দুদকের মামলার আসামি হয়েও দুই বছর বহাল
সিলেটে বিউবোর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী শাহাদত আলী এখন কারাগারে!
স্টাফ রিপোর্টার :
দুর্নীতির মামলার আসামি হয়েও প্রায় দুই বছর দায়িত্বে বহাল ছিলেন বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিউবো)তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. শাহাদত আলী। অবশেষে টাঙ্গাইলের একটি আদালতে হাজিরা দিতে গিয়ে জামিন না পেয়ে এখন কারাগারে যেতে হয়েছে তাকে। অথচ দীর্ঘ সময় ধরে তিনি সিলেট অঞ্চলে প্রকাশ্যে দায়িত্ব পালন করেছেন। বিষয়টি ঘিরে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সূত্রে জানা যায়, অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ২০২৪ সালের ১৬ অক্টোবর টাঙ্গাইল দুদক কার্যালয়ের উপসহকারী পরিচালক মো. রবিউল ইসলাম বাদী হয়ে শাহাদত আলী ও তার স্ত্রী কোহিনুর বেগমের বিরুদ্ধে পৃথক দুটি মামলা দায়ের করেন। মামলার অভিযোগে বলা হয়, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী শাহাদত আলী দুদকে দাখিল করা সম্পদ বিবরণীতে প্রায় ৩০ লাখ ৭৯ হাজার টাকার স্থাবর সম্পদের তথ্য গোপন করেন। পাশাপাশি অনুসন্ধানে তার ৪৯ লাখ ৪৭ হাজার ১৫১ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের প্রমাণ পাওয়া যায়। অন্যদিকে তার স্ত্রী কোহিনুর বেগমের নামে ১ কোটি ৫২ লাখ ৪৯ হাজার ১৫১ টাকার অসংগতিপূর্ণ সম্পদের তথ্য পাওয়া যায়। দুদকের অভিযোগ, প্রকৌশলী স্বামীর অবৈধ আয়ের সম্পদ বৈধ করার জন্যই এসব সম্পদ স্ত্রীর নামে রাখা হয়েছিল। অথচ কোহিনুর বেগমের নিজস্ব বৈধ আয়ের কোনো উৎস পাওয়া যায়নি।
এসব অভিযোগে দুদক আইন, ২০০৪ এর ২৬(২) ও ২৭(১) ধারায় পৃথক দুটি মামলা দায়ের করা হয়।
মামলার পরও বহাল চাকরি মামলা দায়েরের পর সাধারণত সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে শাহাদত আলীর বিরুদ্ধে কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেয়নি বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড। বরং তাকে সিলেট অঞ্চলে দায়িত্ব দিয়ে বদলি করা হয়। সেখানে তিনি তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ফাইলে স্বাক্ষর করে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছিলেন। ২০২৬ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্তও তাকে সিলেট মহানগর এলাকায় নিয়মিত অফিস করতে দেখা গেছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, মামলার বিষয়টি অনেকেই জানতেন, কিন্তু কোনো প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হয়নি।
গোপনে আদালতে হাজিরা! এ ঘটনার নাটকীয় মোড় আসে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে। ২০২৬ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি গোপনে সিলেট থেকে টাঙ্গাইলের বিশেষ জজ আদালতে হাজিরা দিতে যান শাহাদত আলী। আদালতে জামিন আবেদন করলে বিচারক তা নাকচ করে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। এরপর কয়েকদিন ধরে গুঞ্জন ছড়ায়, তিনি নিখোঁজ। এক সপ্তাহ পর সিলেটের বিউবো কর্মকর্তারা জানতে পারেন, দুর্নীতির মামলায় তিনি কারাগারে আছেন। মিডিয়ায় নীরবতা এ ঘটনা ঘিরে সিলেটের সাংবাদিক মহলেও নানা আলোচনা শুরু হয়েছে। স্থানীয় অনেক সাংবাদিকের দাবি, বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের একটি অংশের প্রভাবশালী কর্মকর্তারা বিষয়টি আড়াল করার চেষ্টা করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
বড় সিন্ডিকেটের অভিযোগ ! অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, বিদ্যুৎ খাতের বিভিন্ন প্রকল্প ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ওই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে প্রকল্প অনুমোদন থেকে শুরু করে বিল ছাড় পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি ধাপে ঘুষ লেনদেন হতো। সূত্র জানায়, একটি বিদ্যুৎ প্রকল্প হাতে নেওয়া থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত অন্তত ২০টি ধাপে টাকা দিতে হতো। এর মধ্যে ছিল— পরিকল্পনা অনুমোদন সাইট নির্বাচন জমি ক্রয় যন্ত্রপাতি অনুমোদন দরপত্র প্রক্রিয়া কমিশনিং বিল অনুমোদন ও ছাড় প্রতিটি ধাপেই সংশ্লিষ্ট সিন্ডিকেটের সদস্যদের মোটা অঙ্কের টাকা দিতে হতো বলে অভিযোগ রয়েছে। ২ হাজার ৫৩ কোটি টাকার বিউবো প্রকল্পের রয়েছে ব্যাপক লুটপাট অনিয়ম বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের বিভিন্ন প্রকল্প ঘিরে কয়েক হাজার কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগও সামনে এসেছে।
অনুসন্ধান সূত্রে জানা গেছে, আলোচিত সময়ে শতাধিক কোম্পানির মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে। এসব লেনদেনের বড় অংশই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হতো। এতে জড়িত ছিলেন বিদ্যুৎ খাতের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা, রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি ও ব্যবসায়ী।
তদন্তে চাঞ্চল্যকর তথ্য দুদকের একটি উচ্চপর্যায়ের সূত্র জানিয়েছে, তদন্তে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। তদন্তে বলা হয়েছে, বিদ্যুৎ খাতের বিভিন্ন ক্রয়, প্রকল্প অনুমোদন, পদায়ন ও পদোন্নতির ক্ষেত্রেও সিন্ডিকেট প্রভাব বিস্তার করত। এমনকি বিভিন্ন কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদে পদ পেতেও বড় অঙ্কের টাকা লেনদেন হতো।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ সিন্ডিকেটের কারণে বিদ্যুৎ খাতে দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম ও দুর্নীতির সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। প্রশ্নের মুখে প্রশাসন একজন সরকারি কর্মকর্তা দুদকের মামলার আসামি হওয়ার পরও কীভাবে দুই বছর দায়িত্ব পালন করেছেন—এ প্রশ্ন এখন আলোচনায়।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এর পেছনে প্রশাসনিক দুর্বলতা কিংবা প্রভাবশালী মহলের আশ্রয় থাকতে পারে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের ভেতরেও এখন এ নিয়ে তীব্র আলোচনা চলছে।
দুদকের অবস্থান দুদক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মামলার তদন্ত চলমান রয়েছে। তদন্তে নতুন তথ্য পাওয়া গেলে আরও ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। দুদকের একজন কর্মকর্তা বলেন, “দুর্নীতির বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান কঠোর। তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত তথ্য বেরিয়ে আসবে। সামনে কী বিশ্লেষকদের মতে, বিদ্যুৎ খাতের বড় বড় প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো আবারও সেই চিত্র সামনে এনেছে। তাদের মতে, প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা না বাড়ালে এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত না করলে এ ধরনের ঘটনা বন্ধ হবে না।
Leave a Reply