মায়ের বিদায় ও বাবলু ভাইয়ের
স্মৃতিচারণে এক আত্মার আর্তনাদ
লেখক: আনোয়ার হোসেন রনি
ভূমিকা: এক মায়ের চলে যাওয়া, দুই সন্তানের ইতিহাস আমার রাজনীতির পথচলায় দুইজন মানুষের নাম আজও আলোর দিশারি হয়ে আছে— শহীদ মাহবুল হক বাবলু ভাই, আমার নেথে; এবং জীবিত ধারাপাত, প্রিয় নিরু ভাই (সানউল হক নিরু)।এই দুই ভাইয়ের মা—যিনি ছিলেন আমাদের সকলের কাছে এক অনুপ্রেরণার প্রতীক, এক মমতার আধার—তিনি আজ আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন মহান আল্লাহর ডাকে। এই মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের নয়, একটি প্রজন্মের হৃদয়ে গভীর বেদনার দাগ রেখে গেছে।
তার বুকের ভেতর বাবলু ভাইয়ের অসময়ে
প্রয়াণের ক্ষত ছিল;তবুও তিনি ছিলেন অদম্য, আল্লাহর প্রতি অগাধ বিশ্বাসে ভরসা রাখতেন। আমরা সবাই জানতাম—তিনি ছিলেন এক মায়ের প্রতিমূর্তি, যিনি নিজের সন্তান হারিয়েও অন্যদের সন্তানকে আগলে রেখেছিলেন। বাবলু ভাই: রাজনীতির কবিতা, ত্যাগের প্রতীক।শহীদ মাহবুল হক বাবলু ভাই শুধু একজন রাজনৈতিক কর্মী ছিলেন না,তিনি ছিলেন এক আদর্শ, এক নৈতিকতার দৃষ্টান্ত।
আমার রাজনীতির কাব্য, আমার চিন্তার ভিত্তি—সবকিছুতেই বাবলু ভাইয়ের ছায়া আমি পাই। তার রাজনীতির মূলমন্ত্র ছিল জনগণের অধিকার, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। কিন্তু সময় তাকে কেড়ে নিল খুব তাড়াতাড়ি—যেভাবে বাংলার মাটিতে অনেক সৎ, সাহসী মানুষ হারিয়ে যায় একের পর এক।বাবলু ভাই শহীদ হয়েছেন, কিন্তু তাঁর আদর্শ আজও বেঁচে আছে আমাদের রাজনীতির রক্তস্রোতে।
২০১৯ সালের এক প্রতিশ্রুতি, যা পূরণ হলো না
২০১৯ সালে আমি আমার খালাকে (বাবলু ভাই ও নিরু ভাইয়ের মা) কথা দিয়েছিলাম— ২০২০ সালে বাবলু ভাইয়ের শাহাদতবার্ষিকির দোয়া মাহফিলে আমি আসব।তিনি যেন সেই কথাটির মধ্যে বেঁচে ছিলেন। প্রতিবার দেখা হলে তিনি জিজ্ঞেস করতেন—“তুমি আসবেতো ? তুমি আসবেতো?”
আমি হাসতাম, বলতাম—“খালা, কথা দিয়েছি, নিশ্চয়ই আসব।”কিন্তু সময় বড় নিষ্ঠুর।
যখন গেলাম, তাঁর জীবন শেষ অধ্যায়ে, অথচ মমতার কোনো অভাব নেই। তিনি আমার হাত ধরে রাখতেন, যেন সন্তান হারানো মায়ের মমতা একবার আর ফিরে পেতে চান। আমি তাঁকে এক মুহূর্তের জন্যও একা রাখিনি। প্রতিটি মুহূর্তেই অনুভব করছিলাম—এই মায়ের বুকের ভেতর কী গভীর বেদনা জমে আছে।
নেত্রীর দেখা, এক প্রতিশ্রুতি ও সময়ের নির্মমতা
আমি তাঁকে একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম— “খালা, শুনেছি, বেগম খালেদা জিয়া আপনার ঘরে এসে ছিলেন, বাবলু ভাইয়ের কবরে ফাতেহা পাঠ করেছিলেন—সেই দিন আপনাদের মধ্যে কী কথা হয়েছিল?” তিনি কিছুটা নীরব হয়ে গেলেন।
তারপর ধীরে ধীরে বললেন—“সেই দিন বেগম জিয়া আমাকে বলেছিলেন, আপনি যেমন সন্তান হারিয়েছেন, আমিও আমার সন্তান হারিয়েছি—বাবলু আমারও সন্তান ছিল। আপনি চিন্তা করবেন না, নিরুর ভালো-মন্দ সব আমি দেখে রাখব।”
খালার চোখে সেই দিন অশ্রু ছিল, কিন্তু বেগম জিয়ার কথায় হয়তো কিছুটা সান্ত্বনা পেয়েছিলেন। ভেবেছিলেন, তাঁর আরেক সন্তান নিরু ভাই নিরাপদ।
কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী—সময় সেই প্রতিশ্রুতির কোনো সাক্ষী রাখেনি। দীর্ঘ ৩৪ বছর পর, সেই নেত্রী যিনি মাতৃত্বের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, নিরু ভাইকে বহিষ্কার করলেন মাত্র দুই মাস সময় দিয়ে।খালা হয়তো তখন আর কিছু বলার মতো শক্তিও পাননি। আমি নিজেও লজ্জিত, কারণ তিনিও আমাকে বলেছিলেন, “তুমি আসবেতো?” আমি কথা দিয়েও আসতে পারিনি সময়মতো। তাই আজ এই লেখায় আমি বলছি—“মা, ক্ষমা করো, আমরাও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পারিনি।”একাকী নিরু ভাই: রাজনীতির এক নীরব যোদ্ধা
খালার মৃত্যুর পর নিরু ভাই যেন আরও নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছেন।
বাবলু ভাইয়ের শহীদ হওয়ার পর থেকেই তাঁর কাঁধে পড়ে পরিবারের বোঝা, সংগঠনের দায়িত্ব, রাজনীতির তীব্র চাপ। তিনি ছিলেন রাজনীতির মাটিতে দাঁড়ানো এক মানুষ, যিনি এখনো নিজের আদর্শে অটল।আমি দেখেছি, খালা নিরু ভাইকে নিয়ে কত চিন্তা করতেন।
তার কণ্ঠে ছিল একটাই দোয়া—“আল্লাহ আমার নিরুকে হেফাজতে রাখুক।”এখন সেই মা নেই।। তবে তাঁর রেখে যাওয়া দোয়ার শক্তি আজও নিরু ভাইয়ের চারপাশে এক অদৃশ্য ঢাল হয়ে আছে।রাজনীতি, প্রতিশ্রুতি ও মানবিকতার পাঠএই গল্প কেবল এক পরিবারের নয়। এটি বাংলাদেশের রাজনীতির এক প্রতিচ্ছবি—যেখানে প্রতিশ্রুতি, আত্মত্যাগ ও হতাশা একসাথে জড়িয়ে থাকে। আমরা দেখি, নেতা ও কর্মীর মধ্যে সম্পর্ক কতটা মায়ার, কতটা ভালোবাসার,আবার কতটা অনিশ্চয়তার। রাজনীতি শুধু ক্ষমতার খেলা নয়,এটি অনুভূতিরও জায়গা। বাবলু ভাইয়ের শহীদ হওয়া, নিরু ভাইয়ের লড়াই, আর মায়ের মৃত্যু— সব মিলিয়ে এটি আমাদের শেখায়,মানবিকতা ও বিশ্বাস হারালে রাজনীতির আত্মা মরে যায়। উপসংহার: এক মায়ের দোয়া, এক প্রজন্মের দায় মা, আপনি আমাদের ছেড়ে গেছেন, কিন্তু আপনার স্মৃতি, আপনার দোয়া, আপনার মমতা আমাদের হৃদয়ে অমর হয়ে থাকবে।
আপনি সেই মা, যিনি হারিয়েছেন সন্তান, কিন্তু তবু হারাননি আল্লাহর প্রতি আস্থা। আজ আমি আপনার কাছে শুধু একটাই আবেদন করি— আমাদের নামে আল্লাহর কাছে নালিশ করবেন না। আমরা ব্যর্থ হয়েছি, প্রতিশ্রুতি রাখতে পারিনি,
তবু আমাদের ক্ষমা করে দিন, যেন আমরা অন্তত আপনার দোয়ার ছায়ায় থাকতে পারি। আল্লাহ আপনাকে কবরের জীবনে শান্তি দিন। আপনার আত্মা যেন আপনার শহীদ সন্তানের সঙ্গে জান্নাতে মিলিত হয়—এই প্রার্থনাই আমাদের সবার।
Leave a Reply