ওসমানী বিমানবন্দরে ১৬ বছরের একচ্ছত্র রাজত্ব: হাফিজ আহমদের রামরাজত্বে ক্ষোভ বাড়ছে কর্মচারী ও স্থানীয়দের
নিজস্ব প্রতিবেদক:
সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গত ১৬ বছর ধরে একক কর্তৃত্বে পরিচালকের দায়িত্বে থাকা বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) কর্মকর্তা হাফিজ আহমদ এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। ক্ষমতার পালাবদলের পরও অদৃশ্য শক্তির আশ্রয়ে বহাল থেকে তিনি একাধারে অনিয়ম, দুর্নীতি, হয়রানি ও সিন্ডিকেট রাজত্বে বিমানবন্দরটিকে রীতিমতো ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
এক মাসের দায়িত্ব থেকে ১৬ বছরের সাম্রাজ্য সূত্র জানায়, ১৬ বছর আগে মাত্র এক মাসের জন্য অস্থায়ী দায়িত্বে ঢাকা থেকে সিলেট ওসমানী বিমানবন্দরে পাঠানো হয় হাফিজ আহমদকে। কিন্তু সেই অস্থায়ী দায়িত্বই এখন তার স্থায়ী রামরাজত্বে পরিণত হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী কোনো কর্মকর্তা এক জায়গায় সর্বোচ্চ তিন বছর দায়িত্ব পালনের সুযোগ পেলেও, হাফিজ আহমদ নিয়মের তোয়াক্কা না করে ১৬ বছর ধরে একই পদে বহাল আছেন।বেবিচকের মানবসম্পদ বিভাগ থেকেই নাকি এই রক্ষাকবচ আসে। অভিযোগ রয়েছে, মানবসম্পদ পরিচালককে “নজরানা” পাঠিয়েই তিনি বদলি ঠেকিয়ে রাখেন। মাসে মাসে নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা ঢাকায় পাঠানোর প্রথা রয়েছে বলেও অভ্যন্তরীণ সূত্র দাবি করছে। ক্ষমতার পালাবদলেও অটুট অবস্থান।গত ৫ আগস্ট আওয়ামী সরকারের পতনের পর দেশের প্রশাসনে বড় পরিবর্তন এলেও, সিলেট বিমানবন্দরে সেই পরিবর্তনের হাওয়া লাগেনি। অভিযোগ উঠেছে, হাফিজ আহমদ তখন আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের বহু নেতাকে বিমানবন্দর দিয়ে লন্ডনে পালিয়ে যেতে সহযোগিতা করেন।তবুও এখন তিনি বিএনপি ঘনিষ্ঠ একাধিক নেতার আশ্রয়ে থেকে নিজেকে “রুটিন পরিচালক” থেকে স্থায়ী পরিচালক করার স্বপ্নে বিভোর।
সিন্ডিকেট রাজত্ব ও কর্মচারী নির্যাতন বিমানবন্দরে হাফিজ আহমদের এক শক্তিশালী সিন্ডিকেট কাজ করছে বলে জানা গেছে। সিন্ডিকেট সদস্য হিসেবে নাম এসেছে জসিম, শাহেদ, তরিকুল ও অরুণের। পার্কিংয়ে অনিয়মের প্রতিবাদ করায় যোগাযোগ শাখার কর্মচারী রাজু মিয়াকে এই সিন্ডিকেট মারধর করে রক্তাক্ত জখম করে। এ ঘটনায় মামলা হলেও, শেষ পর্যন্ত প্রভাব খাটিয়ে তা “ধামাচাপা” পড়ে যায়।
রাজু মিয়া ছিলেন সিএটিসির সাবেক পরিচালক আব্দুল মান্নানের আপন ভাগিনা। কিন্তু পারিবারিক প্রভাবও হাফিজের সাম্রাজ্যের সামনে টেকেনি। আনসার সদস্য পিটিয়ে বিতর্কে কর্মচারী মৃত্যুর অভিযোগ হাফিজ আহমদের বিরুদ্ধে শুধু দুর্নীতি নয়, মানবিক নির্যাতনের অভিযোগও কম নয়।।সাবেক চেয়ারম্যান মফিদুর রহমানের আমলে এক রাতে মদ্যপ অবস্থায় কর্তব্যরত আনসার সদস্য হেলালকে মারধর করেন তিনি। এতে আনসার সদস্যদের মধ্যে বিদ্রোহের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। তদন্ত হলেও ফলাফল ‘অদৃশ্য চাপে’ হারিয়ে যায়।
অন্যদিকে, প্রযুক্তি সহকারী আজিজার রহমান অতিরিক্ত কাজের চাপ ও মানসিক নির্যাতনের ফলে মৃত্যুবরণ করেন বলেও অভিযোগ ওঠে। ঘটনাটি মীমাংসা করে ফেলতে সক্ষম হন সুচতুর পরিচালক।দুর্নীতির পাহাড় ও অর্থের জৌলুস সিলেট ওসমানী বিমানবন্দরের উন্নয়ন প্রকল্প, পরিবহন পুল, জ্বালানি সরবরাহ, দোকান বরাদ্দ, বিজ্ঞাপন ও বিল ভাউচার—সব জায়গায় হাফিজ আহমদের নাম ঘুরে ফিরে আসে।
অভিযোগ রয়েছে,প্রকল্পের কাজ না করেও বিল উত্তোলন করে ভাগ-বাটোয়ারা করা হয়,জ্বালানি তেল চুরি তার নৈমিত্তিক রুটিনে পরিণত হয়েছে,সরকারি গাড়ি তিনি ও তার ঘনিষ্ঠরা ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করেন,গাড়ি মেরামতের নামে ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি করে লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেন,এমনকি বিমানবন্দরের দোকান ও বাসাবাড়ি বরাদ্দেও প্রচুর অনিয়ম ও ঘুষবাণিজ্য চলে।সম্প্রতি বিজ্ঞাপনের জন্য নিয়ন সাইন চুক্তিতে বড় ধরনের অনিয়ম ফাঁস হলে, বেবিচকের সম্পত্তি শাখার উপপরিচালক ইসরাত জাহান পান্না তদন্ত শুরু করেছেন বলে জানা গেছে।
ব্যক্তিগত জীবনেও রহস্য ও বিতর্ক হাফিজ আহমদ চিরকুমার। তার বাড়ি মৌলভীবাজার জেলায় হলেও, তিনি দীর্ঘদিন ধরে নিজ জেলা সিলেটে চাকরি করছেন, যা সরকারি চাকরির নিয়মবিরোধী। রাজধানী ঢাকায় তার একাধিক ফ্ল্যাট, আর আমেরিকার নিউইয়র্কে বাড়ি ও গ্রিন কার্ড আছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। স্থানীয়দের ভাষায়—“বিমানবন্দরের চাকরি করে তিনি এখন শতকোটি টাকার মালিক।”বিমানবন্দরের পুরনো রেস্ট হাউসে তিনি একাই থাকেন। সেখানে গভীর রাতে অনিয়মিত পার্টি ও অতিথিদের আগমন ঘটে বলেও অভিযোগ রয়েছে। আনসার সদস্য হেলালকে মারধরের ঘটনাও সেখানেই ঘটে।
সাংবাদিকদের সঙ্গেও দুর্ব্যবহার।সিলেটের স্থানীয় এবং জাতীয় গণমাধ্যমের সিনিয়র সাংবাদিকদের সঙ্গেও হাফিজ আহমদের আচরণ বরাবরই অমার্জিত ও আক্রমণাত্মক। অনেক গণমাধ্যমে তার দুর্নীতির খবর প্রকাশিত হলেও, প্রতিবারই তিনি “প্রভাবশালী আশ্রয়দাতাদের” মাধ্যমে তা চাপা দিতে সক্ষম হয়েছেন।বিমানবন্দরের কর্মচারীরা বলেন, তিনি সবার ওপর রীতিমতো ভয় ও আতঙ্ক তৈরি করেছেন। কেউ মুখ খুললে বদলি বা শাস্তি হয়।”ক্ষমতার ছায়ায় অপ্রতিরোধ্য এক পরিচালক ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সহকারী অ্যারোড্রোম অফিসার হিসেবে বেবিচকে যোগ দেন হাফিজ আহমদ। এরপর থেকেই ধীরে ধীরে প্রভাব বিস্তার করতে থাকেন। একাধিক গোয়েন্দা রিপোর্ট ও প্রশাসনিক তদন্ত হয়েও তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।রাজনৈতিক ক্ষমতার ছায়া, প্রশাসনিক যোগসাজশ ও অর্থের প্রভাব—সব মিলিয়ে হাফিজ আহমদ আজ একজন মুকুটহীন সম্রাটে পরিণত হয়েছেন।ক্ষমতার পালাবদলের পর যেখানে সারাদেশে আওয়ামী ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের বদলি হচ্ছে, সেখানে সিলেট ওসমানী বিমানবন্দরে তিনি এখনও বহাল—এতে স্থানীয় জনমনে চরম ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দিয়েছে।স্থানীয়দের প্রশ্ন: “বেবিচকের অজানা হাত কার?” সিলেটের নাগরিক সমাজ, সাংবাদিক ও বিমানবন্দর কর্মীরা এখন প্রশ্ন তুলছেন—“বেবিচক কি এতটাই অক্ষম যে, এক ব্যক্তির দৌরাত্ম্য ঠেকাতে পারে না?”তারা দ্রুত তদন্ত করে হাফিজ আহমদের দুর্নীতি, অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিচার দাবি করেছেন। ওসমানী বিমানবন্দরের মতো আন্তর্জাতিক প্রবেশদ্বার যদি এক ব্যক্তির ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত হয়, তবে এটি শুধু সিলেট নয়, গোটা দেশের জন্যই একটি অশনিসঙ্কেত—মন্তব্য করছেন বিশ্লেষকরা।
Leave a Reply