সুনামগঞ্জের নতুন পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করলেন আবু বসার মোহাম্মদ জাকির হোসেন,পিপিএম-সেবা
মসুনামগঞ্জ | শনিবার, ২৯ নভেম্বর ২০২৫
সুনামগঞ্জ জেলার নতুন পুলিশ সুপার (এসপি) হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন লালমনিরহাটের কৃতিসন্তান আবু বসার মোহাম্মদ জাকির হোসেন, পিপিএম-সেবা। শনিবার (২৯ নভেম্বর) সন্ধ্যায় সুনামগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে বিদায়ী পুলিশ সুপার তোফায়েল আহাম্মেদ-এর কাছ থেকে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। আনুষ্ঠানিক এই দায়িত্ব হস্তান্তরের মাধ্যমে জেলার আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো। দায়িত্ব গ্রহণ অনুষ্ঠান ও পরিচিতি সভা দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই পুলিশ সুপার কার্যালয়ের কনফারেন্স রুমে জেলার সকল ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, সার্কেল ASP এবং থানার অফিসার ইনচার্জদের নিয়ে এক পরিচিতি সভার আয়োজন করা হয়। সভায় নবাগত পুলিশ সুপার সবার সঙ্গে পরিচিত হন এবং জেলা পুলিশের সার্বিক কার্যক্রম নিয়ে বিস্তৃত আলোচনায় অংশ নেন।
তিনি কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেন—”সুনামগঞ্জ একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমান্তবর্তী জেলা। আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা, মাদক ও মানবপাচার রোধ, চোরাচালান প্রতিরোধ এবং সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই হবে আমাদের প্রধান দায়িত্ব। জনগণের আস্থা অর্জনই হবে আমাদের মূল শক্তি।”নবাগত এসপি আরও উল্লেখ করেন, জেলা পুলিশের প্রতিটি সদস্যকে পেশাদারিত্ব, সততা এবং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা নিয়ে কাজ করতে হবে। তিনি থানাগুলোতে সেবার মান উন্নয়ন, ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারের কার্যকারিতা বৃদ্ধি, সাইবার অপরাধ দমন, নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ এবং শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠনে কমিউনিটি পুলিশিং জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। উষ্ণ অভ্যর্থনা ও শুভেচ্ছা বিনিময়
দায়িত্বগ্রহণ উপলক্ষে পুলিশ সুপার কার্যালয় প্রাঙ্গণে এক সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ তৈরি হয়। নবাগত এসপি কার্যালয়ে পৌঁছালে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) রাকিবুল হাসান রাসেল, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) তাপস রঞ্জন ঘোষ এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) জাকির হোসাইন তাঁকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান। উপস্থিত কর্মকর্তা, কর্মচারী ও বিভিন্ন ইউনিটের প্রতিনিধিরাও নবাগত পুলিশ সুপারকে অভিনন্দন জানান।
জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা আশা প্রকাশ করেন যে, তাঁর নেতৃত্বে সুনামগঞ্জে আইনশৃঙ্খলা আরও সুদৃঢ় হবে এবং অপরাধ দমন কার্যক্রম নতুন গতি পাবে। এ সময় বিদায়ী পুলিশ সুপার তোফায়েল আহাম্মেদ সুনামগঞ্জে নিজের দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে নতুন এসপির সফলতা কামনা করেন।
কর্মজীবনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস আবু বসার মোহাম্মদ জাকির হোসেন, পিপিএম-সেবা ২৫তম বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ২০০৬ সালে সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) হিসেবে বাংলাদেশ পুলিশে যোগদান করেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি মাঠপর্যায়ের নেতৃত্ব, গোয়েন্দা তদন্ত এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় বিশেষ দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। পেশাগত সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি একাধিকবার দায়িত্ব পালনকালে প্রশংসাপত্র, পদক ও পুরস্কার অর্জন করেছেন।
সুনামগঞ্জে যুক্ত হওয়ার আগে তিনি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই), রংপুর জেলা-তে পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সেখানে জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ মামলার তদন্তে তাঁর নেতৃত্ব বিশেষ সাফল্য এনে দেয়। অপরাধ তদন্তে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির প্রয়োগ, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা বৃদ্ধিতে তাঁর ভূমিকা ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়।
এ ছাড়া বিভিন্ন জেলা, মেট্রোপলিটন ইউনিট এবং বিশেষায়িত শাখায় দায়িত্ব পালন করে তিনি প্রশাসনিক ও পরিচালনাগত অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ হয়েছেন। তাঁর মতে—পুলিশ সেবা এখন শুধু আইন প্রয়োগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং জনগণের আস্থা অর্জন করাই আধুনিক পুলিশের প্রধান লক্ষ্য।”সুনামগঞ্জের মতো জেলার জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ তাঁর নেতৃত্ব হাওরবেষ্টিত, সীমান্ত সংলগ্ন এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ সুনামগঞ্জে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব অন্যান্য জেলার তুলনায় অধিক চ্যালেঞ্জিং। বন্যা, বর্ষায় জনপথ বিচ্ছিন্নভাবে থাকা, সীমান্ত দিয়ে চোরাচালান ইত্যাদি এই জেলার সাধারণ সমস্যা। এছাড়া রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা মিলিয়ে অপরাধ দমন কার্যক্রমে পুলিশকে প্রায়ই বিশেষ কৌশল গ্রহণ করতে হয়।
নবাগত এসপি তাঁর বক্তৃতায় উল্লেখ করেন যে—
অপরাধ দমনে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হবে
থানায় দ্রুত সেবা নিশ্চিত করতে ওটিএস (ওয়ান-স্টপ সার্ভিস) আরও কার্যকর করা হবে মাদক ও সীমান্ত অপরাধ দমনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে নারী ও শিশুর নিরাপত্তায় বিশেষ টিম আরও শক্তিশালী করা হবে
কমিউনিটি পুলিশিং-এর মাধ্যমে জনসম্পৃক্ততা বৃদ্ধি করা হবে
অপরাধ দমন ও জনসেবা—দুই মিশন নিয়ে যাত্রা শুরু
পরিচিতি সভায় নবাগত পুলিশ সুপার বলেন—সুনামগঞ্জবাসীর শান্তি-নিরাপত্তার দায়িত্ব এখন আমার কাঁধে। আমি চাই পুলিশের প্রতিটি সদস্য জনগণের বন্ধু হয়ে কাজ করুক। থানায় যেন কেউ অবহেলা বা হয়রানির শিকার না হয়, সে বিষয়ে আমরা কঠোর নজরদারি চালাব।”তিনি আরও জানান, হাওর অঞ্চলে দুর্যোগকালীন পুলিশি সেবা বাড়ানো হবে এবং দুর্গম এলাকায় টহল ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হবে। সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণে জেলা পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিটকে আধুনিকায়ন এবং প্রশিক্ষণ বাড়ানোরও ঘোষণা দেন তিনি। জেলা পুলিশের প্রত্যাশা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
সুনামগঞ্জ জেলা পুলিশ বিশ্বাস করে, নতুন পুলিশ সুপার তাঁর সততা, দৃঢ়তা এবং পেশাদারিত্ব দিয়ে জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে আরও উন্নত করবেন। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, জনপ্রতিনিধি, গণমাধ্যম এবং স্থানীয় মানুষের সহযোগিতায় একটি নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ ও আধুনিক সুনামগঞ্জ গঠনে তিনি সফলভাবে কাজ করতে পারবেন—এমন প্রত্যাশা সকলের। ভবিষ্যৎ বার্তা।দায়িত্ব গ্রহণের শেষে এসপি আবু বসার মোহাম্মদ জাকির হোসেন জেলার মানুষের জন্য একটি বার্তা দেন—আমি সবার সহযোগিতা চাই। পুলিশ একা কিছু করতে পারে না। জনগণই আমাদের শক্তি। আসুন, সুনামগঞ্জকে অপরাধমুক্ত, শান্তিপূর্ণ এবং নিরাপদ জেলা হিসেবে গড়ে তুলি।”
Leave a Reply