সিলেটের তিন আসনে বিএনপির প্রার্থী নিয়ে বিভ্রান্তি
দলীয় মনোনয়ন নৈরাজ্যে বাড়ছে ভাঙন–ক্ষোভ–গুঞ্জন
বিশেষ সিলেট ব্যুরো:
ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে সিলেট বিভাগের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ আসনে বিএনপির দলীয় মনোনয়ন নিয়ে এক ধরনের নৈরাজ্যকর বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছে। সিলেট-৬, সুনামগঞ্জ-১ ও সুনামগঞ্জ-২—এই তিন আসনে একইসঙ্গে একাধিক নেতাকে মনোনয়ন দেওয়ায় মাঠপর্যায়ে নেতাকর্মীরা দিশেহারা, বিভক্ত, এবং কেউ কেউ প্রকাশ্যেই ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন। বিএনপির কেন্দ্রীয় সূত্র বলছে—এটি দলের কৌশল। বিভিন্ন কারণে “বিকল্প প্রার্থী প্রস্তুত রাখতে” একাধিক ব্যক্তিকে মনোনয়ন দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, এই কৌশল মাঠে গিয়ে উল্টো দলের ভিতরে অস্থিরতা ও বিভক্তি আরও বাড়িয়ে তুলছে। আর পরে মনোনয়ন পাওয়া ব্যক্তিরা নিজেদের চূড়ান্ত প্রার্থী দাবি করে প্রচার চালানোয় অনিশ্চয়তা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। সুনামগঞ্জ-২: নাছির–তাহির দ্বৈরথে উত্তপ্ত দিরাই–শাল্লা দিরাই–শাল্লা নিয়ে গঠিত সুনামগঞ্জ-২ আসন বিএনপির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কেন্দ্রবিন্দুতে। প্রবীণ নেতা নাছির উদ্দিন চৌধুরীকে প্রার্থী ঘোষণা করেছিল বিএনপি। পাঁচবার জাতীয় নির্বাচন আর দুইবার উপজেলা নির্বাচন করার অভিজ্ঞতা তার। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের বর্ষীয়ান নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে পরাজিত করে যে আসনে তিনি নিজের জনপ্রিয়তা প্রমাণ করেছিলেন—সেই আসনেই আজ তিনি নিজ দলের ‘দ্বিমুখী মনোনয়ন’ যুদ্ধে বন্দী।
শনিবার আরেক মনোনয়নপ্রত্যাশী তাহির রায়হান চৌধুরী পাভেলের হাতে মনোনয়নপত্র পৌঁছে গেলে পুরো এলাকায় জোরালো গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে—“প্রার্থী পরিবর্তন হয়েছে!”
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্বাক্ষরিত একটি চিঠি ভাইরাল হয়, যেখানে পাভেলের নাম রয়েছে। এরপর থেকেই অনেকে ধরে নেন—নাছিরকে সরিয়ে পাভেলই চূড়ান্ত প্রার্থী।
তাহির রায়হান নিজেই বলেন—“আমি মাঠে কাজ করেছি। আমাকে মনোনয়ন না দিলেও দলের সিদ্ধান্ত মানতাম। কিন্তু দল নিজেই আমাকে পরে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ ও জমা দিতে বলেছে।”অন্যদিকে নাছির–পাভেল একইদিনে একসঙ্গে মনোনয়ন জমা দেওয়ায় সমর্থকদের মধ্যে বিভক্তি চরমে পৌঁছায়। কেন্দ্রীয় কিছু নেতা অবশ্য দাবি করছেন—দুজনকেই মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে; শেষ মুহূর্তে নির্বাচন কমিশনে প্রতীক বরাদ্দের সময় একজনকে প্রত্যাহার করা হবে। এ অবস্থায় দিরাই–শাল্লার সাধারণ নেতাকর্মীদের প্রশ্ন—তাহলে এই দুইয়ের লড়াইয়ের দায় নেবে কে?”*সুনামগঞ্জ-১: আনিসুল–কামরুলের মুখোমুখি অবস্থান বিক্ষোভ, সমাবেশ আর মনোনয়ন যুদ্ধ ধর্মপাশা–তাহিরপুর–জামালগঞ্জ–মধ্যনগর নিয়ে গঠিত সুনামগঞ্জ-১ আসনেও একই নাটক। প্রথমে দলীয় প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করা হয় সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আনিসুল হককে। তার সমর্থকেরা মাঠে নেমে পড়েন। প্রচারও শুরু হয় জোরেশোরে।।কিন্তু মাত্র কয়েক দিনের মাথায় কেন্দ্র থেকে ডাক পড়ে আরেক নেতার—সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ও তাহিরপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান কামরুলের কাছে। তার হাতে পৌঁছে দেওয়া হয় দলীয় মনোনয়নপত্র। আনিসুলের সমর্থকেরা এতে ক্ষুব্ধ হয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। সমাবেশ–মিছিল–ব্যানার—সব মিলিয়ে এলাকায় যেন মনোনয়ন যুদ্ধের উত্তাপ।
অন্যদিকে কামরুল দাবি করছেন—কেন্দ্র থেকে সরাসরি বলা হয়েছে—এই আসনে আমিই দলীয় প্রার্থী। সবাইকে নিয়ে নির্বাচন করার কথা বলা হয়েছে। রোববার উজান তাহিরপুরে কামরুলের সমর্থকদের বিশাল সমাবেশে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণাও দেন। পরে রাতেই কেন্দ্রীয় ফোন কল আসে—নিজের জাতীয় পরিচয়পত্র পাঠানোর জন্য। এরপরই আসে মনোনয়ন চিঠি। এখন প্রশ্ন—দুই প্রার্থীই যখন মনোনয়ন পেয়েছেন, তখন মাঠের জনতা কোন দলে দাঁড়াবে?
কার পক্ষে প্রচার হবে? কার বিলবোর্ড টাঙানো হবে?
**সিলেট-৬: এমরান–ফয়সল দ্বৈরথে নতুন গুঞ্জন
‘চূড়ান্ত প্রার্থী’ দাবি দু’জনেরই গোলাপগঞ্জ–বিয়ানীবাজার নিয়ে গঠিত সিলেট-৬ আসনেও একই চিত্র। প্রথম ধাপে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এমরান আহমদ চৌধুরীকে প্রার্থী ঘোষণা করে কেন্দ্র। তিনি প্রচারও শুরু করেন।
কিন্তু শনিবার বিএনপি মহাসচিবের স্বাক্ষরিত আরেক চিঠিতে মনোনয়ন দেওয়া হয় ফয়সল আহমদ চৌধুরীকে—যিনি ২০১৮ সালের নির্বাচনে দলের হয়ে লড়ে নুরুল ইসলাম নাহিদের বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি করেছিলেন।
ফয়সলের মিডিয়া সেল জানিয়ে দেয়—“তিনি-ই চূড়ান্ত প্রার্থী।”
কিন্তু এমরানও প্রচার থামাননি। দু’জনই সোমবার রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন।
এই অবস্থায় সিলেট-৬ এ যেন একটি প্রশ্ন ঘুরছে—
“আসল প্রার্থী কে? বিএনপির কৌশল: ‘বিকল্প প্রার্থী’, নাকি বিভক্তির বীজ? বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক (সিলেট বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত) জিকে গৌছ বিষয়টি ব্যাখ্যা করে বলেন—“কয়েকটি আসনে দলের দুইজন নেতাকে মনোনয়নপত্র জমা দিতে বলা হয়েছে। প্রতীক বরাদ্দের সময় একজন প্রার্থী মনোনয়ন প্রত্যাহার করবেন।”কিন্তু দলের অভ্যন্তরীণ অনেক নেতা বলছেন—এই কৌশল মাঠে গিয়ে বিভক্তি বাড়াচ্ছে।কারণ মনোনয়ন কেউ সহজে ছাড়েন না, আর যখন একজন মনে করেন তিনি বাদ, তখন তার কর্মীরা দলে অনাস্থা তৈরি করেন। একজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন—“এভাবে দুইজনকে মনোনয়ন দিলে কেউ কাউকে মানবে না। শেষমধ্যে উভয়পক্ষের ভাঙন দলকেই ক্ষতিগ্রস্থ করবে।”তিনি আরও বলেন—অনেকে মনে করছে—গোপনে লবিং চালালেই শেষ মুহূর্তে মনোনয়ন পাল্টানো যাবে। এতে মনোনয়ন ব্যবসা, প্রভাব–প্রতিপত্তির খেলা—সবই বাড়ছে।” মাঠে প্রতিক্রিয়া: বিভক্তি, সন্দেহ ও অনিশ্চয়তার রাজনীতিসিলেটের স্থানীয় নেতারা বলছেন—একই আসনে দুটি মনোনয়ন দেওয়া মানে হলো—একটি আসনকে দুই ভাগে চিরে ফেলা।
নেতাকর্মীদের ভাষায়—“কার পোস্টার লাগাব?”
“কার মিছিলে যাব?”“কাকে নিয়ে ভোটে কাজ করবো?”
—এই মৌলিক প্রশ্নের উত্তর কেউ জানেন না।
অন্যদিকে সাধারণ ভোটারদের চোখেও এই বিভ্রান্তি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।এটি শুধু সংগঠন নয়, ভোটব্যাংকেও ভাঙন সৃষ্টি করতে পারে। ২১ জানুয়ারির প্রতীক—উত্তর দেবে সব প্রশ্নের? বিএনপি সূত্র জানায়—২১ জানুয়ারি প্রতীক বরাদ্দের সময় একজন প্রার্থী মনোনয়ন প্রত্যাহার করবেন।
কিন্তু বিএনপির অভ্যন্তরে প্রশ্ন—তখন কি সবকিছু নিয়ন্ত্রণে থাকবে?এতদিনে যে বিভাজন তৈরি হয়েছে, তা কি মুছে যাবে?এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—এই বিভ্রান্তি কি নির্বাচনী মাঠে দলের শক্তি কমিয়ে দেবে না?সব প্রশ্নের উত্তর মিলবে প্রতীক বরাদ্দের দিনেই। তবে আপাতত সিলেটের তিন আসনে বিএনপি যে অভ্যন্তরীণ গোলযোগে নিমজ্জিত—তা স্পষ্ট ও নিঃসন্দেহভাবে দৃশ্যমান।
Leave a Reply