এবার ‘শহীদ মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি বীরবিক্রম সম্মাননা পদক’ পাচ্ছেন এডভোকেট আবু আলী সাজ্জাদ হোসাইন
স্টাফ রিপোর্টার:
সুনামগঞ্জের কৃতি সন্তান, বরেণ্য লেখক, অভিজ্ঞ সাংবাদিক ও খ্যাতিমান আইনজীবী আলহাজ্ব এডভোকেট আবু আলী সাজ্জাদ হোসাইন এবার পাচ্ছেন মর্যাদাপূর্ণ ‘শহীদ মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি বীরবিক্রম সম্মাননা পদক’। শহীদ মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি পাবলিক লাইব্রেরির পক্ষ থেকে গুণীজনকে স্বীকৃতি দেওয়ার অংশ হিসেবে এ পদক প্রদান করা হবে বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) সন্ধ্যা ৬টায় লাইব্রেরি মিলনায়তনে। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন লাইব্রেরির সভাপতি ও সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া।
শহীদ জগৎজ্যোতির আত্মত্যাগের স্মৃতি ধরে রাখতে ও সমাজে সাংস্কৃতিক ও জ্ঞানচর্চায় অবদান রাখাদের সম্মান জানাতে প্রায় এক দশক ধরে এই পদক প্রদান করে আসছে লাইব্রেরি কর্তৃপক্ষ। এবার এর পঞ্চম প্রাপক হিসেবে মনোনীত হয়েছেন সুনামগঞ্জের প্রথিতযশা ব্যক্তিত্ব এডভোকেট আবু আলী সাজ্জাদ হোসাইন।
জন্ম ও শিক্ষাজীবন আবু আলী সাজ্জাদ হোসাইনের জন্ম ১৯৪৭ সালের ২৯ অক্টোবর, সুনামগঞ্জ শহরের ঐতিহাসিক আরপিননগরের তালুকদার বাড়িতে। শৈশব-কৈশোরে নিয়মিত পাঠাভ্যাস, সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ এবং লেখালেখির প্রতি গভীর আগ্রহ তাকে দ্রুতই আলাদা পরিচয়ে পরিচিত করে তোলে। ১৯৬৪ সালে তিনি সরকারি জুবিলী উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি, ১৯৬৬ সালে সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি এবং একই কলেজ থেকে ১৯৬৮ সালে বিএ ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে ১৯৭০ সালে ঢাকা সেন্ট্রাল ল’ কলেজ থেকে আইন পড়াশোনা শেষ করেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি ডিগ্রি লাভের মাধ্যমে আইন পেশায় তার প্রাতিষ্ঠানিক যাত্রা পূর্ণতা পায়।
আইন পেশায় উজ্জ্বল পথচলা ১৯৭৩ সালে সুনামগঞ্জ বারে আইন পেশায় যোগদানের মাধ্যমে তিনি জেলা আইন অঙ্গনে নতুন গতিধারা আনেন। সততা, জ্ঞান, আন্তরিকতা ও পেশাদারিত্বের কারণে দ্রুতই তিনি তরুণ আইনজীবীদের প্রেরণার প্রতীক হয়ে ওঠেন। ১৯৭৮ সালে তিনি সুপ্রিম কোর্ট বারের সদস্যপদ লাভ করেন, যা তার পেশাগত মর্যাদা ও দক্ষতার স্বীকৃতি। তিনি দীর্ঘদিন সুনামগঞ্জ জেলার সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আদালতে দক্ষ উপস্থাপন, আইনের সঠিক ব্যাখ্যা এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় তার ভূমিকা সুনামগঞ্জের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে। জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও পরে সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি আইনজীবীদের পেশাগত উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ এবং সংগঠনকে আরও সক্রিয় করার নানা উদ্যোগ নেন।
সাংবাদিকতা দিয়ে কর্মজীবনের শুরু যদিও আইনই তার মূল পেশা, কিন্তু শুরুটা হয়েছিল সাংবাদিকতা দিয়ে। তরুণ বয়সে তিনি দৈনিক পয়গাম, দৈনিক পূর্বদেশ, সাপ্তাহিক হলিডে, দৈনিক বাংলার সুনামগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন। পাশাপাশি সাপ্তাহিক নও-বেলাল ও সাপ্তাহিক ‘বিন্দু বিন্দু রক্তে’ পত্রিকার কার্যনির্বাহী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। স্থানীয় পত্রপত্রিকা ও ম্যাগাজিন সম্পাদনায়ও তিনি রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। তাঁর সাংবাদিকতার লেখায় সমাজ-সংস্কৃতি-ইতিহাস-বিচারব্যবস্থা সম্পর্কে গভীর বিশ্লেষণ, স্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি এবং পাঠকমন জয় করার মতো ভাষাশৈলী ছিল অন্যতম শক্তি। সুনামগঞ্জে আধুনিক সাংবাদিকতার বিকাশে তিনি ছিলেন পথিকৃৎদের একজন।
‘সুনামগঞ্জ জেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য’—এক অনন্য দলিল
১৯৯৫ সালে প্রকাশিত তার উল্লেখযোগ্য বই ‘সুনামগঞ্জ জেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য’ জেলার সাংস্কৃতিক ইতিহাসে মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়। সুনামগঞ্জের মানুষ, সংস্কৃতি, ভূপ্রকৃতি, লোকসংগীত, লোককথা, প্রত্নতত্ত্ব ও সামাজিক ইতিহাস নিয়ে এতো বিস্তৃত ও গবেষণামূলক গ্রন্থ এর আগে প্রকাশিত হয়নি। গ্রন্থটি শুধু ইতিহাস সংরক্ষণেই নয়—নতুন প্রজন্মের কৌতূহল জাগানো এবং জেলার পরিচয় প্রতিষ্ঠায় অসামান্য ভূমিকা রাখে। পরবর্তীতে তার লেখা ‘ফিরে দেখা হজ্ব’ গ্রন্থটিও পাঠকমহলে ব্যাপক সাড়া ফেলে। ধর্মীয় অনুভূতি, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও সাহিত্যশৈলির মিশেলে বইটি একটি আলাদা পাঠ-আনন্দ সৃষ্টি করে।
সংস্কৃতি ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ভূমিকা আইন ও সাংবাদিকতার পাশাপাশি তিনি সুনামগঞ্জের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। জেলা শিল্পকলা একাডেমির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন, শিল্পীদের পরিচর্যা, নাট্যচর্চা এবং সাংস্কৃতিক আন্দোলনে তার অবদান উল্লেখযোগ্য। তিনি সুনামগঞ্জ প্রেসক্লাব ও সাংবাদিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক এবং পরে সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তার নেতৃত্বে সাংবাদিকদের পেশাগত উন্নয়ন, অধিকার আদায় ও সংগঠন শক্তিশালীকরণের নানা উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়।
পদক প্রাপ্তি নিয়ে লাইব্রেরি কর্তৃপক্ষের অনুভূতি শহীদ মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি পাবলিক লাইব্রেরির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট খলিল রহমান বলেন,“আমরা প্রতি দুই বছর পর পর একজন গুণীজনকে ‘শহীদ মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি বীরবিক্রম সম্মাননা পদক’ প্রদান করি। এ পর্যন্ত চারজন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বকে পদক দেওয়া হয়েছে। এবারের পদকপ্রাপ্ত আবু আলী সাজ্জাদ হোসাইন সুনামগঞ্জের ইতিহাস, সংস্কৃতি, আইনপেশা এবং সাংবাদিকতায় অনন্য অবদান রেখেছেন। তাকে সম্মান জানাতে পেরে আমরা গর্বিত।”
গুণীজনের সম্মান—নবীন প্রজন্মের প্রেরণা এই পদক শুধু একজন ব্যক্তিকে সম্মাননা নয়, বরং সুনামগঞ্জের বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক চর্চাকে এগিয়ে নেওয়ার এক অনুপ্রেরণা। শহীদ জগৎজ্যোতির মতো বীরের নামাঙ্কিত সম্মাননা প্রাপ্তি এডভোকেট আবু আলী সাজ্জাদ হোসাইনের দীর্ঘ সাধনা, সততা, দায়িত্ববোধ ও সুনামগঞ্জের প্রতি অঙ্গীকারের স্বীকৃতি।
একইসঙ্গে এটি নতুন প্রজন্মকে জানায়—জীবনযুদ্ধ, সাহস, অধ্যবসায় এবং জ্ঞানচর্চার মাধ্যমে সমাজে অনন্য অবস্থান তৈরি করা সম্ভব।
এখনও সক্রিয়, এখনও প্রত্যয়ী বয়সের ভার নয়—আজও তিনি আইনপেশায় নিয়মিত, লেখালেখিতে মনোযোগী এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে সচেতন। এর মধ্য দিয়ে তিনি সুনামগঞ্জের মানবিক, সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক জগৎকে আরও সমৃদ্ধ করছেন।
Leave a Reply