পানিশূন্য নদীর বুকে ধান চাষ
ছাতকে ১০ নদী শুকিয়ে এখন ধু-ধু বালুচর—
দেড়শ বছরের নৌ–বন্দর আজ মৃত্যুশয্যায়
আনোয়ার হোসেন রনি, ছাতক (সুনামগঞ্জ)
একসময় থৈথৈ পানির দেশ ছাতক। নৌকার পাল–হাল, পাথরবাহী কার্গো, রাতদিন চলাচলের জলপথ—সবই ছিল এই অঞ্চলের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও মানুষের জীবনের প্রধান অবলম্বন। সেই ছাতক আজ দাঁড়িয়ে আছে ভয়াবহ পরিবেশ–বিপর্যয়ের সামনে। এক নয়, ছাতকের ১০টি নদীই এখন পানিশূন্য। সুরমা, ইছামতি, চেলা, ধলাই, পিয়াইন, বটের, তেতইখালি, মাকুন্দা, ডাউকা, রত্না—সব নদীই হারিয়েছে নাব্যতা; নদীর বুকজুড়ে এখন ধু–ধু বালুচর।
নদী নয়, যেন বিশাল কৃষিক্ষেত্র সরাসরি দেখা যায়—কখনো যেসব নদীর বুক দিয়ে প্রবাহিত হতো ঠাণ্ডা স্রোত, সেসব জায়গা এখন সবুজ–হলুদ কৃষিক্ষেত্র। নদীর মাঝেই জেগে ওঠা চরে বোরো ধান, গম, ভুট্টা, সরিষা, চিনাবাদাম, মসুর—নানা ফসল চাষ করছেন স্থানীয় কৃষকরা। এ যেন নদীর বুকেই নতুন জীবনধারা। কৃষকদের দাবি—নদীতে পানি নাই, জমি নাই; নদীর জেগে ওঠা চরে চাষাবাদই তাদের টিকে থাকার শেষ আশ্রয়।
নোয়াপাড়া গ্রামের কৃষক আমির আলী বলেন,এই নদীতে একসময় নৌকা চলত, গোসল–বাজার–চাষাবাদ—সবই এই নদীর পানিতে হতো। আজ নদীটা মরা খাল। পলি জমে চর—আমরা এখন সেই চরে ধান লাগাই। সংসার তো চালাতে হবে।”ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে—গভীর নলকূপেও পানি নেই
নদীগুলো শুকিয়ে যাওয়ার ফলে সবচেয়ে বিপদে পড়েছেন কৃষক ও সাধারণ মানুষ। পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ভয়াবহভাবে নেমে গেছে। অনেক এলাকায় গভীর নলকূপেও পানি উঠছে না।।ফলে বোরো মৌসুমে সেচ সঙ্কট, উঁচু জমিতে চাষাবাদ প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।কৃষি বিভাগের তথ্যমতে—খরার সময় চরাঞ্চলে ধান চাষ বাড়লেও এটি স্থায়ী সমাধান নয়; নদী মরে গেলে কৃষিও মরবে।
দেড়শ বছরের নৌ–ঐতিহ্য আজ মৃত্যুপথযাত্রী।১৮৬১ সালে ছাতক–গোবিন্দগঞ্জ নৌ–বন্দর চালুর পর এই অঞ্চল ছিল দেশের অন্যতম ব্যস্ত বাণিজ্যকেন্দ্র। ষ্টিমার, পালতোলা নৌকা, লঞ্চ, কার্গো—সবই চলত দিনরাত। রাজধানী থেকে সুনামগঞ্জ, কোম্পানীগঞ্জ, বিশ্বনাথ—সব জায়গার যোগাযোগের প্রাণ ছিল নদীপথ।।আজ সেই বন্দরের বুকজুড়ে চর। নৌপথ বন্ধ হয়ে গেছে শীত এলে। বর্ষায় আবার উল্টো স্রোত—ভাঙন।
গণ্যমান্য ব্যক্তিরা বলছেন—“নৌ–বন্দর মরলে ছাতক মরবে।”
২৫ হাজার শ্রমিক বেকার—থেমে গেছে ভাগ্যের চাকা
ইছামতি, ধলাই, চেলা, সোনাই, উৎমা, কাটা গাংসহ সীমান্তের নদীগুলোতে পাথর উত্তোলনে নিয়োজিত প্রায় ২৫ হাজার বারকি শ্রমিক শীত এলেই বেকার হয়ে পড়েন।
যে নদীপথে একসময় রাতদিন পাথরবাহী নৌকার সারি থাকত, আজ তা ফাঁকা বালুচর।
শ্রমিকরা বলছেন—নদী শুকাইলে কাজ নাই, খাওয়া নাই। ছাতকের মানুষ নদীর ওপরেই নির্ভরশীল। নদী নাইলে আমরা বাঁচুম কেমনে?”উজানে মেঘালয়ের বাঁধ—বাংলাদেশে ভয়াবহ প্রভাব স্থানীয়দের মতে, সমস্যার বড় উৎস সীমানার ওপারে উজানে। মেঘালয়ে একের পর এক নতুন সেচ প্রকল্প ও বাঁধ দেওয়ায় বর্ষার পানি দ্রুত নামে না, শুষ্ক মৌসুমে আবার প্রবাহ কমে যায়। এর সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব পড়েছে ইছামতি, চেলা, সুরমা, মাসিং, পিয়াইন ও বটের নদীতে।
ফলে নদীর নাব্যতা কমে যাচ্ছে, জেগে উঠছে চর, বন্ধ হচ্ছে নৌ–চলাচল।
বটের খাল নদী—আজ মরা নদীর তালিকায় ছাতকের প্রাণ বটের খাল, দৈর্ঘ্য ২৯ কিমি, প্রস্থ ৭৭ মিটার—বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের হিসাবে উত্তর–পূর্বাঞ্চলের নদী নং ৫৩।
কিন্তু আজ—উজানে বাঁধ পাহাড়ি টিলায় নির্বিচারে গাছ কাটা
কয়লা উত্তোলনের অনিয়ম বেপরোয়া দখল–দূষণ
নদী থেকে অনিয়ন্ত্রিত বালু উত্তোলন সব মিলিয়ে নদী তার প্রায় অর্ধেক গভীরতা হারিয়েছে। বহু বছর ধরে হয়নি খনন।
বিনন্দেপুর, নোয়াপাড়া, কৃষনগরসহ বহু এলাকায় নদীর বুকজুড়ে বিশাল চর। বর্ষায় ভাঙন—শীতে বালুচর—মানুষের জীবন একেবারে বিপর্যস্ত। মানুষের ক্ষোভ—“নদী রক্ষা আন্দোলন নিস্তব্ধ কেন?”।কয়েক বছর আগেও এনজিও, পরিবেশবাদী সংগঠন, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা—সবাই সোচ্চার ছিলেন পানি আগ্রাসন নিয়ে। এখন সব নিস্তব্ধ।
মানুষ বলছে—“কার স্বার্থে থেমে গেল নদী বাঁচানোর আন্দোলন?” জলাবদ্ধতায় কৃষি–বাসস্থান–যাতায়াত বিপর্যস্ত
নদী ভরাট হওয়ার ফলে বর্ষায় পানি নেমে যেতে পারে না। জমিতে পানি দাঁড়িয়ে থাকে সপ্তাহজুড়ে।
ফলাফল—ধান ও সবজি নষ্ট চলাচলের পথ ডুবে যায়
অনেক সময় বাড়িঘরে ঢুকে পড়ে পানি তৈরি হয় খাদ্য নিরাপত্তা সংকট ঝুঁকছে কৃষি–অর্থনীতি—ঝুঁকছে মানুষের জীবন। সুরমা—বাংলাদেশ–ভারতের শেয়ার করা নদী, আজ অস্তিত্ব সংকটে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, উত্তর–পূর্বাঞ্চলের নদী নং ৮৩ সুরমা নদী একসময় সিলেট–সুনামগঞ্জের প্রধান নদীগুলোর অন্যতম ছিল। আজ সেই নদীও পানি হারিয়ে অস্তিত্ব সংকটে।
বিশেষজ্ঞদের মতে—“উজানের বাধ ও পলি–পতন সুরমাকে মৃতপ্রায় নদীতে পরিণত করছে।” খাল খনন এখন বিলাস নয়—জীবন বাঁচানোর পূর্বশর্ত উন্নয়ন বিশেষজ্ঞরা বলছেন—সময় নষ্ট করার আর সুযোগ নেই। নদী–খাল পুনঃখনন না করলে—
ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আরও নিচে নামবে বোরো আবাদ বড় বিপর্যয়ে পড়বে শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট ভয়াবহ হবে
বর্ষায় জলাবদ্ধতা বাড়বে ছাতকের গ্রামীণ অর্থনীতি ধসে পড়বে
সাধারণ মানুষ বলছে—নদী মরে গেলে ছাতক মরবে। এখন শুধু একটাই দাবি—নদী খনন করুন, বন্দর বাঁচান।”
নতুন আশার আলো—নদী পুনরুদ্ধারের নির্বাচন ইশতেহার
সম্প্রতি বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে নদী ও খাল পুনরুদ্ধারের কথা বলা হয়েছে। এতে গ্রামীণ মানুষের মাঝে নতুন আশা জেগেছে।
কিন্তু জনগণের প্রশ্ন—“প্রতিশ্রুতি কি মাঠে নামবে, নাকি নদীর সাথে সাথে প্রতিশ্রুতিও শুকিয়ে যাবে?” জনদাবি—মাননীয় এমপি মহোদয়ের দ্রুত পদক্ষেপ সমস্ত সংকটময় পরিস্থিতিতে স্থানীয়দের সবার দাবি একটাই—মাননীয় এমপি দ্রুত ব্যবস্থা নিন।
খাল ও নদী পুনঃখনন হলে—বর্ষার পানি স্বাভাবিকভাবে প্রবাহিত হবে কৃষিজমি ফিরে পাবে উর্বরতা ঘুরে দাঁড়াবে গ্রামীণ অর্থনীতি ফিরে আসবে নৌ–ঐতিহ্য
বাঁচবে নদীপাড়ের লাখো মানুষের জীবন একজন বয়স্ক কৃষক বলেন—“নদীই আমাদের জীবন। নদী যদি বাঁচে—আমরা বাঁচব।”
Leave a Reply