পাউবোর আশীর্বাদে বিতর্কিত উত্থান
স্বপন হাজিকে ঘিরে ঠিকাদারি সাম্রাজ্য,
টেন্ডারবাজি ও বালু–পাথর সিন্ডিকেটের অভিযোগ
সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি :
সুনামগঞ্জের ছাতক–দোয়ারাবাজার অঞ্চলে রাজনীতি, ঠিকাদারি ও নদীভিত্তিক ব্যবসার অঙ্গনে যে ক’জন ব্যক্তিকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে সবচেয়ে বেশি আলোচনা, সমালোচনা ও অভিযোগ—তাদের শীর্ষে রয়েছেন আওয়ামী লীগ নেতা স্বপন মিয়া। স্থানীয়দের কাছে যিনি ‘স্বপন হাজি’ নামে পরিচিত। একসময় যাঁর জীবনের সম্বল ছিল দিনমজুরি, রাজমিস্ত্রির কাজ, রিকশা চালানো কিংবা হোটেল শ্রমিকের পেশা—মাত্র দেড় দশকের ব্যবধানে সেই মানুষটিই এখন শত কোটি টাকার সম্পদের মালিক, প্রভাবশালী ঠিকাদার এবং নানা বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু।
তার এই দ্রুত উত্থানকে ঘিরে এলাকায় জন্ম নিয়েছে অসংখ্য প্রশ্ন। কীভাবে একজন সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ অল্প সময়ে সরকারি প্রকল্প, টেন্ডার, বালু-পাথর ব্যবসা, নৌপরিবহন ও সীমান্তঘেঁষা অর্থনীতির নিয়ন্ত্রকে পরিণত হলেন—সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই স্থানীয়দের মধ্যে চলছে বিস্তর আলোচনা।
দিনমজুরি থেকে ‘ঠিকাদারি সাম্রাজ্য’ স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, আজ থেকে প্রায় ১৬ বছর আগেও স্বপন মিয়া ছিলেন একজন সাধারণ শ্রমিক। কখনো রাজমিস্ত্রি, কখনো রিকশাচালক, আবার কখনো হোটেল কর্মী হিসেবে জীবন চালাতেন। সেই সময় তার আর্থিক অবস্থান ছিল নড়বড়ে, পারিবারিক সংগ্রাম ছিল নিত্যসঙ্গী।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দৃশ্যপট বদলে যায়। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পরপরই স্বপন মিয়ার জীবনে আসে নাটকীয় পরিবর্তন। স্থানীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে তিনি ধীরে ধীরে ঠিকাদারি জগতে প্রবেশ করেন। আর এই প্রবেশের পর থেকেই শুরু হয় তার উত্থানের রকেটগতি।
রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতাই কি টার্নিং পয়েন্ট?স্থানীয় একাধিক রাজনৈতিক সূত্রের দাবি, স্বপন হাজির উত্থানের পেছনে মূল চালিকাশক্তি ছিল রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা। বিশেষ করে সুনামগঞ্জ–৫ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মুহিবুর রহমান মানিকের সঙ্গে তার সম্পর্ককে ‘গেম চেঞ্জার’ হিসেবে দেখছেন অনেকে। এ ছাড়া আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় পর্যায়ের প্রভাবশালী নেতা, প্রেসিডিয়াম সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানকের সঙ্গে তার সখ্যতার কথাও উঠে এসেছে নানা আলোচনায়। স্থানীয়দের ভাষায়—এই রাজনৈতিক যোগাযোগই স্বপনের ভাগ্য বদলের ‘আলাদিনের চেরাগ’। সমালোচকদের অভিযোগ, এসব সম্পর্ককে পুঁজি করেই তিনি সরকারি টেন্ডার, উন্নয়ন প্রকল্প, বালু-পাথরের ব্যবসা ও নদীপথে পণ্য পরিবহনের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নিয়ে নেন। তবে স্বপন মিয়া এসব অভিযোগ নাকচ করে বলেন,“আমি রাজনীতি করি ঠিকই, কিন্তু কোনো অন্যায় পথে যাইনি। সব ব্যবসাই বৈধ। নিজের শ্রম আর বুদ্ধি দিয়ে এগিয়েছি।”
টেন্ডারবাজি ও একক কর্তৃত্বের অভিযোগ ছাতক ও দোয়ারাবাজারের ঠিকাদারি মহলে স্বপন হাজির বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি যে অভিযোগটি শোনা যায়, তা হলো—সরকারি টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ। স্থানীয় ঠিকাদারদের ভাষ্য অনুযায়ী, সড়ক ও জনপদ অধিদপ্তর (সওজ), পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো), ছাতক সিমেন্ট কারখানা, রেলওয়ে—কোনো প্রতিষ্ঠানের বড় কাজই যেন তার প্রভাবের বাইরে থাকে না। স্বপনের মালিকানাধীন ‘বিসমিল্লাহ সোনালী চেলা ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড’ নামের প্রতিষ্ঠানটি নিয়মিতভাবে বড় বড় সরকারি প্রকল্পের কাজ পেয়ে আসছে বলে অভিযোগ।
একাধিক ঠিকাদার দাবি করেন,অনেক সময় দরপত্র জমা দেওয়ার আগেই বোঝা যায়—কাজটা কার হাতে যাবে। প্রতিযোগিতা নামমাত্র।”অভিযোগ রয়েছে, কখনো তিনি নিজে কাজ করেন, আবার কখনো টেন্ডার জিতে তা মোটা অঙ্কের লাভে অন্য ঠিকাদারের কাছে বিক্রি করে দেন। পাউবো ঘিরে হাজার কোটি টাকার প্রশ্ন পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, সুনামগঞ্জ জেলায় বাস্তবায়িত ও চলমান হাজার কোটি টাকার প্রকল্পে স্বপন হাজির প্রভাব ছিল দৃশ্যমান। একজন স্থানীয় ঠিকাদার অভিযোগ করেন, পাউবোর উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী শমসের আলী টাকার বিনিময়ে স্বপনের প্রতিষ্ঠানের হাতে একাধিক কাজ তুলে দিয়েছেন। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে পাউবো কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বক্তব্য দেয়নি।
বালু–পাথর সিন্ডিকেট ও সীমান্ত বাণিজ্যের অভিযোগ
ছাতক–দোয়ারাবাজারের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলো দীর্ঘদিন ধরে বালু ও পাথরের অবৈধ ব্যবসার জন্য পরিচিত। স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, এই চোরাই বাণিজ্যের সঙ্গে স্বপন হাজির নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িত। অভিযোগ অনুযায়ী, তার মালিকানাধীন বলগেট ও বড় জাহাজ ব্যবহার করে ভারতীয় সীমান্ত থেকে বালু ও পাথর নদীপথে পরিবহন করা হয়। একই সঙ্গে সুরমা নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের নেতৃত্বেও তার নাম উঠে আসে।
স্বপন হাজির বক্তব্য,“আমার সব লাইসেন্স আছে। অবৈধ কিছু করি না। যারা অপপ্রচার করছে, তারা আমার সাফল্য সহ্য করতে পারছে না।”ছাতক সিমেন্ট কারখানার ৭১ কোটি টাকার টেন্ডার স্বপন হাজিকে ঘিরে সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয় ছাতক সিমেন্ট কারখানার একটি বিশাল টেন্ডারকে কেন্দ্র করে। চলতি বছরের ২ জুলাই তার প্রতিষ্ঠান প্রায় ৭১ কোটি টাকায় কারখানার পুরাতন মালামাল বিক্রির টেন্ডার পায়।
কারখানার একাধিক সূত্রের দাবি, মালামালের প্রকৃত বাজারমূল্য ছিল ১৫০–১৬০ কোটি টাকার বেশি দরপত্র জমা পড়ে মাত্র ৩টি অথচ বিক্রি হয়েছিল কয়েক ডজন দরপত্র
অভিযোগ রয়েছে, কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুর রহমান বাদশার সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমেই এই টেন্ডারটি বাগিয়ে নেন স্বপন হাজি। টাকা জমা নিয়ে জটিলতা ও সময় বাড়ানোর অভিযোগ সূত্র জানায়, ৭১ কোটি টাকার বিপরীতে স্বপন হাজি জমা দিয়েছেন মাত্র ৭ কোটি ১০ লাখ টাকা। বাকি অর্থ সংগ্রহের জন্য তিনি টেন্ডারটি সাব-কন্ট্রাক্টে বিক্রির চেষ্টা করেন।
বকেয়া অর্থ জমা না পড়ায় টেন্ডার বাতিল হওয়ার শঙ্কা দেখা দিলে, অভিযোগ অনুযায়ী, প্রভাব খাটিয়ে ১৫ সেপ্টেম্বর আরও ৪৫ দিন সময় বাড়ানো হয়। স্বপন হাজির দাবি,
“এই টেন্ডারের পর থেকেই আমার বিরুদ্ধে পরিকল্পিত অপপ্রচার শুরু হয়েছে। আমি একা কাজ করিনি—বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ব্যবসায়ীরা এতে যুক্ত ছিলেন।”
অল্প সময়ে ‘শত কোটি টাকার মালিক’? স্বপন হাজির সম্পদের পরিমাণ নিয়ে এলাকাজুড়ে বিস্তর আলোচনা রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি অনুযায়ী, তার মালিকানায় রয়েছে—
পৌর শহরের মণ্ডলীভোগে ২টি বহুতল ভবন
রহমতবাগে ২টি ছুরাবনগরে ১টি লেভারপাড়ায় ১টি কোর্ট রোডে ৯০ শতক জমি ৫টি বালগেট নগদ অর্থ ও নামে-বেনামে বিপুল সম্পদ শহরে আরও অন্তত ৬টি মার্কেট ও বহুতল ভবন তার মালিকানায় রয়েছে বলেও দাবি।
তবে স্বপন হাজির ভাষ্য, আমার ৭টা বাড়ি নেই, আছে ৩টা। সব বৈধ আয়ে কেনা।”পোষা বাহিনী’ ও ব্যক্তিগত প্রভাব
স্থানীয় বাসিন্দাদের একটি অংশের অভিযোগ, স্বপন হাজির একটি নিজস্ব ‘বাহিনী’ রয়েছে, যারা তার ব্যবসা ও প্রভাব রক্ষায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। তাদের মতে, টেন্ডার, ব্যবসা বা সরকারি কাজে তার মতামতই শেষ কথা। যদিও এসব অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দেন স্বপন হাজি।
রাজনৈতিক প্রভাব কি এখনো অটুট? ২০২১ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে নৌকা প্রতীক না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে পরাজিত হলেও স্থানীয় রাজনীতিতে তার প্রভাব কমেনি বলেই মনে করেন অনেকে। এমনকি আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় না থাকলেও দোয়ারাবাজারে নদীভাঙন রক্ষা প্রকল্পের চারটি কাজ এখনো তার প্রতিষ্ঠানের নামে চলমান—যা নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। তদন্তই কি একমাত্র পথ? স্বপন হাজি একজন সংগ্রামী উদ্যোক্তা, নাকি রাজনৈতিক আশীর্বাদে গড়ে ওঠা বিতর্কিত ঠিকাদার—এই প্রশ্নে বিভক্ত ছাতক–দোয়ারাবাজার।
একদিকে তার কঠোর পরিশ্রমের গল্প, অন্যদিকে সরকারি টেন্ডার, বালু-পাথর সিন্ডিকেট ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল। এলাকার সচেতন নাগরিকদের একটি বড় অংশ এখন দুর্নীতি দমন কমিশন, দুদক ও সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার স্বাধীন তদন্ত দাবি করছেন। তদন্তই পারে এই বিতর্কের প্রকৃত সত্য সামনে আনতে—এমনটাই মত স্থানীয়দের।
Leave a Reply