প্রতিহিংসার রাজনীতি নয়, এখন সময় সহযোগিতা ও দেশপ্রেমের রাজনীতির
লিখেছেন: আনোয়ার হোসেন রনি ]
বাংলাদেশের রাজনীতি আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে মতাদর্শের ভিন্নতা আর আদর্শের প্রতিযোগিতা জায়গা করে নিয়েছে প্রতিহিংসা, বিদ্বেষ ও বিভেদের রাজনীতিকে। অথচ রাজনীতি মানে তো হওয়া উচিত মানুষের সেবা, সমাজের কল্যাণ, দেশের উন্নয়ন আর মানবতার বিকাশ। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, আজ রাজনীতি অনেকাংশে পরিণত হয়েছে ক্ষমতা দখল আর প্রতিপক্ষকে ধ্বংস করার প্রতিযোগিতায়। ফলে সমাজে তৈরি হচ্ছে বিভক্তি, নষ্ট হচ্ছে ভালোবাসা, হারিয়ে যাচ্ছে বিশ্বাস ও সহমর্মিতা।
প্রতিহিংসার রাজনীতি: জাতির অগ্রযাত্রার প্রতিবন্ধক প্রতিহিংসা কখনো জাতির মঙ্গল বয়ে আনতে পারে না। ইতিহাস সাক্ষী, যখনই রাজনীতি ঘৃণা ও প্রতিশোধের পথে গেছে, তখনই জাতি তার সম্ভাবনা হারিয়েছে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শত্রু ভাবা, মতবিরোধকে বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে দেখা—এমন সংস্কৃতি একটি জাতিকে পিছিয়ে দেয় দশকের পর দশক। আজ আমাদের সমাজে ঠিক সেই দৃশ্যই দৃশ্যমান। একদল অন্য দলকে দেশদ্রোহী বলে, অন্য দল প্রথম দলকে দুর্নীতিবাজ বলে গালমন্দ করে। কিন্তু এই আক্রমণ-প্রতিআক্রমণের মধ্যে হারিয়ে যাচ্ছে সাধারণ মানুষের স্বপ্ন—একটি শান্তিপূর্ণ, সমৃদ্ধ, ন্যায্য বাংলাদেশ গড়ে তোলার স্বপ্ন।
“আমরা সবাই এক দেশের মানুষ” রাজনীতির মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত জনগণের কল্যাণ। আমরা সবাই এক দেশের নাগরিক—আমাদের রক্তে একই দেশের ভালোবাসা, মাটির গন্ধে একই শিকড়ের টান। মতের ভিন্নতা থাকতে পারে, মতাদর্শ ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু হৃদয়ের ভিন্নতা হতে পারে না।
যে রাজনীতি মানুষকে বিভক্ত করে, সে রাজনীতি টেকসই নয়। দীর্ঘ মেয়াদে টিকে থাকে সেই রাজনীতি, যা মানুষকে একত্র করে, ভ্রাতৃত্বের বন্ধন দৃঢ় করে, নাগরিকদের মধ্যে শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস ফিরিয়ে আনে। আজ সময় এসেছে, রাজনীতিতে ‘আমি’ নয়, ‘আমরা’-র চেতনা ফিরিয়ে আনার। ‘আমার আগে আমরা, আমাদের আগে দেশ’—এই বিশ্বাসই পারে একটি জাতিকে সত্যিকার অর্থে এগিয়ে নিতে।
রাজনীতি হওয়া উচিত ন্যায়ের পথে ন্যায়বিচার, সমতা, ও সততার উপর দাঁড়ানো রাজনীতি কখনো বিভক্তি সৃষ্টি করে না। যে রাজনীতি মানুষের মুখে হাসি ফোটায়, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে, শিক্ষার সুযোগ বাড়ায়, স্বাস্থ্যসেবায় সহজপ্রাপ্তি নিশ্চিত করে—সেই রাজনীতিই দেশকে এগিয়ে নেয়।
কিন্তু যখন রাজনীতি পরিণত হয় প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার যন্ত্রে, তখন রাষ্ট্রযন্ত্রও পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে পড়ে। এতে জনগণের আস্থা কমে যায়, গণতন্ত্র দুর্বল হয়, আর সমাজে অন্যায়ের সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। সুতরাং এখন প্রয়োজন এমন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতি, যেখানে সত্য, ন্যায় ও মানবিকতা হবে সর্বোচ্চ মূল্যবোধ। সহযোগিতা, সহানুভূতি ও দেশপ্রেমের রাজনীতি একটি উন্নত সমাজ গড়তে হলে রাজনীতির ভিত্তি হতে হবে সহযোগিতা ও সহানুভূতি। রাজনীতিকরা যদি প্রতিপক্ষকে শত্রু নয়, বরং সহযাত্রী মনে করেন, তবে দ্বন্দ্ব নয়, সৃষ্টি হবে ঐক্য।
সহানুভূতিশীল রাজনীতি মানে হলো—গরিবের পাশে দাঁড়ানো, দুর্দশাগ্রস্ত মানুষের কষ্ট বোঝা, প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠস্বর শোনা। আর দেশপ্রেমিক রাজনীতি মানে—নিজস্ব স্বার্থ ভুলে দেশের স্বার্থে কাজ করা, জনগণের ভালোবাসা অর্জন করা।
আজ বাংলাদেশের রাজনীতিতে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন এই তিনটি গুণ: সহযোগিতা, সহানুভূতি ও দেশপ্রেম।
যুক্তি দিয়ে নয়, ভালোবাসা দিয়ে জয় রাজনীতির আসল শক্তি বন্দুক বা ক্ষমতা নয়, জনগণের ভালোবাসা। রাজনীতিতে যদি বিতর্ক হয়, তবে তা হোক যুক্তির; যদি প্রতিযোগিতা হয়, তবে তা হোক উন্নয়নের; আর যদি প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়, তবে তা হোক জনগণের সেবায় কে বেশি অবদান রাখবে—এই চেতনায়। আজ আমাদের সামাজিক চেতনা হওয়া উচিত ঘৃণা নয়, ভালোবাসার; বিভাজন নয়, ঐক্যের; ধ্বংস নয়, সৃষ্টির। রাজনীতিতে ভালোবাসা ও বিশ্বাস ফিরিয়ে আনলেই মানুষ আবার রাজনীতির প্রতি আস্থা ফিরে পাবে। কারণ, রাজনীতি যখন মানুষের কল্যাণে কাজ করে, তখন সেটাই হয়ে ওঠে সবচেয়ে মহৎ পেশা।
বাংলাদেশ একটি সম্ভাবনার দেশ। এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে প্রয়োজন একটি সহযোগিতামূলক, মানবিক ও দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি। প্রতিহিংসার রাজনীতি আমাদের অন্ধকারে ঠেলে দিচ্ছে, আর ভালোবাসা ও বিশ্বাসের রাজনীতি আমাদের আলোর পথে নিয়ে যাবে। সময় এসেছে নতুন রাজনীতির সূচনা করার—যেখানে থাকবে না ঘৃণা, থাকবে না প্রতিশোধ, থাকবে না বিদ্বেষ; থাকবে কেবল সহানুভূতি, শ্রদ্ধা, যুক্তি ও দেশপ্রেমের আলো।
এই হোক আমাদের রাজনীতির মূল শক্তি, এই হোক আমাদের নতুন সামাজিক চেতনার প্রতীক—বিতর্ক নয়, যুক্তি; ঘৃণা নয়, ভালোবাসা।
Leave a Reply