দুদকের তদন্ত শুরু,আতংকিত প্রকৌশলীরা
সিলেট বিভাগের বিদ্যুৎ উন্নয়ন মেগা প্রকল্পে ‘সাগর চুরি’—একই কাজে দ্বৈত বিল, গায়েব কোটি টাকার মালামাল
ছাতক প্রতিনিধিঃ
সিলেট বিভাগের বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা আধুনিকায়ন ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নেওয়া হাজার কোটি টাকার মেগা প্রকল্প এখন নানা অভিযোগে প্রশ্নবিদ্ধ। প্রকল্পে কাজ না করেই বিল উত্তোলন, একই কাজের বিপরীতে দ্বৈত বিল, সরকারি মালামাল গায়েব, নিম্নমানের সরঞ্জাম ব্যবহার এবং ঘুষ বাণিজ্যের মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের ভাষায়—বিদ্যুৎ উন্নয়নের নামে এই প্রকল্প যেন এখন “লুটপাটের মহোৎসবে” পরিণত হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র ও স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী, সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার—এই চার জেলার আওতায় বাস্তবায়িত “বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা উন্নয়ন প্রকল্প, সিলেট বিভাগ” নামের মেগা প্রকল্পে অনিয়মের যেন শেষ নেই। মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান উন্নয়ন না থাকলেও কাগজে-কলমে দেখানো হচ্ছে শত শত কোটি টাকার কাজ।
জানা গেছে, সিলেট বিভাগের দীর্ঘদিনের বিদ্যুৎ সংকট নিরসন, বিতরণ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে প্রায় ২ হাজার ৫৩ কোটি টাকার এই প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। ২০১৬ সালের ১১ মার্চ পরিকল্পনা কমিশনে অনুষ্ঠিত প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় প্রকল্প প্রস্তাবনা নিয়ে আলোচনা হয়। পরে ২০১৯ সালের জুলাই মাসে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) প্রকল্পটি অনুমোদন দেয়। প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ১ হাজার ৬৯৪ কোটি টাকা। পরবর্তীতে সংশোধিত প্রস্তাবে ব্যয় বাড়িয়ে তা করা হয় প্রায় ১ হাজার ৮৬৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা সরকারি অর্থায়ন এবং বাকি অর্থ বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) বহন করার কথা ছিল। কিন্তু শুরু থেকেই প্রকল্পের ব্যয়, পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠতে থাকে।
পরিকল্পনা কমিশনের পর্যবেক্ষণেও প্রকল্পের বিভিন্ন উপকরণের মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বেশি ধরা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। উদাহরণ হিসেবে বলা হয়, ৩৩ কেভি ওভারহেড লাইনের প্রতি কিলোমিটার নির্মাণ ব্যয় যেখানে সর্বোচ্চ ৩৪ লাখ টাকা হওয়ার কথা, সেখানে প্রকল্পে তা ধরা হয়েছে প্রায় ৪২ লাখ টাকা। একইভাবে সাব-স্টেশন নির্মাণসহ বিভিন্ন অবকাঠামোর ব্যয়ও বাজারদরের তুলনায় অনেক বেশি নির্ধারণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রকল্পের আওতায় প্রায় ২ হাজার ৫০০ কিলোমিটার নতুন বিদ্যুৎ লাইন নির্মাণ, প্রায় ৩ হাজার কিলোমিটার পুরনো লাইন সংস্কার, ২২টি এমভিএ জিআইএস সাব-স্টেশন স্থাপন ও সংস্কার, ১৭টি গ্রিড সাব-স্টেশনের সম্প্রসারণ এবং প্রায় ৩ হাজার ৪৮৫টি বিতরণ স্টেশন স্থাপন ও সংস্কারের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই এসব কাজের অগ্রগতি খুবই ধীরগতির বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার বিউবো গ্রিড থেকে গোবিন্দগঞ্জ ট্রাফিক পয়েন্ট হয়ে সিলেট–সুনামগঞ্জ সড়কের পাশে রাউলী সাব-স্টেশন পর্যন্ত ৩৩ কেভি লাইনের কাজ ২০১৮ সালে শুরু হয়। প্রকল্প অনুযায়ী এক থেকে দুই বছরের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও প্রায় সাত বছর পেরিয়ে গেলেও কাজ এখনো অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পের আওতায় ওই লাইনে প্রায় ৩ হাজার ৬০০টি খুঁটি বসানোর কথা থাকলেও বাস্তবে বসানো হয়েছে মাত্র ৯০০টির মতো। অনেক জায়গায় খুঁটি বসানো হলেও তার টানানো হয়নি। কোথাও আবার তার টানানো হলেও কাজ অসম্পূর্ণ অবস্থায় ফেলে রাখা হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রাথমিকভাবে দুলাল পাল নামে এক ঠিকাদার আংশিকভাবে ওই লাইনের তার টানানোর কাজ করেন। কিন্তু কাজ শেষ হওয়ার আগেই হঠাৎ করে নতুন করে একটি এস্টিমেট তৈরি করা হয়। ছাতক বিদ্যুৎ বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল মজিদ ও সহকারী প্রকৌশলী মাহমুদুল হাসানের স্বাক্ষরে সড়ক ও জনপথ বিভাগের উন্নয়ন দেখিয়ে প্রায় ১৩ কোটি ৭২ লাখ টাকার নতুন এস্টিমেট অনুমোদন দেওয়া হয়। এরপর টি আর এন্টারপ্রাইজ নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজটি পায়। তবে অভিযোগ রয়েছে, প্রতিষ্ঠানটির মালিক আজিজুর রহমান মাত্র ২৪ লাখ টাকার বিনিময়ে কাজটি আবার “সানরাইজ ইন্টারন্যাশনাল” নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠানের মালিক খোকা নামে এক ব্যক্তির কাছে বিক্রি করে দেন। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নে ঠিকাদারদের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে ওঠার অভিযোগ উঠেছে। এদিকে স্থানীয়দের দাবি, আগের প্রকল্পের কাজ শেষ না করেই ছাতক থেকে রাউলী পর্যন্ত একই নামে নতুন করে কাজ শুরু করা হয়েছে। অথচ আগের প্রকল্পে বরাদ্দকৃত বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ সামগ্রীর কোনো সঠিক হিসাব পাওয়া যাচ্ছে না। অভিযোগ উঠেছে, প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ দেওয়া সরকারি মালামালের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ ব্যবহার করে কাজ আংশিকভাবে সম্পন্ন দেখানো হয়েছে। এরপর আবার নতুন টেন্ডারের মাধ্যমে নতুন করে মালামাল কেনার নামে কোটি কোটি টাকার বিল উত্তোলনের চেষ্টা চলছে। আরও গুরুতর অভিযোগ হলো—একই কাজের জন্য দুইবার বিল উত্তোলনের ঘটনা। প্রকল্পের আওতায় প্রতিটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০টি খুঁটি বসানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, সেই কাজ পুরোপুরি সম্পন্ন হয়নি। এর মধ্যে আবার সংশ্লিষ্ট ডিভিশন থেকে ৭০০ থেকে ৮০০ খুঁটির কাজ স্থানীয় ছোট ঠিকাদারদের দিয়ে করানো হচ্ছে। পরে একই কাজের জন্য একদিকে প্রকল্প থেকে বিল উত্তোলন করা হচ্ছে, অন্যদিকে ডিভিশন থেকেও আলাদাভাবে বিল তোলা হচ্ছে। অর্থাৎ একই কাজের জন্য দুইবার বিল উত্তোলনের মাধ্যমে রাষ্ট্রের বিপুল অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের নামে বরাদ্দ দেওয়া সরকারি খুঁটি, কেবল ও অন্যান্য মালামাল দিয়েই এখন অনেক জায়গায় নতুন কাজ করা হচ্ছে। কিন্তু কাগজে-কলমে আবার নতুন করে মালামাল কেনার নামে কোটি কোটি টাকার বিল তোলা হচ্ছে। এতে সরকারের বিপুল অর্থ অপচয় এবং লুটপাটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন সিলেট অঞ্চলের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আব্দুল কাদির, নির্বাহী প্রকৌশলী জিয়াউল হক জিয়া এবং প্রকল্প সংশ্লিষ্ট আরও প্রায় ২০ জন কর্মকর্তা–কর্মচারী ও ঠিকাদার। তাদের বিরুদ্ধে একাধিক লিখিত অভিযোগ ইতোমধ্যেই প্রধানমন্ত্রী ও বিদ্যুৎ মন্ত্রীর কার্যালয়ে পৌঁছেছে। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বিষয়টি তদন্ত শুরু করেছে বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পে ভুয়া বিল উত্তোলন, নিম্নমানের সরঞ্জাম ব্যবহার এবং ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিভিন্ন গ্রামে নতুন বিদ্যুৎ লাইন ও ট্রান্সফরমার স্থাপনের নামে গ্রাহকদের কাছ থেকেও মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করা হয়েছে। ছাতক, দোয়ারাবাজার, জগন্নাথপুর, দিরাই ও শান্তিগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় নতুন লাইন বসাতে ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা এবং ট্রান্সফরমার বসাতে ৬ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, এভাবে প্রায় ৪০ কোটি টাকার বেশি ঘুষ বাণিজ্য হয়েছে। অনেক এলাকায় নতুন সরঞ্জাম ব্যবহারের কথা থাকলেও পুরনো ট্রান্সফরমার ও নিম্নমানের তার ব্যবহার করে কোটি কোটি টাকা আত্মসাত করা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। এদিকে সিলেট–সুনামগঞ্জ সড়কের বিভিন্ন স্থানে বিদ্যুতের খুঁটি পড়ে থাকতে দেখা গেলেও বিপুল পরিমাণ কেবল ও অন্যান্য সরঞ্জাম গায়েব হয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। সরকারি স্টোরেও এসব মালামালের কোনো স্পষ্ট হিসাব পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের মতে, জনগণের করের টাকায় নেওয়া এত বড় প্রকল্পে যদি এ ধরনের অনিয়ম ঘটে থাকে, তবে তা শুধু আর্থিক ক্ষতিই নয়—রাষ্ট্রের উন্নয়ন ব্যবস্থার ওপরও বড় ধরনের আঘাত। তাদের দাবি, প্রকল্পের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সব ধরনের আর্থিক লেনদেন, মালামালের হিসাব, টেন্ডার প্রক্রিয়া এবং মাঠপর্যায়ের কাজের বাস্তব চিত্র নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) চন্দন কুমার সূত্রধর বলেন, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সঠিক নয়। তবে প্রকল্পে কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতি হয়ে থাকলে তা খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অন্যদিকে নির্বাহী প্রকৌশলী জিয়াউল হক জিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। আর অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আব্দুল কাদিরের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করে ব্যস্ততার কথা বলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন। ক্ষুব্ধ গ্রামবাসীর প্রশ্ন—বিদ্যুৎ উন্নয়নের নামে নেওয়া এই হাজার কোটি টাকার প্রকল্প কি সত্যিই জনগণের কল্যাণে কাজে লাগবে, নাকি শেষ পর্যন্ত তা দুর্নীতির আরেকটি বড় উদাহরণ হয়ে থাকবে। এখন সবার দৃষ্টি দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্তের দিকে। তদন্তে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে এলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না—সেটিই এখন দেখার বিষয়।
Leave a Reply