পাগল হাসান: দুঃখে লেখা
জীবন, সুরে গাঁথা ভালোবাসা
আনোয়ার হোসেন রনি
সুরে, কথায়, চোখে, মুখে—দুঃখই যেন তাঁর অনন্ত প্রেরণা। বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনে এক অনন্য নাম ‘পাগল হাসান’, যার আসল নাম মতিউর রহমান হাসান। সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার শিমুলতলার এক দরিদ্র পরিবারের সন্তান হয়েও তিনি ছুঁয়ে গিয়েছিলেন হাজারো তরুণ-তরুণীর হৃদয়। বাউল ধাঁচের মরমী গানের মধ্য দিয়ে হয়ে উঠেছিলেন হাওরের নতুন কণ্ঠস্বর। তাঁর জীবন যেমন ছিল কষ্টের, তেমনি তাঁর গান ছিল জীবনেরই প্রতিবিম্ব।
জন্ম ও শৈশব ১৯৯০ সালের ১ জুন সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার শিমুলতলা গ্রামে জন্ম নেন মতিউর রহমান হাসান। বাবা দিলোয়ার হোসেন (ওরফে দিলশাদ) ও মা আমিনা বেগমের ঘরে তিনি ছিলেন একমাত্র পুত্র। তিন বোনের তৃতীয় সন্তান হাসান যখন মাত্র পাঁচ বছরের, তখনই বাবাকে হারান। সেই থেকে শুরু হয় তাঁর মায়ের অক্লান্ত সংগ্রাম—দু’মুঠো ভাত জোগাতে দিনমজুরের কাজ, আর হাসানের শৈশব কাটে দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে।
মা-ছেলের সেই সংগ্রামী জীবনের স্মৃতি হাসান কখনও ভোলেননি। হয়তো সেই কারণেই তাঁর গানের প্রতিটি পঙ্ক্তিতে মিশে থাকে গভীর মানবিক বেদনা ও সহানুভূতির ছোঁয়া। তিনি একসময় সরকারি টেকনিক্যাল স্কুলে অফিস সহায়ক হিসেবে চাকরি নেন, সংসারের হাল ধরার জন্য। কিন্তু হৃদয়ের গভীরে বাসা বাঁধা ছিল গান—সেই টানেই তিনি ধীরে ধীরে পা বাড়ান সংগীতজগতে।
সংগীতে পথচলা সুনামগঞ্জ শহরে চাকরির সুবাদে হাসানের পরিচয় হয় বিশিষ্ট সংগীতশিল্পী দেবদাস চৌধুরীর সঙ্গে। তিনিই প্রথম তাঁর গানের গভীরতা বুঝতে পারেন। দেবদাসের সংগীতবিদ্যালয় ‘স্পন্দন’-এ যুক্ত হয়ে হাসান নিয়মিত সংগীতচর্চা শুরু করেন। নিজের লেখা ও সুর করা গানে তিনি একসময় আলোড়ন তুলেছিলেন স্থানীয় মঞ্চে।
একসময় তিনি চাকরি ছেড়ে দেন। সম্পূর্ণভাবে ডুবে যান সংগীতে। নিজস্ব ব্যান্ডগোষ্ঠী ‘পাগল এক্সপ্রেস’ গঠন করেন। ইউটিউবসহ অনলাইন মাধ্যমে জনপ্রিয় হতে থাকেন। গান, ভিডিও, মঞ্চ—সবখানেই তিনি হয়ে ওঠেন হাওরাঞ্চলের তরুণদের অনুপ্রেরণা।
দেবদাস চৌধুরী বলেন,“হাসানের গানের কথা ও সুরে ছিল একধরনের আধ্যাত্মিকতা। ওর লেখা এক হাজারেরও বেশি গান শুনেছি বা দেখেছি। প্রতিটিতেই ছিল একরাশ বেদনা, কিন্তু সেই বেদনা মানুষকে কাঁদিয়ে নয়—ভালোবাসতে শেখাত।”
দুঃখময় কিন্তু উদার জীবন ছোটবেলা থেকেই কষ্ট তাঁর নিত্যসঙ্গী। কিন্তু সেই কষ্টের কথা কখনও কাউকে বলেননি। হাসান ছিলেন চাপা স্বভাবের, সাদাসিধে ও সহৃদয় মানুষ। সামান্য যা আয় করতেন, তার বড় অংশই বিলিয়ে দিতেন অভাবী মানুষের মধ্যে। নিজের ঘর ছিল ভাঙাচোরা টিনের চালা—তবু মন ছিল বিশাল।
মামা রবিউল হাসান বলেন,ওর নিজের কষ্ট ছিল পাহাড়সম, কিন্তু মুখে হাসি লেগেই থাকত। কষ্টের কথা কখনো প্রকাশ করত না, কেবল গানের মধ্যেই ঢেলে দিত।”
প্রেম, মায়া ও মরমীয়তার গায়ক হাসানের গানগুলোতে ছিল জীবনের দর্শন, প্রেম, পরম বেদনা এবং একধরনের আধ্যাত্মিক উন্মাদনা। তাই তাঁর নামের সঙ্গে ‘পাগল’ বিশেষণটি যুক্ত হয় একেবারেই স্বাভাবিকভাবে। তিনি নিজেই বলতেন,
“গান লিখতে হলে বুকভরা পরম দুঃখ চাই।”
তাঁর জনপ্রিয় গানের তালিকায় রয়েছে—
‘জীবন খাতায় প্রেম কলঙ্কের দাগ দাগাইয়া’,
‘মায়া লাগাইয়া’,‘জতন করে’,‘আসমানে যাইওনারে বন্ধু’,‘কইরো ঘৃণা যায় আসে না’,‘দেহ কুপির তেল ফুরাইবে’,‘জানতাম যদি তোমার পিরিত কচুপাতার পানি’,‘দুই দিনের সংসারি’—সহ আরও শত শত গান।
তাঁর সৃষ্ট গানের সংখ্যা প্রায় এক হাজার। এর বেশিরভাগই তিনি নিজেই লিখেছেন ও সুর করেছেন। প্রতিটি গানে মিশে আছে হাওরের নিঃশব্দ কষ্ট, প্রান্তিক মানুষের আর্তি আর ভালোবাসার নিখাদ আবেদন।
ব্যক্তিগত জীবন ২০১১ সালে তিনি বিয়ে করেন সুনামগঞ্জ শহরের লুৎফা বেগমকে। তাঁদের দুই ছেলে—মাকসুদুর রহমান জিনান (১৫) এবং মুশফিকুর রহমান জিসান (১৪)। পরিবার নিয়ে তিনি থাকতেন দুই কক্ষের টিনের ঘরে, গ্রামের সরল জীবনে। ছোট পরিবার, সীমিত স্বপ্ন—তবু গান ছিল তাঁর জীবনের একমাত্র আশ্রয়।
মর্মান্তিক মৃত্যু ২০২৪ সালের ১৮ এপ্রিল—হাওরের সকাল তখনও শান্ত। হাসান গান গেয়ে ফিরছিলেন বাড়ি। কিন্তু ছাতকের পথে এক বাস ও সিএনজি অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে শেষ হয়ে যায় পাগল হাসানের জীবন। মাত্র ৩৩ বছর বয়সে থেমে যায় এক তরুণ শিল্পীর সুরেলা যাত্রা।
সেদিন সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত সুনামগঞ্জ জুড়ে নেমে আসে শোকের ছায়া। জেলা শিল্পকলা একাডেমি, ছাতক ও তাঁর নিজ গ্রাম শিমুলতলায় হাজারো মানুষ অশ্রুসজল চোখে বিদায় জানান প্রিয় শিল্পীকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে তাঁর গান, তাঁর স্মৃতি, তাঁর অসমাপ্ত জীবনের গল্প।
একজন তরুণ ভক্ত ফেসবুকে লিখেছিলেন,
“বুকের ভিতর রইওরে বন্ধু—এই লাইনটাই আজ সত্যি হয়ে গেল। হাসান ভাই, আপনি এখন কেবল গানের কথায় বেঁচে আছেন।”
উত্তরাধিকার ও স্মৃতি মৃত্যুর পর তাঁর গান নতুন করে ছড়িয়ে পড়ে দেশের নানা প্রান্তে। ইউটিউবে তাঁর প্রতিটি গানের নিচে জমে ওঠে হাজারো মন্তব্য—কেউ কাঁদেন, কেউ স্মৃতি শেয়ার করেন, কেউ বলেন, “হাওরের এই সন্তান চিরকাল বেঁচে থাকবে তাঁর গানে।”
দেবদাস চৌধুরীর ভাষায়—“পাগল হাসান ছিল হাওরের বাউলদের উত্তরসূরি। তার মতো শিল্পী বিরল—যে নিজের দুঃখকে সুরে রূপ দিয়েছে, আর মানুষকে দিয়েছে ভালোবাসার শক্তি।”
‘মানুষ মইরা গেলে কদর বাইড়া যায়…’হাসান নিজেই এক গানে গেয়েছিলেন—“মানুষ মইরা গেলে কদর বাইড়া যায়, বাঁইচা থাকতে নিকৃষ্ট কয়, মরলে শ্রেষ্ঠ পদক পায়…”এই গানের কথাই যেন হয়ে উঠেছে তাঁর জীবনের প্রতিচ্ছবি। বেঁচে থাকতে যাঁকে খুব কম মানুষ বুঝেছে, মৃত্যুর পর সেই হাসানই হয়ে উঠেছেন সবার হৃদয়ের শিল্পী।
পাগল হাসানের জীবন ছিল দুঃখে ভরা, কিন্তু তাঁর গান ছিল ভালোবাসায় পূর্ণ। এক জীবনে তিনি লিখেছেন, সুর করেছেন এবং গেয়েছেন প্রায় এক হাজার গান—যার প্রতিটিতে আছে মায়া, ব্যথা, আর মানবতার ডাক।হয়তো তাই, মৃত্যুর পরও তাঁর কণ্ঠ গেয়ে ওঠে—“অন্তরে অন্তর মিশাইয়া পিরীতের গান গাইও…”হাসানের গান এখনো বাজে ছাতকের হাওরে, সুনামগঞ্জের আকাশে, তরুণদের হৃদয়ে। তিনি নেই, কিন্তু তাঁর সুরে বেঁচে আছে এক মরমী আত্মা—পাগল হাসান, যিনি দুঃখকে করে তুলেছিলেন সৌন্দর্যের ভাষা।
Leave a Reply