স্মৃতির আয়নায় অমলিন: পীরে কামেল হযরত মাওলানা শাহ মোহাম্মদ আব্দুল কাহ্হার (রহ.)
আনোয়ার হোসেন রনি
সময়ের প্রবাহে অনেকেই হারিয়ে যান, কিন্তু কিছু মানুষ থেকে যান ইতিহাসের অমর অধ্যায়ে—জ্ঞান, প্রজ্ঞা, আধ্যাত্মিকতা ও মানবতার আলো ছড়িয়ে। তেমনই একজন প্রজ্ঞাবান ও বিশুদ্ধ আত্মার অধিকারী ছিলেন পীরে কামেল হযরত মাওলানা শাহ মোহাম্মদ আব্দুল কাহ্হার (রহ.), যিনি শুধু একজন আলেম নয়, ছিলেন উপমহাদেশের এক বিশিষ্ট চিন্তাবিদ, ভাষাবিদ ও আধ্যাত্মিক সাধক। তাঁর শিক্ষা, পাণ্ডিত্য ও জীবনাচরণ আজও অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে আছে উত্তরসূরীদের কাছে।
শিক্ষাজীবনের দীপ্ত অধ্যায়
অবিভক্ত ভারতবর্ষের এক উজ্জ্বল যুগে, যখন ধর্মীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সমন্বয়ে নতুন চিন্তার বিকাশ ঘটছিল, তখন মাওলানা শাহ মোহাম্মদ আব্দুল কাহ্হার তাঁর অসাধারণ মেধার স্বাক্ষর রাখেন। তিনি তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বিখ্যাত কলিকাতা আলিয়া মাদ্রাসা—যা বর্তমানে আলিয়া ইউনিভার্সিটি, নিউ টাউন, কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ—থেকে ফার্স্ট ক্লাস সেকেন্ড হয়ে টাইটেল ডিগ্রি অর্জন করেন।
তাঁর সহপাঠী ছিলেন মাওলানা হরমুজ উল্লাহ সায়েদা সাহেব, যিনি পরবর্তীতে সিলেট সরকারি আলিয়া মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। শিক্ষাজীবনের সেই সময়টা শুধু একাডেমিক উৎকর্ষের নয়, ছিল আত্মিক বিকাশেরও। আব্দুল কাহ্হার (রহ.) জ্ঞানের গভীরে যেমন নিমগ্ন ছিলেন, তেমনি চরিত্র ও বিনয়ে ছিলেন অনন্য।
কর্মজীবনের শুরু: শিক্ষকতা ও বিচারজগতে পদার্পণ উচ্চশিক্ষা শেষে তিনি যোগ দেন কলিকাতা ইসলামিয়া কলেজে, যেখানে উর্দু ভাষার প্রভাষক হিসেবে তাঁর শিক্ষকতা জীবনের সূচনা হয়। ভাষা ও সাহিত্যপ্রেম তাঁকে একদিকে যেমন ছাত্রদের প্রিয় শিক্ষক করে তুলেছিল, অন্যদিকে তৈরি করেছিল একজন ব্যাখ্যাকার—যিনি ভাষার মাধ্যমে ধর্ম, দর্শন ও মানবিক মূল্যবোধকে ব্যাখ্যা করতে পারতেন সহজবোধ্যভাবে।
পরবর্তীতে তিনি কলিকাতা গোলাবাড়ি থানায় সরকারি কাজী (বিবাহ রেজিস্ট্রার) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। প্রশাসনিক দায়িত্বের পাশাপাশি তিনি যোগ দেন কলিকাতা জুরি বোর্ডের বিচারকমণ্ডলীতে, যেখানে তাঁর ন্যায়বোধ ও বিচক্ষণতা প্রশংসিত হয় সর্বমহলে। তাঁর জীবনের এই অধ্যায় প্রমাণ করে, ইসলামী শিক্ষার পাশাপাশি তিনি বাস্তব প্রশাসনিক ও সামাজিক ক্ষেত্রেও ছিলেন কর্মদক্ষ ও সৎ।
আধ্যাত্মিক জীবন ও তরিকতের দীক্ষা মাওলানা শাহ আব্দুল কাহ্হার (রহ.) ছিলেন অন্তরে সূফি, যিনি শরীয়ত ও তরিকতের সমন্বিত সাধনায় বিশ্বাসী ছিলেন। প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞানকে তিনি ব্যবহার করতেন মানব আত্মাকে আলোকিত করার পথে। তাঁর তরিকতের মূল শিক্ষা ছিল—ভালোবাসা, বিনয় ও মানবসেবা।
কলিকাতায় অবস্থানকালে তিনি বহু অনুসারী ও মুরীদ অর্জন করেন, যারা তাঁর কাছ থেকে কুরআন-হাদীসের জ্ঞানই শুধু নয়, আত্মিক প্রশান্তির পাঠও গ্রহণ করতেন। তিনি নিয়মিত দাওরায়ে তাফসির ও দরসের মাধ্যমে ছাত্র-তালিবানদের নৈতিক উন্নতির দিকেও দৃষ্টি দিতেন।
মানুষের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল আন্তরিক ও বন্ধুত্বপূর্ণ। ধর্মের নামে বিভাজন নয়, বরং একতা ও নৈতিকতার আলোয় সমাজকে আলোকিত করাই ছিল তাঁর মিশন।
কলিকাতায় সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক সান্নিধ্য
মাওলানা কাহ্হারের কলিকাতা জীবন শুধু ধর্মীয় পরিমণ্ডলে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি ছিলেন সংস্কৃতিমনস্ক ও চিন্তাবিদ শ্রেণির সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগে থাকা এক আলোকিত মানুষ।
তাঁর অন্যতম সৌভাগ্য ছিল বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম-এর সান্নিধ্য লাভ করা। নজরুলের সাহিত্যিক বলিষ্ঠতা ও ইসলামী ভাবধারার প্রতি মাওলানার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল সমান শ্রদ্ধাশীল। দুজনের মধ্যে বহুবার ধর্ম, সমাজ ও জাতিসত্তা নিয়ে আলোচনার স্মৃতি সংরক্ষিত আছে তাঁর উত্তরসূরীদের কথায়।
তাছাড়া তিনি মাওলানা আবুল কালাম আজাদ-এর সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ ছিলেন—যিনি ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন, ইসলামি চিন্তা ও সাংবাদিকতায় এক ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব। এইসব মহৎ ব্যক্তিদের সংস্পর্শে এসে আব্দুল কাহ্হার (রহ.)-এর চিন্তার জগতে নতুন মাত্রা যোগ হয়। তিনি বুঝেছিলেন, ইসলাম কেবল রীতিনীতির ধর্ম নয়, এটি জ্ঞান, মুক্তচিন্তা ও মানবমুক্তির দর্শন।
দেশে প্রত্যাবর্তন ও অবসর জীবন
প্রবাস জীবনের এক দীর্ঘ অধ্যায় শেষে মাওলানা শাহ মোহাম্মদ আব্দুল কাহ্হার (রহ.) ফিরে আসেন তাঁর জন্মভূমি বৃহত্তর সিলেট জেলার ছাতক উপজেলার ধারন ফকিরবাড়ি গ্রামে। এখানে এসে তিনি একদিকে আধ্যাত্মিক সাধনায় মগ্ন হন, অন্যদিকে স্থানীয় মানুষের মাঝে ইসলামি জ্ঞান ও মানবিকতার শিক্ষা প্রচার করেন।
তিনি ছিলেন এমন একজন আলেম, যিনি মসজিদের মিম্বারে যেমন দীন শেখাতেন, তেমনি চৌকাঠে বসে গরিবের দুঃখ ভাগ করে নিতেন। তাঁর মজলিস ছিল জ্ঞান ও আধ্যাত্মিকতার সমন্বিত বিদ্যালয়।
জীবনের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত তিনি নীরবে সমাজকে আলোকিত করেছেন নিজের আচরণে, পরোপকারে ও প্রজ্ঞায়। মানুষ তাঁকে শ্রদ্ধা করত শিক্ষক হিসেবে, ভালোবাসত পীর হিসেবে।
পবিত্র হজ্বযাত্রা ও জীবনের শেষ অধ্যায়
১৯৭৭ সালে তিনি পবিত্র হজ্বব্রত পালন করেন—এ যেন তাঁর জীবনের আধ্যাত্মিক পরিপূর্ণতা। হজ্ব ফেরত হয়ে তিনি আরও নম্র, আরও আত্মশুদ্ধ মানুষে পরিণত হন। আল্লাহ ও রাসূলের ভালোবাসায় তিনি ছিলেন নিমগ্ন।
অবশেষে ১৯৮৩ সালে, বুরাইয়া চ্ছিরাওলী ফকিরবাড়িতে তিনি ইন্তেকাল করেন। সেখানে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়। মৃত্যুর পরও তাঁর ঘরবাড়ি, দরবার, এমনকি প্রতিটি দোয়েল-শালিকের ডাক যেন স্মরণ করায়—এখানে ঘুমিয়ে আছেন এক আলোকিত মানুষ, এক সত্যসন্ধানী পীর।
পরিবার ও উত্তরসূরি মাওলানা শাহ আব্দুল কাহ্হার (রহ.) এক সন্ত ও বিদ্বান পরিবার রেখে গেছেন। তাঁর এক পুত্র ও দুই কন্যা ছিল। তাঁর পুত্র আলহাজ শাহ মুস্তাহিদ মিয়া, বর্তমানে যুক্তরাজ্য প্রবাসী, যিনি পিতার আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে মানবসেবা ও সমাজকল্যাণে নিয়োজিত। তাঁর নাতিদের মধ্যে রয়েছেন ব্যারিস্টার শাহ মিসবাহুর রহমান ও শাহ আসফাকুর রহমান, যারা আধুনিক শিক্ষা ও নৈতিকতার সমন্বয়ে পারিবারিক ঐতিহ্য বহন করছেন।
এ পরিবার আজও অঞ্চলে জ্ঞানের, নৈতিকতার ও মানবিকতার প্রতীক হিসেবে পরিচিত। চরিত্র, নৈতিকতা ও প্রভাব আব্দুল কাহ্হার (রহ.) ছিলেন এমন একজন মানুষ, যার মুখে ছিল ধীরতা, কথায় ছিল প্রজ্ঞা, আর ব্যবহারে ছিল ভালোবাসা। তাঁর পোশাক-আশাক, জীবনাচরণ, এমনকি হাঁটার ভঙ্গিতেও ফুটে উঠত সরলতা ও আধ্যাত্মিক সৌন্দর্য। তাঁর মুরীদরা আজও বলেন, তিনি ছিলেন এমন একজন আলেম যিনি কখনো কারও দোষ আলোচনা করতেন না, বরং দোয়া করতেন সংশোধনের জন্য। তাঁর দরবারে কেউ অপমানিত হয়নি—বরং সবাই ফিরে যেত শান্তির বার্তা নিয়ে।
আজও ছাতক ও আশেপাশের অঞ্চলে তাঁর স্মৃতি জড়িয়ে আছে মানুষের হৃদয়ে। তাঁর নামে দোয়া মাহফিল, কিতাব পাঠ ও মিলাদ মাহফিল হয় নিয়মিত। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়—জ্ঞান ও প্রেম মিললেই সৃষ্টি হয় সত্যিকারের আলোকিত মানুষ।
পীরে কামেল হযরত মাওলানা শাহ মোহাম্মদ আব্দুল কাহ্হার (রহ.) ছিলেন এমন এক আলোকিত মনীষী, যিনি ধর্ম, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও মানবতার এক অনন্য মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন। তাঁর জীবনের প্রতিটি অধ্যায় ছিল একেকটি দৃষ্টান্ত—শিক্ষার, ত্যাগের, নৈতিকতার ও আধ্যাত্মিকতার।
আজ তাঁর নাম উচ্চারণ করলে শুধু ইতিহাস নয়, অনুপ্রেরণার বাতিঘর জ্বলে ওঠে নতুনভাবে। তাঁর রুহের মাগফিরাত কামনা করি। আল্লাহ তাআলা তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করুন। আমীন।
Leave a Reply