১৯শত কোটি টাকার বিদ্যুৎ প্রকল্পে লুটপাটের অভিযোগ: কাদির–জিয়া সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে তোলপাড়
ছাতক (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি:
সুনামগঞ্জ ও সিলেট অঞ্চলে প্রায় ১ হাজার ৯০০ কোটি টাকার বিদ্যুৎ উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নকে ঘিরে ব্যাপক দুর্নীতি, ঘুষ বাণিজ্য ও অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বিদ্যুৎ উন্নয়নের নামে বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পটি কার্যত একটি বড় ধরনের লুটপাটে পরিণত হয়েছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন সিলেট অঞ্চলের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আব্দুল কাদির, নির্বাহী প্রকৌশলী জিয়াউল হক জিয়া এবং ঠিকাদারদের নিয়ে গড়ে ওঠা একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট।
ইতোমধ্যে এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মহাপরিচালকের কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ পাঠানো হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, সুনামগঞ্জ ও সিলেটের বিভিন্ন উপজেলায় বাস্তবায়নাধীন বিদ্যুৎ উন্নয়ন প্রকল্পে শত কোটি টাকার অনিয়ম ও দুর্নীতির ঘটনা ঘটেছে।
প্রকল্প ঘিরে অনিয়মের অভিযোগ
অভিযোগ অনুযায়ী, ছাতক, দোয়ারাবাজার, জগন্নাথপুর, শান্তিগঞ্জ, দিরাই, সুনামগঞ্জ সদর এবং সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার আংশিক এলাকায় বাস্তবায়নাধীন ‘সেন্ট্রাল জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন প্রজেক্ট’ এখন দুর্নীতির অভিযোগে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্পটির বিভিন্ন কাজ বাস্তবায়নের নামে প্রায় ৪০ কোটি টাকার ঘুষ বাণিজ্য হয়েছে। এ ঘটনায় অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এস এ এন্টারপ্রাইজের মালিক হাজী শহীদ তালুকদার, হাইওয়ে কোম্পানির আব্দুল হাই, ভাঙারি ব্যবসায়ী শফিকুল ইসলাম ও সিরাজুল ইসলামসহ প্রায় ২০ জনের একটি প্রভাবশালী চক্র। অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পের কাজের আড়ালে সরকারি মালামাল আত্মসাৎ, নিম্নমানের সরঞ্জাম ব্যবহার এবং গ্রাহকদের কাছ থেকে অবৈধভাবে টাকা আদায়ের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।
সরকারি মালামাল পাচারের অভিযোগ
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রকল্পের জন্য আনা নতুন তামার তার ও বিভিন্ন সরকারি মালামাল নিয়মিতভাবে ঢাকা নিয়ে বিক্রি করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ঠিকাদার হাজী শহীদ তালুকদার প্রায়ই ঢাকা মেট্রো–ড ১২–২৮৬৩ নম্বর ট্রাকে এসব মালামাল ঢাকায় পাঠাতেন।স্থানীয়দের দাবি, প্রকল্পের অনেক মূল্যবান সরঞ্জাম ভাঙারি হিসেবে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। এতে সরকারের বিপুল পরিমাণ অর্থের ক্ষতি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সাত বছরেও শেষ হয়নি প্রকল্প
প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮ সালে শুরু হওয়া এ প্রকল্পটি মূলত এক বছরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নানা অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির কারণে সাত বছর পেরিয়ে গেলেও প্রকল্পের কাজ এখনো শেষ হয়নি।
প্রকল্প পরিকল্পনা অনুযায়ী ৩ হাজার ৬০০টি বিদ্যুতের খুঁটি বসানোর কথা থাকলেও বাস্তবে বসানো হয়েছে মাত্র ৯০০টি। বাকি খুঁটিগুলো কোথায় গেছে—এ প্রশ্নের জবাব দিতে পারেননি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মাঠপর্যায়ে কাজের অগ্রগতি খুবই ধীরগতির। অনেক এলাকায় এখনো পুরনো লাইন দিয়েই বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে, যা প্রায়ই দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
নতুন লাইন দিতে ঘুষের অভিযোগ
স্থানীয় গ্রামবাসীদের অভিযোগ, নতুন বিদ্যুৎ সংযোগ বা লাইন স্থাপনের জন্য গ্রাহকদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নেওয়া হচ্ছে। ছাতক, দোয়ারাবাজার, জগন্নাথপুর, দিরাই ও শান্তিগঞ্জ উপজেলার অন্তত ১৫০টির বেশি গ্রামে এ ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। গ্রামবাসীদের দাবি, নতুন বিদ্যুতের খুঁটি ও লাইন বসানোর জন্য ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা এবং একটি ট্রান্সফরমার বসাতে ৬ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়া হয়েছে। এভাবে বিভিন্ন গ্রাম থেকে প্রায় ৪০ কোটি টাকার বেশি অর্থ আদায় করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যুৎ লাইন
চেচান, রাজনপুর, গন্ধভপুর, খিদাকাপন, পিঠাখাই, বাউর ও দেওকাপনসহ বিভিন্ন গ্রামের বাসিন্দারা জানান, টাকা দিলে দ্রুত খুঁটি ও লাইন বসানো হয়। আর টাকা না দিলে বাঁশের খুঁটি দিয়ে ঝুলন্ত তারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ নিতে বাধ্য করা হয়।
এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ লাইনের কারণে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বিদ্যুৎ বিভাগের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বিষয়টি জেনেও কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছেন না।
নিম্নমানের সরঞ্জাম ব্যবহারের অভিযোগ
প্রকল্পের আওতায় নতুন সরঞ্জাম ব্যবহারের কথা থাকলেও অনেক এলাকায় পুরনো ট্রান্সফরমার, ব্যবহৃত ব্রেকার এবং নিম্নমানের তার বসানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয়দের দাবি, এসব নিম্নমানের সরঞ্জাম ব্যবহার করে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। ফলে বিদ্যুৎ সরবরাহে বারবার সমস্যা দেখা দিচ্ছে।
কর্মকর্তাদের বক্তব্য
এ বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী জিয়াউল হক জিয়ার সঙ্গে মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। অন্যদিকে পিডিবির একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, প্রকল্পে অনিয়ম ও ঘুষ বাণিজ্যের ঘটনা ঘটেছে। প্রকল্প সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও বিষয়টি সম্পর্কে অবগত রয়েছেন বলে তারা দাবি করেন। এ বিষয়ে সিলেট পিডিবির অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আব্দুল কাদিরের ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
জাইকার অর্থায়নে প্রকল্প
জানা গেছে, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা জাইকার অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন এ প্রকল্পের মেয়াদ ছিল পাঁচ বছর। তবে কাজের ধীরগতির কারণে ইতোমধ্যে প্রকল্পটির মেয়াদ দুইবার বাড়ানো হয়েছে। তবুও মাঠপর্যায়ে কাজের অগ্রগতি আশানুরূপ নয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
গ্রামবাসীর দাবি তদন্ত ও শাস্তি
এদিকে বিদ্যুৎ উন্নয়নের নামে দুর্নীতির অভিযোগে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তারা দ্রুত প্রকল্পটির সুষ্ঠু তদন্ত, দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তার এবং লুট হওয়া সরকারি অর্থ উদ্ধার করার দাবি জানিয়েছেন। স্থানীয়দের মতে, এ ধরনের বড় প্রকল্পে দুর্নীতি হলে সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই সরকার যদি দ্রুত তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে ভবিষ্যতেও এ ধরনের অনিয়ম চলতে থাকবে।এখন দেখার বিষয়—সরকার এ অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়, নাকি অন্য অনেক ঘটনার মতো এ ঘটনাও শেষ পর্যন্ত চাপা পড়ে যায়।
Leave a Reply