সিলেট-ছাতক রেলপথ সংস্কারের মেয়াদ শেষ, কাজ মাত্র ২০ শতাংশ—ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ধীরগতিতে অনিশ্চয়তা
ছাতক প্রতিনিধি:
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর শুরু হওয়া সিলেট-ছাতক রেলপথ সংস্কার ও পুনর্বাসন প্রকল্পের নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হলেও কাজ এগিয়েছে মাত্র ২০ শতাংশ। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সংকট ও ধীরগতির কারণে নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পটি শেষ করা সম্ভব হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
ফলে গুরুত্বপূর্ণ এই রেলপথের সংস্কারকাজ নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন অনিশ্চয়তা। ২৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে নেওয়া প্রকল্পটি ২০২৫ সালের ২ জানুয়ারি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অনুমোদন পায়। ১৮ মাসের নির্ধারিত মেয়াদ অনুযায়ী গত ২০২৬ সালে ২৩ আগস্ট প্রকল্পের সময়সীমা শেষ হয়েছে।
তবে কাজের অগ্রগতি আশানুরূপ না হওয়ায় আরও ১০ মাস সময় বাড়ানোর আবেদন করেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মীর আখতার হোসেন লিমিটেড। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সিলেট থেকে ছাতক পর্যন্ত ৩৩ কিলোমিটার রেলপথে থাকা ১০টি কালভার্টের মধ্যে চারটির কাজ শেষ হয়েছে। অন্যগুলোর কাজ চলছে আংশিকভাবে। একই সঙ্গে খাজাঞ্চিগাঁও, ছাতক ও আফালাবাদ—এই তিনটি স্টেশনের আধুনিকায়ন শুরু হলেও অগ্রগতি প্রায় ২০ শতাংশ।
৩৩ কিলোমিটার রেললাইনের মধ্যে ১৩ কিলোমিটারের মাটির কাজ শেষ হয়েছে। আরও সাড়ে ১০ কিলোমিটারে মাটির কাজ চলমান থাকলেও প্রায় সাড়ে ৯ কিলোমিটার অংশে এখনো কাজ শুরু হয়নি। নতুন স্লিপার স্থাপন, ক্ষতিগ্রস্ত রেলট্র্যাক ও ব্যালাস্ট পুনর্নির্মাণ এবং স্টেশন আধুনিকায়নসহ প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি মাত্র ২০ শতাংশ বলে জানা গেছে।
প্রকল্পের আওতায় প্রায় ১১০ কোটি টাকা ব্যয়ে চীন থেকে রেললাইন ও প্রয়োজনীয় সংযোগকারী যন্ত্রাংশ কেনার কথা থাকলেও এখনো এসব মালামাল সিলেটে পৌঁছায়নি। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রকল্প ব্যবস্থাপক আবুল কালাম আজাদ জানান, প্রকল্পের মেয়াদ আরও ১০ মাস বাড়ানোর জন্য আবেদন করা হয়।
বর্ষা শেষে অতিরিক্ত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করার লক্ষ্যে কাজ জোরদার করা হবে। তাঁর দাবি, প্রায় ৫ কোটি টাকার মালামাল চট্টগ্রাম বন্দর থেকে খালাস হয়েছে এবং কয়েক দিনের মধ্যে সিলেটে পৌঁছাবে। তবে এ দাবির পক্ষে কোনো নথি দেখাতে তিনি রাজি হননি।
প্রকল্প পরামর্শক টিমের লিডার মো. আনার মাহমুদ জানান, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সংকটের কারণে কাজের গতি কমেছে। বারবার তাগাদা দেওয়া হলেও তারা নির্ধারিত গতিতে কাজ করতে পারেনি। এমনকি প্রকল্পটি বাতিল হয়ে যেতে পারে বলেও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
১৯৫৪ সালে মিটারগেজ রেললাইন চালুর পর সিলেট ও সুনামগঞ্জের কৃষি ও শিল্প অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এই রেলপথ। ছাতকের বাংলাবাজার, খাজাঞ্চিগাঁওসহ বিভিন্ন এলাকার কৃষকরা ট্রেনে করে সিলেটে কৃষিপণ্য নিয়ে যেতেন। পাশাপাশি ছাতকের বিভিন্ন শিল্প-কারখানার পণ্য পরিবহনেও রেলপথটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
২০২২ সালের ভয়াবহ বন্যায় প্রায় ১২ কিলোমিটার রেলওয়ে এমব্যাংকমেন্ট ও রেলপথ ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হলে যোগাযোগ পুরোপুরি বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। দীর্ঘদিন ধরে ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকায় দুর্ভোগে পড়েছেন দুই অঞ্চলের মানুষ।
যুবদলের নেতা আব্দুল সাক্তার বলেন, আগে মাত্র ১২ টাকা ভাড়ায় ছাতক থেকে সিলেট যাওয়া যেত। এখন সড়কপথে ৮০ থেকে ১২০ টাকা পর্যন্ত ভাড়া গুনতে হচ্ছে। বিশেষ করে মুমূর্ষু রোগী, শিশু ও বয়স্কদের নিয়ে যাতায়াতে চরম ভোগান্তি হচ্ছে।
এলাকাবাসীর দাবি, আর সময়ক্ষেপণ না করে দ্রুত সংস্কারকাজ শেষ করে সিলেট-ছাতক রেলপথে পুনরায় ট্রেন চলাচল চালু করতে হবে। এর আগে গত ৯ মে সড়ক পরিবহন ও রেলপথ প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ (হাবিব) এমপি রেল যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন ও বিভিন্ন প্রকল্প পরিদর্শনে ট্রেনযোগে সিলেট সফর করেন। এ সময় সিলেট রেলস্টেশনসংলগ্ন মীর আখতার হোসেন লিমিটেডের কার্যালয়ে প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। জনদুর্ভোগের কথা বিবেচনায় নিয়ে প্রকল্পটি বাতিল না করে দ্রুত কাজ শেষ করার জন্য সংশ্লিষ্টদের তাগাদা দেওয়া হয়। কিন্তু মেয়াদ শেষ হলেও কাজের অগ্রগতি মাত্র ২০ শতাংশ হওয়ায় এখন প্রশ্ন উঠেছে—আর কতদিন অপেক্ষা করতে হবে সিলেট-ছাতক রেলপথে ট্রেন চলাচলের জন্য?
এব্যাপারে সিলেট রেলওয়ের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মাসুদ পারভেজ বলেন, “৯৬টি ফাইলিং পয়েন্টের মধ্যে ৮৫টির কাজ শেষ হয়েছে। মাটি ভরাট ও কালভার্টের কাজও দ্রুত চলছে।”এ প্রকল্পের ২০ ভাগ হচ্ছে। বাকী ৮০ভাগ কাজ বাকি রয়েছে। প্রকল্পের মেয়াদ গত ২৩ আগস্ট শেষ হচ্ছে।####
Leave a Reply