দাবি পূরণে সরকারকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের আল্টিমেটাম
মূল বেতনের ২০ শতাংশ বাড়ি ভাড়া দেওয়াসহ তিন দাবি আদায়ে কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি
আনোয়ার হোসেন রনি নিজস্ব প্রতিবেদক:
বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা সরকারের কাছে তাদের দীর্ঘদিনের তিন দফা দাবি পূরণের জন্য রোববার (১২ অক্টোবর) সন্ধ্যা পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়েছেন। তারা স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, এই সময়ের মধ্যে দাবি বাস্তবায়ন না হলে সোমবার (১৩ অক্টোবর) থেকে দেশের সব এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পূর্ণ দিবস কর্মবিরতি পালন করা হবে।
গত রোববার সকাল থেকে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেন এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা। কর্মসূচিতে কয়েক হাজার শিক্ষক ও কর্মচারী অংশ নেন। ব্যানার, ফেস্টুন আর প্ল্যাকার্ডে তারা লিখে আনেন— “দাবি মানতে হবে”, “শিক্ষকদের প্রাপ্য অধিকার দাও”, “আমরা ভিক্ষা চাই না, ন্যায্য অধিকার চাই”— এমন সব স্লোগান।
তিন দফা দাবি কর্মসূচিতে বক্তারা সরকারের কাছে যে তিনটি দাবি তুলে ধরেন, তা হলো—
১️⃣ এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের মূল বেতনের ২০ শতাংশ বাড়ি ভাড়া প্রদান,
২️⃣ বার্ষিক ইনক্রিমেন্টে বৈষম্য দূর করা, এবং
৩️⃣ শিক্ষা ব্যবস্থা জাতীয়করণে কার্যকর রোডম্যাপ ঘোষণা করা। বক্তারা বলেন, দেশের লাখো শিক্ষক-কর্মচারী আজও বঞ্চিত। একই রাষ্ট্রে থেকে সরকারি শিক্ষকদের সঙ্গে এমপিওভুক্তদের এমন বৈষম্য কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
দেলাওয়ার হোসেন আজিজীর ঘোষণা কর্মসূচিতে যোগ দিয়ে এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণ প্রত্যাশী জোটের সদস্যসচিব অধ্যক্ষ দেলাওয়ার হোসেন আজিজী সরকারকে আল্টিমেটাম দিয়ে বলেন, “আমরা দাবি জানিয়েছি শান্তিপূর্ণভাবে। সরকার আজ (রোববার) সন্ধ্যার মধ্যে দাবি পূরণের সিদ্ধান্ত না নিলে আগামীকাল সোমবার থেকে দেশের সব এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পূর্ণ দিবস কর্মবিরতি পালন করা হবে। আমরা ক্লাসে না গিয়ে রাস্তায় অবস্থান করব, প্রয়োজনে অনশনও করব।” তিনি আরও বলেন, “আমরা শিক্ষা ভালোবাসি, আমরা শ্রেণিকক্ষ ভালোবাসি। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে আমাদের প্রতি সরকারের অবহেলা চলছে। এখন সময় এসেছে, এই অবহেলার প্রতিবাদ জানানোর।”
প্রতিনিধি দলের সাক্ষাৎ অবস্থান কর্মসূচি চলাকালীন এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের ১৩ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল অর্থ মন্ত্রণালয়ে গিয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন। প্রতিনিধি দলে ছিলেন— জোটের আহ্বায়ক অধ্যক্ষ মাঈন উদ্দিন, সদস্যসচিব অধ্যক্ষ দেলাওয়ার হোসেন আজিজীসহ অন্যান্য যুগ্ম আহ্বায়ক ও সদস্যসচিবরা।
তারা অর্থ উপদেষ্টা ও অর্থ সচিবের সঙ্গে বৈঠকে এমপিওভুক্তদের দাবিগুলোর যৌক্তিকতা তুলে ধরেন। প্রতিনিধি দলের সদস্যরা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষক সমাজ মানবেতর জীবনযাপন করছেন। সরকার যদি শিক্ষক-কর্মচারীদের দাবি না মেনে নেয়, তবে বৃহত্তর আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
অংশগ্রহণ ও প্রতিক্রিয়া রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে শিক্ষক-কর্মচারীরা প্রেসক্লাবের সামনে অবস্থান কর্মসূচিতে যোগ দেন। দিনভর স্লোগানে মুখর থাকে এলাকা।
ঢাকা জেলার শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যক্ষ ফজলুল হক বলেন,“আমরা সরকারি কোনো চাকরির দাবিতে নেমে আসিনি। আমরা কেবল ন্যায্য বেতন ও মর্যাদা চাই। বাড়িভাড়া ভাতা না থাকায় আজ শিক্ষক সমাজ অসহায় জীবনযাপন করছে।
”অন্যদিকে, চট্টগ্রাম থেকে আগত শিক্ষক শাহিনুর রহমান বলেন,“আমরা যে শিক্ষার্থীদের মানুষ করছি, সেই শিক্ষকদেরই আজ রাস্তায় দাঁড়াতে হচ্ছে— এটা জাতির জন্য লজ্জার।”
সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ শিক্ষক নেতারা জানান, কয়েক মাস আগেই তারা সরকারের কাছে লিখিতভাবে দাবি জানালেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন সভায় প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও তা বাস্তবে রূপ নেয়নি।
অধ্যক্ষ মাঈন উদ্দিন বলেন, “দেশের শিক্ষা উন্নয়ন সম্ভব নয় যদি শিক্ষকরা বঞ্চিত থাকেন। তাই সরকারকে আহ্বান জানাই, আমাদের দাবি পূরণ করে শিক্ষা ব্যবস্থাকে বাঁচান।”দেশে এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা সরকারি হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে ২৯ হাজার ১৬৪টি এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে স্কুল ও কলেজ মিলিয়ে ২০ হাজার ৪৩৭টি। এসব প্রতিষ্ঠানে সাড়ে পাঁচ লাখেরও বেশি শিক্ষক ও কর্মচারী কর্মরত আছেন।
এমপিও বা মান্থলি পে অর্ডার (Monthly Pay Order) হলো একটি সরকারি ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা প্রতি মাসে বেতনের একটি অংশ সরকারের কাছ থেকে পান। তবে তারা সরকারি শিক্ষকদের মতো সব ভাতা ও সুবিধা পান না।
দাবি আদায়ে ভবিষ্যৎ কর্মসূচি জোটের নেতারা জানিয়েছেন, রোববার সন্ধ্যা পর্যন্ত সরকারের ইতিবাচক সাড়া না পেলে সোমবার সকাল থেকে দেশের সব স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি প্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখে পূর্ণ দিবস কর্মবিরতি পালন করা হবে। এরপরও দাবি না মানলে ধাপে ধাপে রাজধানীতে মহাসমাবেশ, গণঅনশন ও অবস্থান কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
অধ্যক্ষ আজিজী বলেন,“আমরা চাই সরকারের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান হোক। কিন্তু যদি বারবার আমাদের দাবিকে উপেক্ষা করা হয়, তাহলে আমরা কঠোর আন্দোলনে যেতে বাধ্য হব।”শিক্ষক সমাজের দাবি এখন একটাই— ন্যায্য প্রাপ্য আদায়। তারা চান সরকারের দ্রুত হস্তক্ষেপ, যেন শিক্ষকদের বঞ্চনা ও বৈষম্যের অবসান ঘটে।
অন্যথায়, আগামী সপ্তাহ থেকেই শিক্ষা ব্যবস্থায় অচলাবস্থা তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন শিক্ষানুরাগী মহল। এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের এ আন্দোলন এখন দেশের শিক্ষা অঙ্গনের কেন্দ্রবিন্দুতে। সরকারের সিদ্ধান্তের দিকেই তাকিয়ে রয়েছেন সাড়ে পাঁচ লাখ শিক্ষক-কর্মচারী ও তাদের পরিবার।
Leave a Reply