সুনামগঞ্জ–২ নির্বাচন ঘিরে উত্তেজনার বিস্ফোরণ
ডিসি ইলিয়াস মিয়াকে কেন্দ্র করে নতুন বিতর্ক—বিপাকে বিএনপির পাঁচ প্রার্থী, ইসিতে লিখিত অভিযোগ দায়ের
নিজস্ব প্রতিবেদক:
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে দেশজুড়ে রাজনৈতিক মাঠ। ব্যালটযুদ্ধের আগুনে যখন দেশজুড়ে সর্বত্র নানামুখী প্রস্তুতি, ঠিক সেই সময় সুনামগঞ্জে রাজনৈতিক অঙ্গন এক অভূতপূর্ব ঝড়ের কেন্দ্রবিন্দুতে। এ ঝড়ের মূল চরিত্র—জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া। প্রশাসনপ্রধানকে ঘিরে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, রাজনৈতিক পক্ষপাত এবং হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করার মতো বিস্ফোরক সব অভিযোগ এখন সুনামগঞ্জের রাজনীতিকে প্রায় অগ্নিগর্ভ করে তুলেছে।
সবচেয়ে বড় ঘটনা—পরিবেশকর্মী খোরশেদ আলমের করা এক বিস্তারিত লিখিত অভিযোগ, যা নির্বাচন কমিশনে (ইসি) জমা পড়ার পর থেকেই নতুন করে আলোচনার বিস্ফোরণ ঘটেছে। সুনামগঞ্জ–২ কেন্দ্রিক নির্বাচন এখন পরিণত হয়েছে সারা দেশের রাজনৈতিক আলোচনার অন্যতম প্রধান ইস্যুতে।
‘অদৃশ্য শক্তির সুরক্ষা’—সুনামগঞ্জে বদলি না হওয়া নিয়েও প্রশ্ন ? অভিযোগকারীরা স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন— দেশজুড়ে নির্বাচন-সংকট মোকাবিলায় বহু জেলা প্রশাসক, ইউএনও ও এসিল্যান্ডকে বদলি করা হলেও সুনামগঞ্জে নাকি “একটি বিশেষ প্রশাসনিক মহল” অজানা শক্তির ছায়ায় টিকে আছে। অভিযোগকারীদের মতে, এ মহল প্রকাশ্যেই একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের স্বার্থরক্ষায় মাঠে সক্রিয়, যা নির্বাচনকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। তাদের ভাষায়—“নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে প্রশাসনের এমন একপেশে ভূমিকা সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য ভোট নিশ্চিত করার পথকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।”
এই দাবি শুধু একজন ব্যক্তির নয়; বিএনপির কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় একাধিক নেতা, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, এমনকি জুলাই আন্দোলনের কর্মীরাও একই অভিযোগ তুলেছেন।
অভিযোগের বিস্ফোরণ—বালুমহাল, আদালত অবমাননা, পলাতক আসামি এবং ক্ষমতার বৃত্ত খোরশেদ আলম তার অভিযোগপত্রে যে বিষয়গুলো উল্লেখ করেছেন, সেগুলো যে কোনো জেলার প্রশাসনকে নড়বড়ে করে দেওয়ার মতো:
১. পলাতক আসামি শাহ রুবেলকে ‘নাগালে পেলেও’ সোপর্দ না করার অভিযোগ ঢাকায় ছাত্র আন্দোলনে সংঘটিত এক হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি শাহ রুবেলকে নাকি জেলা প্রশাসক নিজে ‘নাগালে পেলেও’ পুলিশের হাতে তুলে দেননি—এমন অভিযোগ তুলে তিনি আইনের শাসন প্রশ্নে সরাসরি আঘাত হেনেছেন।২. যাদুকাটা নদীর সবচেয়ে বড় বালুমহাল ইজারা নিয়ে প্রশ্ন হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে রুবেলের নামেই বালুমহাল ইজারা কার্যকর করা হয়েছে—এ অভিযোগ আরও বড় আলোড়ন তোলে। অভিযোগকারীরা এটিকে “জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা” বলে আখ্যায়িত করেছেন। ৩. দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে একাধিক তদন্ত চলছে—অভিযোগকারীদের দাবি তাদের ভাষায়, জেলা প্রশাসকের বিরুদ্ধে দুদক, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়—তিন জায়গাতেই নাকি বিভিন্ন অভিযোগ তদন্তাধীন।
৪. ব্যক্তিগত প্রেক্ষাপট নিয়েও সন্দেহের তীর অভিযোগকারীর দাবি—ফরিদপুর–৪ আসনের সাবেক এমপি মুজিবুর রহমান চৌধুরী নিক্সনের সঙ্গে ইলিয়াস মিয়ার দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠতা আছে। আরও বড় অভিযোগ—তিনি নাকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্র ছিলেন, যিনি বর্তমানে সুনামগঞ্জ–২ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা এক প্রার্থীর ‘ক্লাসমিট’। সেই বন্ধুত্বের জোরে এখন প্রশাসনকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে—এমন দাবিও তুলেছেন তারা।
সবমিলিয়ে অভিযোগকারীদের বক্তব্য—এটি ব্যক্তিগত সম্পর্কের ক্ষমতার নেটওয়ার্ক, যা প্রশাসনকে নিরপেক্ষতা থেকে সরিয়ে দিয়েছে। প্রশাসনের বিরুদ্ধে অভিযোগ: ‘বিএনপি-বান্ধব প্রার্থীদের পরিকল্পিতভাবে কোণঠাসা’ সুনামগঞ্জ–২ আসনের সাবেক এমপি ও বিএনপি প্রার্থী নাছির উদ্দিন চৌধুরীসহ দলের পাঁচ এমপি প্রার্থী দাবি করেছেন—তাদের প্রচারণায় প্রশাসনিক বাধা দেওয়া হচ্ছে, সভা-সমাবেশে অযথা অনুমতির জটিলতা তৈরি হচ্ছে, অঘোষিত নজরদারিতে রাখা হচ্ছে তাদের কর্মীদের।
জুলাইযোদ্ধাদের অভিযোগ আরও তীব্র—প্রশাসন পক্ষপাতিত্বের সীমা ছাড়িয়ে রাজনৈতিক খেলোয়াড়ে পরিণত হয়েছে।”
ডিসি ইলিয়াস মিয়ার প্রতিক্রিয়া:এসব ভিত্তিহীন, প্রমাণহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিস্ফোরক অভিযোগের পর জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া গণমাধ্যমকে যে প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন, তা সমান বিতর্ক তৈরি করেছে।
বালুমহাল নিয়ে তার অবস্থান—সর্বোচ্চ দরদাতা ইজারা পেয়েছেন, তাই কোনো অনিয়মের সুযোগ নেই”—এমনই দাবি তার।শাহ রুবেল বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নে তীব্র প্রতিক্রিয়া—
তিনি পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে বলেন:রুবেল কি আপনাদের কাছে কোনো অভিযোগ করেছে? না করলে আপনাদের সমস্যা কী?”তার এই মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
দুই মাস আগেই আরও একটি অভিযোগ পত্র জমা পড়ে ইসিতে ২০২৫ সালের ২০ নভেম্বরও ইসিতে জেলা প্রশাসকের বিরুদ্ধে ১৪ দফা অভিযোগ জমা হয়েছিল। এবার দ্বিতীয়বারের মতো অভিযোগ উঠল, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
ইসি সূত্র জানিয়েছে— অভিযোগপত্রটি এখন প্রাথমিক যাচাই-বাছাইয়ের পর্যায়ে, প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে ব্যাখ্যা চাওয়া হবে।সাধারণ মানুষ কী বলছে? প্রশাসন পক্ষপাতহীন না হলে ভোটের গ্রহণযোগ্যতা ধুলিস্যাৎ হয়ে যাবে’গ্রামাঞ্চলের ভোটার থেকে শুরু করে শহরের তরুণ সমাজ—সবার কথা একটাই“ভোট শান্তিপূর্ণ ওপ্রতিযোগিতামূলক হোক।” কিন্তু একই সঙ্গে তাদের গভীর উদ্বেগও স্পষ্ট—
“যদি অভিযোগ সত্য হয়, তবে প্রশাসনের ভূমিকা পুরো নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা ধ্বংস করে দেবে। একজন স্থানীয় ব্যবসায়ী বলেন—ভোটের আগের এমন উত্তেজনায় আমরা কখনো পড়িনি। প্রশাসনকে কেন্দ্র করে অদ্ভুত এক অবিশ্বাসের পরিবেশ তৈরি হয়েছে।সারসংক্ষেপ—সুনামগঞ্জ এখন নির্বাচনী ভূকম্পনের এপিসেন্টার সব মিলিয়ে সুনামগঞ্জ–২ মাত্র একটি আসন নয়;এখন এটি জাতীয় রাজনীতির উত্তেজনার কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে থাকা একটি জনপদ। অভিযোগ–প্রতিবাদ, পাল্টা অভিযোগ, প্রশাসনের অস্বীকার, রাজনৈতিক চাপ, তদন্তের দাবি—সব মিলিয়ে এই জেলার নির্বাচনী পরিবেশ মুহূর্তে মুহূর্তে বদলে যাচ্ছে।
নির্বাচন এখন দরজায় কড়া নাড়ছে— এর আগে নির্বাচন কমিশন কী সিদ্ধান্ত নেয়, তদন্ত কোন দিকে যায়, প্রশাসনের অবস্থানে কোনো পরিবর্তন আসে কিনা—এসবই এখন সুনামগঞ্জের জনগণ থেকে শুরু করে পুরো দেশের রাজনৈতিক মহলের নজর কাড়ছে। একটি প্রশ্নই এখন বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে—এই পরিস্থিতিতে সুনামগঞ্জ–২ কি আদৌ নিরপেক্ষ,প্রতিযোগিতামূলক এবং শান্তিপূর্ণ নির্বাচন দেখতে পারবে?
Leave a Reply