স্কুলের ক্লাসরুম ও মাঠ যেন জলাধার, হাঁটু পানিতে ঝুঁকিপূর্ণ পাঠদান
গোবিন্দগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতায় দুর্ভোগ, দ্রুত সমাধানের দাবি
ছাতক (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি: দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সাম্প্রতিক বৃষ্টিপাত তীব্র গরম থেকে জনজীবনে কিছুটা স্বস্তি ফিরিয়ে আনলেও সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সেই বৃষ্টি নিয়ে এসেছে চরম ভোগান্তি। টানা এক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতার কবলে পড়ে উপজেলার ছৈলাআফজলাবাদ ইউনিয়নের ৬৭ নম্বর গোবিন্দগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ, খেলার মাঠ, প্রবেশপথ এমনকি আশপাশের এলাকাও পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় শিক্ষার্থীদের পাঠদান ও স্বাভাবিক চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সিলেট-সুনামগঞ্জ আঞ্চলিক সড়কের প্রবেশমুখে অবস্থিত বিদ্যালয়টির মাঠজুড়ে থইথই করছে পানি। যে মাঠে প্রতিদিন শিশুদের খেলাধুলা ও কোলাহলে মুখর থাকার কথা, সেটি এখন যেন একটি বিস্তীর্ণ জলাধারে পরিণত হয়েছে। শুধু মাঠই নয়, কয়েকটি শ্রেণিকক্ষেও প্রবেশ করেছে কাদা ও ময়লা মিশ্রিত বৃষ্টির পানি। ফলে শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক পরিবেশে পাঠ গ্রহণ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি নতুন কোনো সমস্যা নয়। বছরের পর বছর ধরে বিদ্যালয়টিতে সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। বিভিন্ন সময় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হলেও স্থায়ী কোনো সমাধান হয়নি। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সমস্যার তীব্রতা আরও বেড়েছে। বিদ্যালয়ের চারপাশে অপরিকল্পিতভাবে ময়লা-আবর্জনা ও মাটি ফেলে ভরাট করায় পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক পথ সংকুচিত হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিদ্যালয়ের মোট শিক্ষার্থী সংখ্যা ৪৬৭ জন। কিন্তু জলাবদ্ধতার কারণে অনেক শিক্ষার্থী নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসতে পারছে না। অভিভাবকরাও সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন। ফলে উপস্থিতির হার আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী জানায়, বৃষ্টি হলেই স্কুলের মাঠ ও ক্লাসরুমে পানি জমে যায়। সম্প্রতি বিদ্যালয়ে প্রবেশের সময় পা পিছলে পানিতে পড়ে যায় সে। এতে তার বই-খাতা ভিজে নষ্ট হয়ে যায়। একই ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে আরও অনেক শিক্ষার্থী।
চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী আফরিন বলে, “প্রতিদিন হাঁটুসমান পানি মাড়িয়ে স্কুলে আসতে হয়। মাঠে পানি থাকায় আমরা খেলাধুলাও করতে পারি না। অনেক সময় ভয় লাগে।”
বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী রাফির বাবা রফিক সিকদার বলেন, “আমাদের সন্তানদের প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে স্কুলে যেতে হচ্ছে। ছোট ছোট বাচ্চারা কখন পানিতে পড়ে যায়, সেই চিন্তায় সবসময় থাকতে হয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এমন অবস্থা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। দ্রুত মাঠ ভরাট ও পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।”
সরেজমিনে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের প্রবেশপথে জমে থাকা পানির কারণে শিক্ষার্থীদের জুতা হাতে নিয়ে কিংবা খালি পায়ে বিদ্যালয়ে প্রবেশ করতে হচ্ছে। অনেক শিক্ষার্থীকে অভিভাবকদের সহায়তায় পানি পার হয়ে স্কুলে যেতে দেখা গেছে। কিছু কিছু স্থানে পানি ও কাদার কারণে দুর্গন্ধও ছড়িয়েছে। এতে স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বিদ্যালয়ের চারপাশে কোনো সীমানা প্রাচীর না থাকায় আশপাশের বিভিন্ন স্থান থেকে ময়লা-আবর্জনা এসে জমা হয়। বৃষ্টির সময় এসব আবর্জনা পানির প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা তৈরি হয় এবং দীর্ঘ সময় পানি নেমে যেতে পারে না।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোস্তাক আহমদ জলাবদ্ধতার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, “বৃষ্টি হলেই বিদ্যালয়ের মাঠ ও শ্রেণিকক্ষে পানি ঢুকে পড়ে। শিক্ষার্থীদের যাতায়াত চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অনেক শিক্ষার্থী পা পিছলে পানিতে পড়ে যাচ্ছে। বই-খাতা নষ্ট হওয়ার ঘটনাও ঘটছে। এ কারণে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমে গেছে। বিদ্যালয়ের চারপাশে ময়লা-আবর্জনা ফেলে ভরাট করার কারণেও সমস্যা আরও প্রকট হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ ধরনের পরিবেশে পাঠদান চালিয়ে যাওয়া অত্যন্ত কঠিন। আমরা বহুবার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে বিষয়টি এনেছি। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।”
এ বিষয়ে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাহজাহান আহমদ বলেন, “বৃষ্টির কারণে বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে পানি প্রবেশ এবং জলাবদ্ধতার বিষয়টি আমরা জেনেছি। ঘটনাটি গুরুত্বসহকারে খতিয়ে দেখা হবে। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করা হবে।”
ছাতক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মহি উদ্দিন বলেন, “বিদ্যালয়ে জলাবদ্ধতার বিষয়টি সম্পর্কে খোঁজখবর নেওয়া হবে। সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।”
শিক্ষাবিদ ও সচেতন নাগরিকরা মনে করছেন, একটি বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে এমন জলাবদ্ধতা চলতে থাকলে তা শুধু শিক্ষার পরিবেশকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে না, শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে প্রাথমিক স্তরের কোমলমতি শিশুদের জন্য নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
তাদের মতে, বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ উঁচুকরণ, কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা নির্মাণ, পানি নিষ্কাশনের পথ পরিষ্কার রাখা এবং সীমানা প্রাচীর নির্মাণের মাধ্যমে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব। একই সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসন, শিক্ষা বিভাগ ও জনপ্রতিনিধিদের সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে সমস্যাটি বিদ্যমান থাকলেও দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। ফলে প্রতি বর্ষা মৌসুমে একই দুর্ভোগের পুনরাবৃত্তি ঘটে। তারা অবিলম্বে বিদ্যালয়ের জলাবদ্ধতা নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
অভিভাবক ও স্থানীয়দের প্রত্যাশা, কর্তৃপক্ষ দ্রুত বাস্তবসম্মত উদ্যোগ গ্রহণ করবে, যাতে ৬৭ নম্বর গোবিন্দগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ঝুঁকিমুক্ত, সুন্দর ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশে শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পায়। কারণ একটি নিরাপদ বিদ্যালয়ই পারে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুশিক্ষিত ও মানবিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে।
Leave a Reply