতিহ্যের সন্ধান মিলবে।
জীবনপথ ও সাধনার শুরু প্রায় আড়াই শতাব্দী আগে, ১২১৪ বঙ্গাব্দের ১৫ ফাল্গুনে সুনামগঞ্জ জেলার ছাতক উপজেলার ছৈলাআফজলাবাদ ইউনিয়নের শিবনগর গ্রামে জন্ম নেন আফজল শাহ। তাঁর পিতা সিয়ালি শাহ ছিলেন উদাসী স্বভাবের মানুষ, যিনি দীর্ঘদিন এক জায়গায় থাকতেন না। শৈশবেই আফজল শাহ আধ্যাত্মিক পথে দীক্ষা নেন মুর্শিদ হজরত আনজির আলী চিশতিয়া নকশবন্দির কাছ থেকে। টানা ৩৬ বছর তিনি তাঁর পীরের সান্নিধ্যে থেকে জ্ঞান ও সাধনার পাঠ নেন।
পরবর্তীতে তিনি শাহ জহুর দেওয়ান ও শাহনুর দেওয়ানের খেদমতেও সময় কাটান। আধ্যাত্মিক জগতে সিদ্ধিলাভ করার পর জীবনের বাকি সময় তিনি মানুষ ও মানবতার সেবায় উৎসর্গ করেন।
সাধনা, সঙ্গীত ও রচনা আফজল শাহ শুধু সুফি সাধকই ছিলেন না, তিনি ছিলেন এক অসাধারণ কবি ও সঙ্গীতজ্ঞ। রাতের নৈঃশব্দ ভেদ করে ভেসে আসা তাঁর মরমী গানের সুর আজও লোকমুখে শোনা যায়। তাঁর গানে ছিল গভীর আবেগ, মানবপ্রেম, স্রষ্টা-সৃষ্টির মিলনের আকাঙ্ক্ষা।
তাঁর রচিত সাতটি গ্রন্থের মধ্যে “নূর পরিচয়” বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সিলেটি নাগরী লিপিতে রচিত এ গ্রন্থে সৃষ্টিতত্ত্ব, দেহতত্ত্ব, শরিয়ত-মারিফত-হাকিকত-তরিকতের সমন্বয় ঘটেছে। বইটির প্রতিটি অধ্যায় ভরপুর মরমী গান, গজল ও ভাবসংগীতে। গ্রন্থে সংকলিত হয়েছে অন্তত ৬২টি মরমী গান।
অন্যদিকে উর্দু ভাষায় তিনি রচনা করেন “রিসালায়ে মারিফত”। এটি তাসাউফ বিষয়ক প্রশ্নোত্তরধর্মী একটি গ্রন্থ, যা সুফিবাদের উচ্চাঙ্গ তত্ত্ব নিয়ে রচিত। দীর্ঘদিন মাজারে বাক্সবন্দি অবস্থায় থাকা এই গ্রন্থ পরে প্রকাশিত হয়।
নূর পরিচয়ের অনন্য গুরুত্ব”নূর পরিচয়”-এ তিনি লিখেছিলেন—”আব আতশ খাক বাদ কিলা পয়দা হৈলা, শরিয়তের মাঝে তার ছিদরী না করিলা। নূরের মাঝে জমা কথা সবেক বুলয়, এর লাগি পুস্তকের নাম নূর পরিচয়।” এখানে তিনি সৃষ্টির মৌলতত্ত্ব ও আধ্যাত্মিক জীবনের রহস্যময় ব্যাখ্যা তুলে ধরেছেন। শুধু সুফিবাদ নয়, মানবপ্রেম, নারী-পুরুষ সম্পর্ক ও সমাজ জীবনের প্রতিফলনও উঠে এসেছে তাঁর রচনায়।
মাজার ও উত্তরাধিকার আফজল শাহ জীবদ্দশায় সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে বেড়িয়েছেন। কখনও নদীর ধারে, কখনও বনজঙ্গলে তিনি স্থাপন করেছেন ইবাদতের খানা। বলা হয়, তিনি হাওরের মাঝখানে কচুরিপানার উপর শুয়ে বহু বছর কাটিয়েছেন, নদীতে সাঁতার কেটেছেন গভীর রাতেও। পশুপাখির সাথে তাঁর ছিল অদ্ভুত মমতা, তাই তাঁকে অনেকে “সদায় সোহাগী” বলতেন।
১৩৩৪ বঙ্গাব্দের ২ আষাঢ় তিনি ইন্তেকাল করেন। তাঁর দেহ ভটের নদীর পশ্চিমপাড়ের কৃঞ্চনগর হাউলীতে দাফন করা হয়। আজ তাঁর মাজারকে ঘিরে প্রতি বছর অনুষ্ঠিত হয় ওরশ শরীফ। এখানে ভক্তরা সমবেত হয়ে নূর পরিচয়ের পাঠ ও মরমী গান পরিবেশন করেন।
উপেক্ষিত হলেও চিরজীবন্ত যদিও সিলেটি নাগরী সাহিত্যে তাঁর অবদান অনন্য, তবে জীবদ্দশায় প্রচারবিমুখ হওয়ায় যথাযোগ্য মূল্যায়ন পাননি। গুরুসদয় দত্ত বা নির্মলেন্দু ভৌমিকের সংকলিত লোকসংগীত গ্রন্থেও তাঁর কোনো গান অন্তর্ভুক্ত হয়নি। অথচ তাঁর হাতে লেখা নাগরী পান্ডুলিপি আজও গবেষণার অমূল্য সম্পদ।
ড. গোলাম কাদিরের গবেষণায় তাঁর শিষ্য নসীম আলীকে কেন্দ্র করে আলোচনা এলেও মূলত আফজল শাহের নাম উপেক্ষিতই থেকে গেছে। তবে দেশ-বিদেশে, বিশেষত লন্ডন ও ফ্রান্সসহ প্রায় ৪০টি দেশে তাঁর নূর পরিচয় নিয়ে গবেষণা হচ্ছে।
মানবিক দার্শনিক আফজল শাহ ছিলেন সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে। তিনি মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে সকলকে নিজের আধ্যাত্মিক আলিঙ্গনে টেনেছিলেন। তাঁর জীবন ছিল দারিদ্র্যহীন, সরল ও উদার। ভক্তদের কাছে তিনি শুধু ফকির নন, ছিলেন এক আলোকিত দার্শনিক। জাতীয় অধ্যাপক দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ তাঁর “সোনাঝরা দিনগুলো” গ্রন্থে আফজল শাহকে “সদায় সোহাগী” ও “ললিতা সখী” নামে উল্লেখ করে লিখেছেন—“তিনি ছিলেন পাঁচ ফিটের মতো লম্বা, দাড়ি-গোঁফ কামানো, মাথায় সাত খোপা, মেয়েলি ছাদের মতো চেহারা আর আবিষ্ট দৃষ্টির অধিকারী।”
সমাপ্তি বাংলার সুফি ঐতিহ্যে হজরত শাহজালালের (রঃ) স্মৃতিধন্য সিলেটের ভূমিতে অসংখ্য সাধক জন্মেছেন। তাঁদের মধ্যে ফকির আফজল শাহ ওরফে আরমান আলী ছিলেন অন্যতম। তাঁর রচিত নাগরী গ্রন্থ ও মরমী গান শুধু লোকসাহিত্য নয়, বাংলার আধ্যাত্মিক ইতিহাসের মূল্যবান সম্পদ। তিনি আজ নেই, কিন্তু তাঁর গান, তত্ত্বজ্ঞান আর মাজার ঘিরে ভক্তদের ভক্তি আজও প্রমাণ করে—এই মরমী কবি ও সুফি সাধক চিরকাল বেঁচে থাকবেন সিলেটের আকাশে ধ্রুবতারা হয়ে।
Leave a Reply