বিদেশ থেকে হাইকোর্টের বিচারপতি মামনুন রহমানের পদত্যাগ
বাংলাদেশের বিচার বিভাগে নজিরবিহীন ঘটনা
বাংলাদেশের বিচার বিভাগে এক অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটেছে। সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি মামনুন রহমান কানাডা থেকে ই-মেইলের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির নিকট তার পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন। দেশের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো কার্যরত বিচারপতি বিদেশে অবস্থান করে ই-মেইলের মাধ্যমে তার পদত্যাগপত্র পাঠালেন। বিচার বিভাগ ও আইন অঙ্গনে এ ঘটনাকে বেশ তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, গত সোমবার, ২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, বিচারপতি মামনুন রহমান রাষ্ট্রপতির সচিবালয়ে তার পদত্যাগপত্র প্রেরণ করেন। আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগের বিষয়টি ৩ ফেব্রুয়ারি আদালত প্রশাসনের মাধ্যমে নিশ্চিত হয়। বিচারপতি বর্তমানে ব্যক্তিগত সফরে কানাডায় অবস্থান করছেন। ছুটিতে থাকার কারণে তিনি সশরীরে বা ডাকযোগে নয়, বরং ই-মেইলের মাধ্যমে পদত্যাগপত্র পাঠাতে বাধ্য হন বলে জানা যায়।সাধারণত বিচারপতিরা পদত্যাগের ক্ষেত্রে সশরীরে রাষ্ট্রপতির কার্যালয় বা সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃপক্ষের হাতে স্বাক্ষরযুক্ত পত্র হস্তান্তর করেন। তবে দেশের বাইরে অবস্থানের কারণে তিনি ডিজিটালি পাঠানো স্ক্যান কপির মাধ্যমে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত জানান। সুপ্রিম কোর্টের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, এটি প্রযুক্তিগতভাবে গ্রহণযোগ্য এবং সংবিধান অনুযায়ী বৈধ।
বিচার বিভাগে চলমান পরিবর্তন ও উত্তাপ গত কয়েক মাস ধরে বাংলাদেশের উচ্চ আদালতে বেশ কিছু প্রশাসনিক পরিবর্তন ও সংস্কার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। একাধিক বিচারপতির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ, বিচারিক নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন এবং বিচারক নিয়োগ-বরাদ্দে অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে আইন ও বিচার অঙ্গনে আলোচনার ঝড় বইছে।
বিচারপতি মামনুন রহমানও সাম্প্রতিক বিতর্ক ও অভিযোগে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন। আদালতের বেশ কয়েকটি সংবেদনশীল মামলায় তার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। এর পাশাপাশি, কিছু অভিযোগের সত্যতা তদন্তে গত বছর থেকেই তিনি বিচারিক কর্মকাণ্ডে অনিয়মিত হয়ে পড়েন। সর্বশেষ জানা যায়, অভিযোগ নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তাকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বেঞ্চ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
এ অবস্থায় তার বিদেশে অবস্থান ও হঠাৎ পদত্যাগকে কেন্দ্র করে নানামুখী ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ শুরু হয়েছে। বিশেষ করে বিচার বিভাগে চলমান সংস্কার প্রক্রিয়া ও নৈতিকতা নিশ্চিতে সরকারের কঠোর অবস্থানের প্রেক্ষাপটে এই পদত্যাগকে অনেকে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখছেন। সংবিধান কী বলছে
বাংলাদেশের সংবিধানের ৯৬(৫) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সুপ্রিম কোর্টের কোনো বিচারপতি “রাষ্ট্রপতির উদ্দেশে স্বাক্ষরযুক্ত পত্র” প্রদান করে পদত্যাগ করতে পারেন। এতে সশরীরে উপস্থিত হওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই, তবে পত্রে তার স্বাক্ষর থাকা আবশ্যক। আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদেশে থাকা অবস্থায় স্ক্যানকৃত বা ডিজিটাল স্বাক্ষরযুক্ত পত্র ই-মেইল করে পাঠানো বিষয়টি সংবিধানবিরোধী নয়, তবে এটি অবশ্যই যাচাই-বাছাই সাপেক্ষে গ্রহণযোগ্য। রাষ্ট্রপতির কার্যালয় থেকে পত্রের সত্যতা নিশ্চিত হওয়ার পরই পদত্যাগ আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হবে।
বিচারপতির কর্মজীবন বিচারপতি মামনুন রহমান ২০১০ সালে হাইকোর্ট বিভাগের অতিরিক্ত বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান। পরবর্তীতে কর্মদক্ষতা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তাকে স্থায়ী বিচারপতি করা হয়। দীর্ঘ বিচারিক জীবনে তিনি সংবিধান, অপরাধ, মানবাধিকারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বহু উল্লেখযোগ্য রায় প্রদান করেছেন। প্রশাসনিক আদালতেও তার ভূমিকা ছিল সক্রিয়।তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিছু বিতর্ক ও অভিযোগ তার অবস্থানকে দুর্বল করেছিল। শৃঙ্খলা ও নৈতিকতার প্রশ্নে বিচার বিভাগ যেভাবে কঠোর হচ্ছে, তার মধ্যে বিচারপতির ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তে এই পদত্যাগ বিচার বিভাগের জন্য নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। প্রতিক্রিয়া ও বিশ্লেষণ বিচার বিভাগীয় মহল বলছে, বিদেশে অবস্থান করে বিচারপতির পদত্যাগ—এটি কেবল একটি ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়; বরং বিচার বিভাগের অভ্যন্তরীণ উত্তাপ ও পরিবর্তনের প্রতিফলন। উচ্চ আদালতের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সাম্প্রতিক সময়ে রাষ্ট্রপতি ও সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন বেশ সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। বিচারপতি মামনুন রহমানের পদত্যাগও সেই প্রক্রিয়ারই অংশ হতে পারে বলে অনেকেই মনে করছেন।
আইনজীবী সমিতির একাধিক জ্যেষ্ঠ সদস্য জানান, পদত্যাগের এই ঘটনার মাধ্যমে বিচার বিভাগে নৈতিকতা রক্ষার প্রশ্নটি আবারও সামনে এসেছে। একইসঙ্গে দেশের বিচারবিভাগীয় কাঠামোয় ডিজিটাল পদ্ধতির ব্যবহারও নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। হাইকোর্টের বিচারপতি মামনুন রহমানের বিদেশ থেকে পদত্যাগ বাংলাদেশের বিচারবিভাগের জন্য একটি যুগান্তকারী ঘটনা। একদিকে এটি বিচার বিভাগের ক্রমবর্ধমান জবাবদিহিতা ও সংস্কারের প্রতিফলন, অন্যদিকে বিচারকদের দায়িত্ব, নৈতিকতা ও আচরণের ওপর নতুন করে আলো ফেলেছে। আগামী দিনে বিচার বিভাগে এ ধরনের আরও পরিবর্তন আসতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
Leave a Reply