শহীদ জেহাদ দিবস: স্বৈরাচারবিরোধী
আন্দোলনের অগ্নিশিখা
নিজস্ব প্রতিবেদক:
আজ শহীদ জেহাদ দিবস। নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী গণআন্দোলনের অন্যতম সাহসী ও আত্মত্যাগী তরুণ নেতা শহীদ নাজির উদ্দিন জেহাদকে স্মরণ করার দিন। এ দিনে জাতি শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছে সেই বীর তরুণকে, যার বুকের রক্তে রচিত হয়েছিল বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক পুনর্জাগরণের ইতিহাস।
১৯৯০ সালের এই দিনে, স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলনের উত্তাল মিছিলে পুলিশের গুলিতে নিহত হন শহীদ জেহাদ। মাত্র ২৪ বছরের এই ছাত্রনেতার আত্মত্যাগই পরবর্তীতে এক ঐক্যবদ্ধ গণঅভ্যুত্থানের জন্ম দেয়, যার ঢেউয়ে ভেসে যায় এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা সামরিক স্বৈরশাসনের কঙ্কাল।
এক তরুণের আত্মাহুতি, এক জাতির জাগরণ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এবং তৎকালীন ছাত্রদলের কর্মী নাজির উদ্দিন জেহাদ ছিলেন এক নির্ভীক ও আদর্শবাদী তরুণ। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন তখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। রাস্তায় রাস্তায় নেমে এসেছে দেশের লাখো ছাত্র, যুবক, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষ।
১৯৯০ সালের ১০ নভেম্বর, রাজধানীর পল্টন এলাকায় যখন বিক্ষোভকারীরা “স্বৈরাচার নিপাত যাক” শ্লোগানে মুখরিত, ঠিক তখনই পুলিশের গুলিতে লুটিয়ে পড়েন জেহাদ। তার রক্তে ভিজে যায় ঢাকার রাজপথ— সেই রক্তই পরিণত হয় গণঅভ্যুত্থানের অগ্নিশিখায়।
জেহাদের শাহাদতের খবর মুহূর্তেই দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, হাটবাজার, কারখানা—সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে ক্ষোভের আগুন। পরদিন থেকেই সারাদেশে নেমে আসে সর্বাত্মক হরতাল ও বিক্ষোভ।
মাত্র ২৫ দিনের মাথায়, ৬ ডিসেম্বর ১৯৯০, পতন ঘটে স্বৈরশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের।
জেহাদের রক্তের ধারায় গণতন্ত্রের প্রত্যাবর্তন
নাজির উদ্দিন জেহাদের রক্তে সিক্ত হয় বাংলাদেশের গণতন্ত্র। তার শাহাদতের পর দেশজুড়ে গড়ে ওঠে এক অভূতপূর্ব ঐক্য— ছাত্রদের নেতৃত্বে সাধারণ মানুষও রাস্তায় নামে।
তৎকালীন ছাত্রনেতারা, রাজনৈতিক নেতারা ও নাগরিক সমাজ এক কণ্ঠে দাবি তোলে— ‘গণতন্ত্র ফিরিয়ে দাও।’
ফলে নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান হয়ে ওঠে বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়, যা প্রমাণ করে— তরুণ প্রজন্মের ত্যাগ ও সাহসই জাতির দিকনির্দেশনা বদলাতে পারে।
স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের প্রতীক হয়ে উঠলেন জেহাদ
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে শহীদ জেহাদের নাম আজও উচ্চারিত হয় শ্রদ্ধার সঙ্গে। তিনি শুধু একটি রাজনৈতিক দলের কর্মী নন— তিনি এক প্রতীকে পরিণত হয়েছেন।
যেমন নূর হোসেনের “স্বৈরাচার নিপাত যাক” লেখা বুক আমাদের চোখে ভেসে ওঠে গণতন্ত্রের প্রতীকে, তেমনি জেহাদের নাম উচ্চারিত হয় এক অদম্য সংগ্রামের প্রতীক হিসেবে।
জেহাদের রক্তের পরেই ১৯৯০ সালের শেষভাগে ছাত্রসমাজ ও রাজনৈতিক দলগুলো ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন চালিয়ে যায়।
এই ঐক্যই জন্ম দেয় সেই ঐতিহাসিক ৬ ডিসেম্বর, যখন স্বৈরশাসক এরশাদ বাধ্য হন পদত্যাগ করতে।
গণতন্ত্র এখনো হুমকির মুখে
তবে তিন দশক পার হলেও, আজকের বাস্তবতা উদ্বেগজনক। শহীদ জেহাদের স্বপ্নের বাংলাদেশ— একটি সন্ত্রাসমুক্ত, দুর্নীতিমুক্ত, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র— এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।
গণতান্ত্রিক যাত্রাপথ এখনো নানা ষড়যন্ত্রের শিকার। স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি, বিদেশি আধিপত্যবাদী দালাল ও ক্ষমতালোভী গোষ্ঠী গণতন্ত্রকে বারবার হুমকির মুখে ফেলে দিচ্ছে।
রাজনীতি এখনো দলীয় স্বার্থের গণ্ডিতে আটকে, জনগণের স্বার্থের পরিবর্তে ক্ষমতার রাজনীতি দাপট দেখাচ্ছে।
তবু এই কঠিন সময়েও শহীদ জেহাদের আত্মত্যাগ আমাদের মনে করিয়ে দেয়— গণতন্ত্রের পথে সংগ্রাম কখনো থেমে থাকে না। স্বাধীনতার মতোই গণতন্ত্র অর্জনের জন্যও প্রয়োজন ত্যাগ, সাহস ও অবিচল আদর্শ।
আজকের তরুণদের জন্য প্রেরণা
শহীদ জেহাদ শুধু অতীতের ইতিহাস নন, তিনি আজকের তরুণদের জন্য এক চিরন্তন প্রেরণার নাম।
তিনি দেখিয়েছেন, সত্য ও ন্যায়ের জন্য সংগ্রাম করতে হলে জীবনকেও তুচ্ছ ভাবতে হয়।
তার আদর্শ তরুণ প্রজন্মকে শেখায়— রাষ্ট্র যখন অন্যায়ের কাছে নতজানু হয়, তখন পরিবর্তন আনে তারুণ্যের দৃপ্ত পদক্ষেপ।
শহীদদের স্বপ্ন পূরণে নতুন অঙ্গীকার
আজ, শহীদ জেহাদ দিবসে, পুরো জাতি এক নতুন অঙ্গীকারে শপথ নিতে পারে—
নূর হোসেন, জেহাদ, আবু সায়দ, ওয়াসিম, মুগ্ধসহ সকল শহীদের রক্ত বৃথা যেতে দেওয়া যাবে না।
তাদের স্বপ্নের গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে হবে— যেখানে থাকবে না স্বৈরাচার, দুর্নীতি, নিপীড়ন বা মতপ্রকাশের দমন।
একটি মানবিক রাষ্ট্র, যেখানে নাগরিক অধিকার, আইনের শাসন ও স্বাধীন গণমাধ্যম থাকবে নিশ্চিত—
সেই লক্ষ্যেই শহীদ জেহাদের আত্মত্যাগ আমাদের আলোকবর্তিকা হয়ে আছে।
শেষ শ্রদ্ধা
শহীদ নাজির উদ্দিন জেহাদের আত্মত্যাগ শুধু ইতিহাস নয়, এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক চেতনার ভিত্তি।
তার রক্তে অর্জিত এই গণতন্ত্রের মাটিতে আমরা বারবার স্মরণ করি—
“গণতন্ত্রের জন্য জীবন দিতে হয়, কিন্তু জীবন দিয়ে অর্জিত গণতন্ত্রকে রক্ষা করতে হয় আরও বেশি দায়িত্ব নিয়ে।”
আজ জাতি শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছে শহীদ জেহাদকে, এবং দোয়া করছে—
আল্লাহ যেন এই মহান শহীদের রুহের মাগফিরাত দান করেন।
তার আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র যেন চিরস্থায়ী হয়—
এটাই আজকের শহীদ জেহাদ দিবসে সকল সচেতন নাগরিকের কামনা।
Leave a Reply