২০৫৩ কোটি টাকার প্রকল্পে ‘হাওয়া’ উন্নয়ন
পিডিবির মেগা প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ,অভিযুক্ত প্রকৌশলীরা এখনো বহাল,
সিলেট প্রতিনিধি,
ছাতক ও সিলেট বিভাগে বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নেওয়া প্রায় ২ হাজার ৫৩ কোটি টাকার মেগা প্রকল্প ঘিরে ভয়াবহ অনিয়ম, দুর্নীতি ও লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন সিলেট অঞ্চলের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আব্দুল কাদির এবং প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলী জিয়াউল হক জিয়া। নানা অনিয়ম, ঘুষ বাণিজ্য ও প্রভাব খাটিয়ে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠলেও এখনো তারা নিজ নিজ পদে বহাল তবিয়তে দায়িত্ব পালন করছেন।
স্থানীয় সূত্র ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, সাবেক সরকারের সময় থেকেই একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এই প্রকল্পে অনিয়ম চালিয়ে আসছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়া, অফলাইনে টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা, কমিশন আদায় এবং টেন্ডার টেম্পারিংয়ের মতো গুরুতর অভিযোগ তাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে রয়েছে।
জানা গেছে, ২০১৭ সালে ঢাকা থেকে সিলেটে এসে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে যোগ দেন জিয়াউল হক জিয়া। এরপর প্রায় ৯ বছর ধরে তিনি একই প্রকল্পে দায়িত্ব পালন করছেন। অভিযোগ রয়েছে, এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে একটি শক্তিশালী ঠিকাদার সিন্ডিকেট গড়ে তুলে প্রকল্পের বিভিন্ন কাজে ব্যাপক অনিয়ম করেছেন তিনি ও তার সহযোগীরা। স্থানীয়দের অভিযোগ, টাঙ্গাইলের ঠিকাদার হাজী শহীদ তালুকদারসহ কয়েকজন ঘনিষ্ঠ ঠিকাদারকে দিয়ে প্রকল্পের অধিকাংশ কাজ করানো হয়। এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সরকারি তামার কেবল, বৈদ্যুতিক তার, ট্রান্সফরমার ও অন্যান্য লোহার সামগ্রী আত্মসাৎ করে ঢাকায় বিক্রি করার অভিযোগও উঠেছে।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রকল্পের মূল্যবান শত শত ড্রাম কেবল ও অন্যান্য সরঞ্জাম গায়েব হয়ে গেছে।
ভুক্তভোগী ঠিকাদারদের অভিযোগ, প্রকল্পের কোনো বিল ছাড় করাতে হলে নির্বাহী প্রকৌশলী জিয়াকে ২৫ থেকে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন দিতে হতো। ফাইলের সঙ্গে টাকা না দিলে মাসের পর মাস বিল আটকে রাখা হতো। অনেক ঠিকাদার ন্যায্য বিল পাওয়ার জন্য দীর্ঘদিন ধরে দপ্তরে দৌড়ঝাঁপ করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে প্রকল্পের আওতায় ছাতক, গোবিন্দগঞ্জ হয়ে সিলেট–সুনামগঞ্জ সড়কের পাশে রাউলী পর্যন্ত ৩৩ কেভি লাইনের কাজ শুরু হয় ২০১৮ সালে। পরিকল্পনা অনুযায়ী এক থেকে দুই বছরের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও সাত বছর পেরিয়ে গেলেও কাজ শেষ হয়নি।।প্রকল্পের নথি অনুযায়ী প্রায় ৩ হাজার ৬০০টি বিদ্যুতের খুঁটি স্থাপনের কথা থাকলেও বাস্তবে বসানো হয়েছে মাত্র প্রায় ৯০০টি। সড়কের পাশে এখনও অসংখ্য খুঁটি পড়ে থাকতে দেখা যায়। স্থানীয়দের দাবি, কাজ আংশিকভাবে সম্পন্ন করে পুরো কাজ দেখিয়ে বিল উত্তোলন করা হয়েছে।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে একই কাজের জন্য দ্বৈত বিল উত্তোলনের ঘটনায়। অভিযোগ রয়েছে, একটি কাজ প্রকল্প থেকে দেখিয়ে বিল তোলা হচ্ছে, আবার একই কাজ ডিভিশন অফিস থেকেও আলাদা করে দেখিয়ে বিল উত্তোলন করা হচ্ছে। এতে করে রাষ্ট্রের বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
এছাড়া প্রকল্পের আওতায় নতুন বিদ্যুৎ লাইন ও ট্রান্সফরমার বসানোর নামে গ্রাহকদের কাছ থেকেও মোটা অঙ্কের টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। ছাতক, দোয়ারাবাজার, জগন্নাথপুর, দিরাই ও শান্তিগঞ্জ এলাকায় নতুন লাইন বসাতে ৪ থেকে ৫ লাখ এবং ট্রান্সফরমার বসাতে ৬ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয়দের দাবি, এভাবে প্রায় ৪০ কোটি টাকার বেশি ঘুষ আদায় করা হয়েছে। এই মেগা প্রকল্পে অনিয়ম, ভুয়া বিল উত্তোলন ও দুর্নীতির অভিযোগে ইতোমধ্যে তদন্ত শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
এসব অভিযোগের তালিকায় প্রকল্প সংশ্লিষ্ট প্রায় ২০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ঠিকাদারের নাম রয়েছে। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কাছেও লিখিত অভিযোগ জমা দেওয়া হয়েছে।এদিকে স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, বিদ্যুৎ উন্নয়নের নামে নেওয়া এই হাজার কোটি টাকার প্রকল্পে যদি সত্যিই অনিয়ম হয়ে থাকে, তবে দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে লুট হওয়া সরকারি অর্থ উদ্ধার করারও দাবি জানিয়েছেন তারা।
তবে অভিযোগ সত্যতা অস্বীকার করেছেন প্রকল্প পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) চন্দন কুমার সূত্রধর। তিনি বলেন, “আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সঠিক নয়। তবে প্রকল্পে কোনো অনিয়ম হয়ে থাকলে তা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
অন্যদিকে নির্বাহী প্রকৌশলী জিয়াউল হক জিয়া অভিযোগের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আব্দুল কাদিরের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি ব্যস্ততার কথা বলে ফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন।
স্থানীয়দের প্রশ্ন—জনগণের করের টাকায় নেওয়া এই মেগা প্রকল্প কি সত্যিই বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান করবে, নাকি দুর্নীতির আরেকটি নজির হয়ে ইতিহাসে জায়গা নেবে?
Leave a Reply