সুনামগঞ্জ-৫ আসনে পাঁচ
প্রার্থীর হাড্ডাহাড্ডি প্রতিদ্বন্দ্বিতা
ছাতক সুনামগঞ্জঃ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে সুনামগঞ্জ-৫ (ছাতক–দোয়ারাবাজার) আসনে রাজনৈতিক অঙ্গন ইতোমধ্যেই উত্তপ্ত। রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে প্রতীক বরাদ্দের মাধ্যমে বুধবার বিকেল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী দৌড় শুরু হয়েছে। এবার মাঠে কোনো স্বতন্ত্র প্রার্থী না থাকলেও পাঁচ দলের পাঁচ প্রার্থীর বহুমুখী উপস্থিতিতে পুরো আসনে তৈরি হয়েছে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা।
প্রতীক পাওয়ার পরের দিন বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই প্রার্থীরা প্রচারণায় সরব হয়ে ওঠেন। পোস্টার, ব্যানার, মাইকের প্রচার, উঠান বৈঠক, পথসভা—সব মিলিয়ে ছাতক ও দোয়ারাবাজার উপজেলার রাস্তা ঘাটে এখন টানটান উত্তেজনা। ভোটারদের বড় অংশই বলছেন, “এবারের নির্বাচন হবে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই।” বিশেষ করে শেষ মুহূর্তে বিএনপির দুই গ্রুপ ঐক্যবদ্ধ হওয়ায় ভোটের সমীকরণ উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। সাধারণ ভোটারদের আলোচনায় বিএনপিকে এগিয়ে রাখলেও শেষ পর্যন্ত ফল কী হবে তা নির্ভর করছে মাঠপর্যায়ের প্রচারণা ও ভোটদানের দিনের পরিস্থিতির ওপর।
ধানের শীষ নিয়ে এগোচ্ছেন বিএনপির কলিম উদ্দিন মিলন এ আসনে বিএনপি থেকে ধানের শীষ প্রতীক পেয়েছেন সাবেক তিনবারের সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কলিম উদ্দিন আহমেদ মিলন। ছাতক পৌর এলাকার বাগবাড়ির এই জনপ্রিয় নেতা দীর্ঘদিন ধরে দলের কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। হামলা-মামলা ও কঠিন রাজনৈতিক বাস্তবতায় গত দুই দশকে তিনি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামো শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে কমিটি পুনর্গঠন এবং দলীয় কর্মসূচিতে নিয়মিত উপস্থিতি তাকে তৃণমূলে শক্ত অবস্থানে দাঁড় করিয়েছে। বিএনপি সমর্থকরা তাকে এ আসনের ‘সবচেয়ে শক্তিশালী প্রার্থী’ হিসেবে দেখছেন।
দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে মাঠে জামায়াত-সমর্থিত সালাম মাদানী ১০ দলীয় জোটের প্রার্থী, জামায়াতে ইসলামী–সমর্থিত আবু তাহির মুহাম্মদ আব্দুস সালাম আল মাদানী দাঁড়িপাল্লা প্রতীক পেয়েছেন। দোয়ারাবাজার অঞ্চলে তার সংগঠনিক পরিচিতি থাকলেও বৃহত্তর এলাকায় ভোটারদের মধ্যে নিজস্ব শক্তিশালী ভিত্তি এখনো পুরোপুরি তৈরি হয়নি—এমনটাই মনে করছেন স্থানীয় বিশ্লেষকরা। তবে সাবেক মাদ্রাসা অধ্যক্ষ হিসেবে তার ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা, ধর্মীয় অঙ্গনে সক্রিয়তা এবং প্রচলিত ধর্মভিত্তিক সংগঠনগুলোর সমর্থন তাকে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় টিকিয়ে রাখছে।
দেয়ালঘড়ি প্রতীকে আলোচনায় খেলাফত মজলিসের হাফিজ কাদির এবার প্রথমবারের মতো জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন খেলাফত মজলিসের প্রার্থী হাফিজ মাওলানা মোহাম্মদ আব্দুল কাদির। দেয়ালঘড়ি প্রতীক পাওয়ার পরপরই তিনি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন। কওমি মাদরাসা সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোতে তার গভীর প্রভাব ও নিজস্ব অনুসারী তাকে ভোটের মাঠে শক্ত অবস্থান দিয়েছে। গ্রামে গ্রামে নিয়মিত উঠান বৈঠক, ওয়াজ–মাহফিলসহ বিভিন্ন সামাজিক–ধর্মীয় কার্যক্রমে তার উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য। অনেকেই মনে করছেন, তৃণমূলের নিরব ভোটারদের একটি অংশ তার পক্ষে যেতে পারে।
লাঙ্গল প্রতীকে জাপার কেন্দ্রিয় কমিটির নিবাহী সদস্য জাহাঙ্গীর আলম—হিসেবে বিবেচিত জাতীয় পার্টির একজন সংগঠক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম লাঙ্গল প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। দীর্ঘসময় ধরে ছাতক-দোয়ারাবাজার এলাকায় তিনি সক্রিয় রাজনীতি করে আসছেন। তাঁর সংগঠনিক ভিত্তি ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তাকে এ প্রতিযোগিতায় গুরুত্বপূর্ণ প্রার্থী হিসেবে চিহ্নিত করছে। জাপার স্থানীয় নেতাকর্মীরা বিশ্বাস করেন, গণসংযোগ ও দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত সম্পর্কের জোরে জাহাঙ্গীর আলম এবারের নির্বাচনে তার ভোট ব্যাংক রয়েছে। এনপিপির আজিজুল—যুব ভোটারদের মাঝে গতি এনেছেন ন্যাশনাল পিপলস পার্টি (এনপিপি) থেকে আম প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন মো. আজিজুল হক। দোয়ারাবাজারের নরসিংপুর ইউনিয়নের এই তরুণ প্রার্থী স্থানীয়ভাবে পরিচিত মুখ হলেও জাতীয় রাজনীতিতে নতুন।
এদিকে বিএনপির মনোনিত প্রাথী প্রবীন রাজনীতিবীদ কলিম উদ্দিন মিলন নতুন ভোটারদের যুবক যুবতি,নারী ভোটারদের লক্ষ্য করে তিনি ভিন্নধর্মী প্রচারণার মাধ্যমে দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন।ধানের শীষের পক্ষে লন্ডন,আমেরিকা,সৌদিআররসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রচার প্রচারনা মিটিং মিছিল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর সমথিতরা তৎপরতা তাকে আলোচনায় রেখেছে বহিবিশ্বে মধ্যে।
জোট রাজনীতি ও সমীকরণের জটিলতা সুনামগঞ্জ-৫ আসনটি কেবল বিএনপি বা অন্যান্য দলের প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়—এটি জোট রাজনীতিরও বড় পরীক্ষা। বিএনপির হেভিওয়েট কলিম উদ্দিন মিলন এবং ১০ দলীয় জোটের সালাম মাদানীর সম্পর্ক, ভোটব্যাংকের চরিত্র এবং মাঠপর্যায়ে সমন্বয়ের চিত্র—সবকিছু মিলিয়ে শেষ পর্যন্ত প্রবীন নেতা মিলনের পক্ষে ভোটের জনস্রোত বইবে,বলে একাধিক ভোটাররা সুনিশ্চিত করেন।
এদিকে খেলাফত মজলিসের কাদির ও জাপার জাহাঙ্গীরের সক্রিয় প্রচারণা এবং তৃণমূলে তাদের প্রভাব পুরো সমীকরণকে আরও জটিল করে তুলেছে। ফলে এই আসনে লড়াই কখনও ত্রিমুখী, কখনও চারমুখী হয়ে উঠছে। গ্রামে গ্রামে উঠান বৈঠক, পথসভা, মিছিল ও গণসংযোগ—সব মিলিয়ে সুনামগঞ্জ-৫ আসন এখন নির্বাচনী উত্তেজনায় টগবগ করছেন।
শেষ মুহূর্তের প্রচারণা, দলের অভ্যন্তরীণ সমন্বয়, মাঠপর্যায়ের গণঅংশগ্রহণ এবং ভোটদানের দিনের পরিবেশ—সবকিছু মিলিয়ে সুনামগঞ্জ-৫ আসনের নির্বাচন এখন অনিশ্চয়তার দোলাচলে। প্রতিদ্বন্দ্বিতার এই রুদ্ধশ্বাস লড়াইয়ে বিজয়ের মুকুট পরবেন আর কার ভাগ্যে অপেক্ষা করবে হতাশা—তা জানতে অপেক্ষা করতে হবে নির্বাচনের দিন পর্যন্ত। শেষ হাসি কে হাসবে?
Leave a Reply