কৈতক হাসপাতালের জমি নিয়ে দুই নামজারি বাতিল, এসএ খতিয়ানে পুনর্বহালের নির্দেশ
ছাতক প্রতিনিধি: সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার কৈতক মৌজায় অবস্থিত কৈতক হাসপাতালের জমি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলমান বিরোধের গুরুত্বপূর্ণ মোড় ঘুরিয়েছে প্রশাসনের এক আদেশ। দুটি পৃথক নামজারি রিভিউ মামলার শুনানি শেষে ছাতকের সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোহাম্মদ মোজাহিদুল ইসলাম হাসপাতালের জমি হিসেবে দাবি করা ভূমির ওপর করা দুইটি নামজারি বাতিল করে জমি সাবেক এসএ ৭৬ নম্বর খতিয়ানে পুনর্বহালের নির্দেশ দিয়েছেন।
গত ২০ জুলাই ২০২৬ তারিখে নামজারি রিভিউ মোকদ্দমা নং ৯২/২৪-২৫ এবং ৯৩/২৪-২৫-এর শুনানি শেষে রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০-এর ১৫০(১) ধারা অনুযায়ী এ আদেশ দেওয়া হয়। আদেশে বলা হয়েছে, পরবর্তীকালে সৃষ্ট দুইটি নামজারি খতিয়ান থেকে মোট ০.১০৯৮ একর জমি কর্তন করে সাবেক এসএ ৭৬ নম্বর খতিয়ানে পুনর্বহাল করতে হবে।
আদালতের আদেশ অনুযায়ী, নামজারি রিভিউ মামলা নং ৯২/২৪-২৫-এ ৫৪৪ নম্বর নামজারি খতিয়ানের ৩৮১ নম্বর দাগের ০.০৭৩৩ একর জমি, যা কবির আহমদের নামে নামজারি করা হয়েছিল, তা বাতিল করে এসএ খতিয়ানে পুনর্বহালের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
একইভাবে, নামজারি রিভিউ মামলা নং ৯৩/২৪-২৫-এ ৫৫১ নম্বর নামজারি খতিয়ানের ৩৮১ নম্বর দাগের ০.০৩৬৫ একর জমি, যা নজির আলীর নামে নামজারি হয়েছিল, সেটিও বাতিল করে সাবেক এসএ ৭৬ নম্বর খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে, মামলার শুনানিকালে ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা ও উপজেলা ভূমি অফিসের সার্ভেয়ার সরেজমিন তদন্ত পরিচালনা করেন। তদন্তে এসএ রেকর্ড, মৌজা ম্যাপ, নিবন্ধিত দলিল, মাঠ পর্যায়ের বাস্তব অবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য নথিপত্র পর্যালোচনা করা হয়।
তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এসএ রেকর্ডভুক্ত মূল মালিকরা ১৯৬১ সালের একটি নিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট জমি তৎকালীন চিফ মেডিকেল অফিসারের অনুকূলে হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে হস্তান্তর করেছিলেন। ফলে ওই জমির ওপর পরবর্তীকালে অন্য ব্যক্তিদের নামে নামজারি সম্পন্ন হলেও তা আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য নয় বলে আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে।
সরেজমিন তদন্তে আরও দেখা যায়, বিতর্কিত ৩৮১ নম্বর দাগের প্রায় ২১ ফুট অংশ বর্তমানে হাসপাতালের বাউন্ডারি দেয়ালের ভেতরে রয়েছে এবং অবশিষ্ট অংশ বাউন্ডারির বাইরে অবস্থান করছে। তবে রেকর্ড, দলিল এবং জমির ইতিহাস পর্যালোচনায় প্রশাসন মনে করেছে, পুরো বিষয়টি বিবেচনায় সাবেক এসএ রেকর্ডই অধিক গ্রহণযোগ্য।
সহকারী কমিশনার (ভূমি) তাঁর আদেশে বলেন, রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০-এর বিধান এবং উপস্থাপিত কাগজপত্র, তদন্ত প্রতিবেদন ও আইনগত দিক বিশ্লেষণ করে প্রতীয়মান হয়েছে যে, পরবর্তীতে সৃষ্ট নামজারি খতিয়ান থেকে সংশ্লিষ্ট জমি কর্তন করে সাবেক এসএ ৭৬ নম্বর খতিয়ানে পুনর্বহাল করাই ন্যায়সংগত ও সমীচীন হবে।
এ সিদ্ধান্তের ফলে দীর্ঘদিন ধরে চলমান ভূমি-সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে। স্থানীয়দের মতে, হাসপাতালের জমি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অনিশ্চয়তা থাকায় বিভিন্ন সময় বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছিল। প্রশাসনের এই আদেশ ভবিষ্যতে সরকারি প্রতিষ্ঠানের জমি সংরক্ষণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলেও তারা আশা প্রকাশ করেছেন।
জানা গেছে, আদেশের অনুলিপি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা, উপজেলা ভূমি অফিসের সার্ভেয়ার, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা এবং মামলার সংশ্লিষ্ট পক্ষদের কাছে ইতোমধ্যে প্রেরণ করা হয়েছে।
ভূমি প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, সরকারি প্রতিষ্ঠানের জমি সংক্রান্ত যেকোনো বিরোধ নিষ্পত্তিতে রেকর্ড, নিবন্ধিত দলিল, মাঠ পর্যায়ের তদন্ত এবং বিদ্যমান আইনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়। কৈতক হাসপাতালের জমির ক্ষেত্রেও একই নীতির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে।
এদিকে, স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছে, সরকারি হাসপাতালের জমি সুরক্ষিত রাখতে এ ধরনের প্রশাসনিক পদক্ষেপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা হাসপাতালের অবশিষ্ট জমিও যথাযথভাবে সংরক্ষণ, সীমানা নির্ধারণ এবং ভবিষ্যতে যাতে কোনো ব্যক্তি অবৈধভাবে নামজারি বা দখলের চেষ্টা করতে না পারে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন।
Leave a Reply