ছাতকে সার ডিলার নিয়োগ পুনর্বিবেচনা ও খুচরা ডিলারদের লাইসেন্স বহালের দাবিতে মানববন্ধন
ছাতক সংবাদদাতা::
সুনামগঞ্জের ছাতকে সার ডিলার নিয়োগে সাম্প্রতিক পরিবর্তন এবং ২০২৫ সালের সার ব্যবস্থাপনা নীতিমালায় খুচরা ডিলারদের বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে বিক্ষুব্ধ খুচরা সার বিক্রেতারা মানববন্ধন করেছেন। বৃহস্পতিবার (২৭ নভেম্বর) দুপুরে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন থেকে আগত খুচরা সার বিক্রেতারা উপজেলা চত্বরের সামনের প্রধান সড়কে এক ঘণ্টাব্যাপী মানববন্ধনে অংশ নেন। মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারী বক্তারা জানান, বহু বছর ধরে তারা ন্যায্যমূল্যে স্থানীয় কৃষকের কাছে সার পৌঁছে দেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে আসছেন। জেলা ও উপজেলায় কৃষকদের নিকট সার সরবরাহের ক্ষেত্রে খুচরা বিক্রেতাদের কাজ শুধু বাণিজ্যিক নয়, এটি কৃষিনির্ভর এলাকার জন্য এক ধরনের সেবামূলক দায়িত্বও। ২০০৯ সালের সার ব্যবস্থাপনা নীতিমালা অনুযায়ী তারা বৈধভাবে লাইসেন্সপ্রাপ্ত হয়ে কাজ করে এলেও হঠাৎ করে নতুন ঘোষিত ২০২৫ সালের নীতিমালায় তাদের বাদ দেওয়া হয়েছে, যা তারা ‘অন্যায্য, অযৌক্তিক এবং ক্ষতিকর’ বলে আখ্যায়িত করেন।
সভায় নেতৃবৃন্দের বক্তব্য মানববন্ধনের সভাপতিত্ব করেন ছাতক উপজেলা খুচরা সার ডিলার এসোসিয়েশনের সভাপতি মোঃ লিল মিয়া আকাশ। সাধারণ সম্পাদক সালেক মিয়ার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন আব্দুর রহমান। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের সহ সাধারণ সম্পাদক জোবায়ের হোসেন, অর্থ সম্পাদক সামছুল ইসলাম, সাংগঠনিক সম্পাদক সুমন মিয়া, সদস্য মোজাম্মিল হোসেন, বেলু দাশ, জয়নাল আবেদীন, আবুল কাসেম, রানা মিয়া, সিরাজুল রহমান, বিলাল মিয়া, আব্দুল হামিদ, জহিরুল ইসলাম, চেরাগ আলী, লোকমান হোসেন, কলিম উদ্দিন ও সুন্দর আলীসহ উপজেলা খুচরা সার ডিলার এসোসিয়েশনের অসংখ্য নেতৃবৃন্দ। বক্তারা বলেন, সার বিতরণ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী রাখতে দীর্ঘদিন ধরে খুচরা সার ডিলাররাই মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। কৃষকের দরজায় সার পৌঁছে দেওয়া, বাজারের সংকট মোকাবিলা করা, পাহাড়ে–বাঁকে বা দুর্গম এলাকায় সার পৌঁছানোর দায়িত্বও তারা দক্ষতার সঙ্গে পালন করেছেন। তাই হঠাৎ করে তাদের বাদ দিয়ে নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করলে কৃষি উৎপাদনে বৈষম্য সৃষ্টি হবে। কৃষকদের ক্ষতির আশঙ্কা বক্তারা অভিযোগ করেন, নতুন নীতিমালায় খুচরা সার ডিলার বাদ দিলে ক্ষতির মুখে পড়বেন এলাকার সাধারণ কৃষক। কারণ হিসেবে তারা বলেন— কৃষকরা সময়মতো সার সংগ্রহ করতে পারবেন না,
সার বিক্রির কেন্দ্র সংখ্যা কমে গেলে দূরবর্তী এলাকার কৃষকদের অতিরিক্ত ভোগান্তি হবে, কৃষকের সুবিধার্থে খুচরা বিক্রেতাদের মাধ্যমে বাকিতে সার নেয়ার হরহামেশা যে সুযোগ ছিল তা বন্ধ হয়ে যাবে, ফলে কৃষিকাজে ব্যয় বাড়বে এবং উৎপাদন ব্যাহত হবে। তারা আরও জানান, নতুন নীতিমালা বাস্তবায়ন হলে খুচরা সার বিতরণ বন্ধ হয়ে যাবে। এতে উপজেলার ৭৮ জন লাইসেন্সধারী ডিলার ও তাদের পরিবারের সদস্যরা জীবিকা সংকটে পড়ে গভীর অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেওয়া হবে। বক্তারা এ পরিস্থিতিকে ‘উপজেলার কৃষি ও কৃষক–বান্ধব ব্যবস্থার সঙ্গে বেমানান এবং ক্ষতিকর’ বলে উল্লেখ করেন। আধুনিক নীতিমালায় খুচরা বিক্রেতা বাদ দেওয়ায় উদ্বেগ খুচরা সার বিক্রেতারা অভিযোগ করেন, ২০২৫ সালের সার নীতিমালা প্রণয়নের সময় মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বিবেচনা করা হয়নি। তারা জানান—“আমরা ২০০৯ সালের নীতিমালার আলোকে নিবন্ধিত হয়েছি। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে আমরা নিয়ম মেনে, স্বচ্ছতা ওজবাবদিহিতার সঙ্গে সার বিক্রি করে আসছি। কোনো অভিযোগ না থাকা সত্ত্বেও হঠাৎ করে আমাদের বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত কৃষকদের পাশাপাশি আমাদের পরিবারের জন্যও অন্যায়।”
বক্তাদের মতে, নীতিমালার পরিবর্তন করতে হলে মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞ ডিলারদের মতামত গ্রহণ করা জরুরি ছিল। তারা মনে করেন, সার বিতরণ ব্যবস্থা উন্নত করার নামে অভিজ্ঞ ও বৈধ খুচরা ডিলারদের বাদ দিয়ে নতুন প্রক্রিয়া চালু করা হলে তা সার সংকট আরও বাড়াতে পারে। আবেদনপত্র জমা
মানববন্ধন শেষে খুচরা বিক্রেতাদের একটি প্রতিনিধি দল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার বরাবর একটি আবেদনপত্র জমা দেন। আবেদনপত্রে তারা উল্লেখ করেন—তারা ২০০৯ সালের সার ব্যবস্থাপনা নীতিমালার আওতায় নিবন্ধিত, দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্বশীলতার সঙ্গে সার সরবরাহ করেছেন,তাদের বিরুদ্ধে কোনো অনিয়মের অভিযোগ নেই,তাই নতুন নীতিমালায় তাদের বাদ দেওয়া ‘অনভিপ্রেত এবং পুনর্বিবেচনার যোগ্য।’ আবেদনপত্রে তারা জোর দাবি জানান— নতুন নীতিমালা পুনর্বিবেচনা করে খুচরা সার ডিলারদের লাইসেন্স বহাল রাখতে হবে।তারা বলেন, খুচরা বিক্রেতাদের বাদ দিলে সার সরবরাহ ব্যবস্থায় গতি কমে যাবে। সার পাওয়া অসুবিধাজনক হলে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হবে, যার প্রভাব পড়বে দেশের সামগ্রিক কৃষি উৎপাদনেও।
দাবি পুনর্বিবেচনার আহ্বান
মানববন্ধনে বক্তারা সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন—
“আমরা সরকারের নীতিনির্ধারক ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কাছে অনুরোধ করছি, মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বিবেচনা করে সার বিতরণের বর্তমান কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। আর তা করতে হলে খুচরা ডিলারদের বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা ছাড়া বিকল্প নেই।” তারা আরও বলেন, যদি খুচরা সার ডিলাররা হঠাৎ করে বাদ পড়ে যায়, তাহলে শুধু কৃষকই নয়, বড় আকারে ক্ষতিগ্রস্ত হবে পুরো কৃষি অর্থনীতি। সার বিতরণে স্থবিরতা এলে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। সার ব্যবস্থাপনায় মাঠপর্যায়ের খুচরা ডিলারদের গুরুত্ব অপরিসীম—এ মন্তব্য করে বক্তারা বলেন, সরকারের কাছে তাদের প্রত্যাশা–খুচরা ডিলারদের লাইসেন্স বহাল রাখা,
বৈধ ডিলারদের সুরক্ষা প্রদান, সার সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা,এবং কৃষকের স্বার্থ রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা। মানববন্ধন ঘিরে উপজেলা চত্বরে কৃষক,ডিলারসহ সাধারণ মানুষের ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। সবাই একবাক্যে বলেন— কৃষি বাঁচাতে হলে খুচরা সার ডিলারদের বিকল্প নেই।
Leave a Reply