বেগম খালেদা জিয়া : রাজনীতির ঝড়ঝাপটা পেরিয়ে মানবিক সংকটের এক দীর্ঘ অধ্যায়
কবি ও সাংবাদিক আনোয়ার হোসেন রনি,
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গন দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে যাদের উপস্থিতিতে সরগরম থেকেছে, তাঁদের অন্যতম বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া।দেশের রাজনীতিতে গণতন্ত্র, আন্দোলন, বিরোধী রাজনীতি ও রাষ্ট্রক্ষমতার পালাবদলের প্রতিটি পর্বেই তাঁর নাম অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে।
কিন্তু জীবনের শেষ প্রান্তে এসে এই নেত্রীকে ঘিরে সবচেয়ে বড় আলোচনার জন্ম দিচ্ছে রাজনীতি —বরং তাঁর মানবিক সংকট, ব্যক্তিগত দুর্দশা এবং তাঁকে ঘিরে রাজনীতির নির্মমতা নিয়ে বিতর্ক। গত কয়েক বছর ধরে গণমাধ্যমে বারবার উঠে এসেছে তাঁর অবনতিশীল শারীরিক অবস্থা, চিকিৎসা সংকট এবং বিদেশে নেওয়ার দাবিকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক টানাপোড়েন। বিভিন্ন সময় বিএনপি, পরিবারের সদস্য, আইনজীবী এবং সমর্থকরা দাবি করেছেন—বেগম জিয়া রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার। সরকার বরাবরই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে—আইনের মধ্য দিয়েই সব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
এসব বিতর্কের মাঝেই আবার নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে অতীতের কিছু রাজনৈতিক পর্ব—যা বিএনপি নেতাকর্মীদের বক্তব্যে পুনরায় গুরুত্ব পাচ্ছে। তাঁদের মতে, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, প্রতিবেশী দেশের চাপ, আভ্যন্তরীণ ক্ষমতার সমীকরণ এবং রাজনৈতিক শত্রুতার জটিল মিশ্রণে আজকের এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।বেগম জিয়ার মানবিক সংকট,তাঁকে ঘিরে বিতর্কিত রাজনৈতিক অধ্যায়,অভিযোগ–প্রতিক্রিয়া,তাঁর পরিবারের ভূমিকা,এবংআজকের বাংলাদেশে তাঁর অনুপস্থিতি কী অর্থ বহন করছে—তার একটি সমন্বিত বিশ্লেষণ।১. এক দীর্ঘ অধ্যায়ের শুরু : আন্দোলন–সংগ্রাম ও বিদেশি কূটনীতির ছায়া বিএনপি নেতাদের বর্ণনা অনুযায়ী, ২০০০–এর দশকের মাঝামাঝি একটি সময় ছিল রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত উত্তাল।
বিএনপি ও আওয়ামী লীগের বিরোধ তখন চরম পর্যায়ে। সেই সময় ভারত–বাংলাদেশ কূটনৈতিক সম্পর্কে নানা অচলাবস্থা দেখা দেয়। বিএনপি নেতারা বলেন—ভারতের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট প্রণব মুখার্জির বাংলাদেশ সফরকে ঘিরে একটি রাজনৈতিক টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়। বিএনপি ও চারদলীয় জোটের নেতাদেরভাষ্যমতে, প্রণব মুখার্জির সফরকালে ঘোষিত হরতাল–ধর্মঘট প্রত্যাহারের জন্য চাপ সৃষ্টি করা হয়। বিএনপি শীর্ষ নেতৃত্ব তখন জানায়—আন্দোলন তাদের পূর্বঘোষিত কর্মসূচি এবং তা বাতিল করার পরিস্থিতি নেই। এই ঘটনা নিয়ে সরকার বা ভারতের পক্ষ থেকে এমন কোনো দাবি সরকারি নথিতে পাওয়া যায় না। তবে বিএনপি সমর্থক মহলে ঘটনাটি দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক প্রতীকে পরিণত হয়ে আছে। তাঁদের মতে, এখান থেকেই শুরু হয়েছিল বেগম জিয়ার প্রতি আন্তর্জাতিক অসন্তোষের সূচনা, যা পরবর্তীতে রাজনৈতিক পরিণতিতে প্রভাব ফেলে।
২. রাজনীতির ঝড় : বাড়ি থেকে উচ্ছেদ, নিরাপত্তা টানাপোড়েন ও মামলা–ঘেরা বছরগুলো ২০০৯–এর পরের সময়টিতে রাজনীতিতে একটানা যেন ঝড় বইতে থাকে। সরকার পরিবর্তনের পর বিএনপি দাবি করে—বেগম জিয়াকে ক্রমাগত রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করার কৌশল নেওয়া হয়। এর মাঝে উঠে এসেছে কয়েকটি পর্যায়—বসবাসের বাড়ি নিয়ে বিতর্ক ঢাকায়ক্যান্টনমেন্টের বাড়িকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক উত্তাপ তুঙ্গে ওঠে। বেগম জিয়াকে বাড়িটি ছাড়তে হয়। সরকার বলে—এটি রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি এবং সরকারের সিদ্ধান্তই কার্যকর করা হয়েছে। বিএনপি এটিকে রাজনৈতিক প্রতিশোধ হিসেবে দেখেছিল।নিরাপত্তা, নজরদারি ও চলাচল সীমাবদ্ধতার অভিযোগ বিএনপির বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁর বাসার চারপাশে বিভিন্নসময় নজরদারি বৃদ্ধি, অতিথিদের প্রবেশে বাধা ইত্যাদি পরিস্থিতি দেখা যায়। সরকার এসব অভিযোগ অস্বীকার করে।
মামলা, চার্জ ও কোর্ট–কানুনের ঘূর্ণি ২০১৫ সালের আন্দোলনের পর বিভিন্ন মামলায় দীর্ঘ সময় আদালত–কেন্দ্রিক জীবন কাটাতে হয় বিএনপি নেত্রীকে। বিএনপির ভাষ্যে—এটি রাজনৈতিক কৌশল ছিল। সরকারের ভাষ্যে—আইন তার নিজস্ব গতিতেই চলেছে। এই সময়ে দেশ-বিদেশে মানবাধিকার সংস্থাগুলোও বিভিন্ন পর্যায়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে। আবার সরকারের অবস্থান ছিল—আইনের শাসনে এক ইঞ্চি ব্যত্যয় হয়নি।
৩. ১৬ বছরের এক মানবিক বেদনার গল্প ২০১৬ থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত বেগম খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্য পরিস্থিতি মারাত্মকভাবে অবনতি ঘটে। লিভার রোগ, কিডনি জটিলতা, ডায়াবেটিসসহ জটিল স্বাস্থ্যসমস্যায় ভুগতে থাকেন তিনি। চিকিৎসকরা বহুবার তাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে নেওয়ার পরামর্শ দেন।
বিএনপির অভিযোগ তাঁকে যথাযথ চিকিৎসা দেওয়া হয়নি বিদেশে নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়নি রাজনৈতিক প্রতিহিংসা তাঁর অসুস্থতার কারণকে জটিল করেছে ইচ্ছাকৃত অবহেলা তাঁর জীবনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ সরকারের প্রতিক্রিয়া
তাঁকে সর্বোচ্চ চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।বিদেশে নেওয়ার আইনি সুযোগ নেই কারা বিধির বাইরে গিয়ে মানবিক বিবেচনায় সরকার অনেক সুযোগ দিয়েছে এই বিপরীতধর্মী দুই অবস্থানের মাঝখানে দাঁড়িয়ে জীবন–মৃত্যুর দোলাচলে কাটিয়ে দিয়েছেন বেগম জিয়া তাঁর জীবনের দীর্ঘ অংশ।
৪. ‘বিষযুক্ত ইনজেকশন’, ‘নির্যাতন’, ‘অত্যাচার’—বিএনপির অভিযোগ ও রাজনৈতিক ব্যাখ্যা.বিএনপি নেতারা বহুবার অভিযোগ করেছেন যে বেগম জিয়ার বিরুদ্ধে অমানবিক আচরণ করা হয়েছে। তাদের অভিযোগের মধ্যে এসেছে—চিকিৎসায় গাফিলতি,অত্যাচার,অনিয়ম রাজনৈতিক নির্যাতন ‘‘বিষযুক্ত ইনজেকশন’’ দেওয়ার অভিযোগ—যা কখনোই সরকারি বা স্বাধীন তদন্তে প্রমাণিত হয়নি। এইসব অভিযোগকে সরকার বরাবরই ভিত্তিহীন বলে উল্লেখ করে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এসব বক্তব্য আসলে দেশের তীব্র রাজনৈতিক মেরুকরণের প্রতিফলন। দুই দলের রাজনৈতিক বয়ান যখন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত বিভক্ত হয়ে পড়ে, তখন প্রতিটি ঘটনাই বিতর্কের জন্ম দেয়। ৫. ভারত–বাংলাদেশ রাজনীতি : অভিযোগ, ব্যাখ্যা ও ভুল বোঝাবুঝির দীর্ঘ ইতিহাস বেগম জিয়ার সমর্থকদের একাংশ মনে করেন—ভারতের প্রতি তাঁর কঠোর অবস্থানের কারণে আন্তর্জাতিক মহল কোনো সময়ই তাঁকে সহানুভূতির চোখে দেখেনি।
তারা বলেন—তিনি ভারতের চাপকে গ্রহণ করেননি জাতীয় স্বার্থে আপসহীন ছিলেন এর প্রতিফলন রাজনৈতিক শত্রুতায় পরিণত হয়েছে। অন্যদিকে কূটনীতিক ও বিশেষজ্ঞরা বলেন—এগুলো রাজনৈতিক বয়ান মাত্র। ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্ক জটিল ও বহুমাত্রিক। কোনো সিদ্ধান্ত একক নেতার বিরুদ্ধে নেওয়া হয়েছে—এমন প্রমাণ পাওয়া যায় না।
তবে বাস্তবতা হলো—এই প্রশ্ন ও বিতর্ক এখনও জনমতের বড় অংশে প্রভাব রাখে।৬. বিএনপির ভেতরকার টানাপোড়েন : ফখরুল–সালাউদ্দিনকে নিয়ে ক্ষোভ বেগম জিয়ার কঠিন সময়ে বিএনপির শীর্ষ নেতাদের অবস্থানকে ঘিরেও প্রশ্ন উঠছে।
সমর্থকদের অভিযোগ—দলের কিছু নেতা ভারতপন্থী অবস্থান নিচ্ছেন দলের মৌলিক অবস্থান দুর্বল হয়ে গেছে। বেগম জিয়ার সংকটে তাঁরা যথেষ্ট ঐক্যবদ্ধ নন। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও সালাহউদ্দিন আহমেদের নাম উল্লেখ করে সমালোচনার ঝড় উঠেছে সামাজিক মাধ্যমে। তবে দলীয় সূত্র বলছে—এসব মন্তব্য ‘‘ব্যক্তিগত ক্ষোভ’’ থেকে আসছে; দল এই বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক অবস্থান নেয়নি।
৭. একমাত্র সন্তান তারেক রহমান—নতুন করে আলোচনায় বেগম জিয়ার সংকটময় সময়টিতে তাঁর ছেলে ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেশে আসা–না আসা নিয়ে গভীর বিতর্ক আছে। সমর্থকদের একাংশ মনে করেন—রাজনৈতিক ঝুঁকি থাকলেও এই মুহূর্তে মায়ের পাশে থাকা কর্তব্য মানবিক দায় রাজনৈতিক হিসাবের ঊর্ধ্বে মায়ের জীবন-মৃত্যুর সময় তাঁকে দেশে ফিরতেই হবে। অন্যদিকে দলের আরেক অংশ বলছে—দেশে ফিরলে তাঁর গ্রেপ্তার নিশ্চিত দলের সংগঠন ব্যাহত হবে। সরকারের কঠোর অবস্থানের ফলে পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক হতে পারে এমন দ্বন্দ্বের মাঝেই প্রশ্ন জেগেছে—মানবিক সম্পর্ক বনাম রাজনৈতিক কৌশল—কোনটি অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত?
৮. দেশের রাজনীতিতে তাঁর অনুপস্থিতি : এক শূন্যতার অনুভব যে নেত্রী দুই দশকের বেশি সময় দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক শক্তির একটি পরিচালনা করেছেন, তাঁর অনুপস্থিতি দেশের রাজনীতিতে বড় ধরনের শূন্যতা তৈরি করেছে। সংসদীয় রাজনীতিতে দ্বিমেরুতা দুর্বল হয়েছে
বিরোধী রাজনীতিতে নেতৃত্বসংকট তৈরি হয়েছে রাজপথে আন্দোলন হারিয়েছে শক্তি বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামো দুর্বল হয়েছে। একক নেতৃত্বের অভাবে দল স্থবির হয়ে পড়েছে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বেগম জিয়ার অনুপস্থিতিতে দেশের রাজনীতিতে যে ভারসাম্য ছিল, তা নষ্ট হয়েছে।
৯. মানবিক দৃষ্টিকোণ : রাজনীতির ঊর্ধ্বে একজন মায়ের দীর্ঘ কষ্ট সব রাজনৈতিক বিশ্লেষণ, বিতর্ক ও হিসাব–নিকাশের বাইরে গিয়ে একটি প্রশ্ন বারবার সামনে আসে—একজন প্রবীণ, অসুস্থ নারী দীর্ঘদিন ধরে নানামুখী সংকটে আছেন—তাঁর জন্য কি আরও মানবিক সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব নয়?.মানবাধিকার সংগঠনগুলো মনে করে—তাঁর বয়স বিবেচনায় সর্বোচ্চ মানবিক সুবিধা নিশ্চিত করা উচিত চিকিৎসার বিষয়ে রাজনীতি করা উচিত নয় মানবিকতা আইনের চেয়েও বড় হতে পারে কিছু সময়ে সাধারণ মানুষও প্রশ্ন তুলছে—রাজনীতির সব হিসাবের বাইরে একজন মায়ের পাশে সন্তানের থাকা কি প্রয়োজন নয়? ১০. উপসংহার : ইতিহাস তাঁকে কীভাবে মূল্যায়ন করবে? বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত কিন্তু প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব।তিনি—তিনবারের প্রধানমন্ত্রী, সেনানীতির কঠিন সময়ের রাজনীতিক,গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী,এবং একই সঙ্গে বহুবিধ অভিযোগ–আলোচনা–বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। কিন্তু আজ তাঁর শয্যাশায়ী অবস্থায় যে করুণ মানবিক সংকট, সেটি ভবিষ্যৎ ইতিহাসের আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব নিয়ে উপস্থিত হবে। বিএনপি, সরকার, আন্তর্জাতিক মহল—সব পক্ষকেই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে জবাব দিতে হবে—রাজনীতির হিসাব–নিকাশে একজন প্রবীণ নেত্রীর প্রতি মানবিক আচরণ নিশ্চিত করা হয়েছিল কি না।সবশেষে—দেশের কোটি মানুষের মতোই সবাই প্রার্থনা করছে—মহান আল্লাহ তাঁর আরোগ্য দান করুন।বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তাঁর অবদান কখনও বিস্মৃত হবে না।
Leave a Reply