চির অমর শামসুল উলামা আল্লামা ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (রহ.) : এক জীবন্ত ইতিহাস !
@কবি ও সাংবাদিক আনোয়ার হোসেন রনি,@
বাংলার আধ্যাত্মিক রাজধানী নামেই সুপরিচিত সিলেট। এ অঞ্চলের আকাশে যিনি আজও সূর্যের মতো দীপ্ত, যিনি ইতিহাসের বুকে গড়ে গেছেন চিরস্থায়ী আলো—তিনি শামসুল উলামা আল্লামা আব্দুল লতিফ চৌধুরী ফুলতলী ছাহেব কিবলা (রহ.)। হযরত শাহজালাল ইয়ামনি (রহ.)–এর আধ্যাত্মিক ধারা, ৩৬০ আউলিয়ার উজ্জ্বল বংশ ধারা এবং হযরত শাহ কামালের রূহানী উত্তরসূরি হিসেবে তিনি শুধু একজন আলেম নন—একটি চলমান প্রতিষ্ঠান, একটি মূল্যবোধ, একটি দিকনির্দেশনার নাম।
যুগে যুগে বহু বিদ্বান, বহু সংস্কারক, বহু সাধক জন্ম নিয়েছেন; কিন্তু খুব কম মানুষই মৃত্যুর পর এইভাবে যুগযুগান্তরে লক্ষ মানুষের চেতনায় বেঁচে থাকেন। আল্লামা ফুলতলী (রহ.) সেই বিরল ব্যতিক্রম। তাঁর আদর্শ, কর্ম, চরিত্র ও প্রজ্ঞা আমাদের কাছে শুধু স্মৃতি নয়—এ জাতির নৈতিক পুনরুত্থানের সম্ভাবনা।
শিক্ষা ও জ্ঞানের আলো বিতরণে আজীবন সংগ্রামী দার্শনিক বাট্রান্ড রাসেল বলেছেন, “ভালো জীবন হলো জ্ঞানের দ্বারা পরিচালিত জীবন।” এ কথার সবচেয়ে জীবন্ত উদাহরণ ছিলেন আল্লামা ফুলতলী ছাহেব কিবলা (রহ.)। শৈশব থেকে ইন্তেকাল পর্যন্ত এক মুহূর্তও তিনি জ্ঞানের আলো ছড়ানো থেকে বিরত হননি। তাঁর সম্পূর্ণ ব্যক্তিত্ব গঠিত হয়েছিল কুরআন–হাদিসের সুগভীর অনুধাবন, ইলমের প্রতি অগাধ আকর্ষণ এবং সত্য-ন্যায়ের প্রতি অবিচল নিষ্ঠায়।
ইসলামি শিক্ষার বিস্তার, সুন্নতি আদর্শ প্রতিষ্ঠা এবং মুসলিম সমাজকে সঠিক পথে পরিচালনা—এসব ছিল তাঁর জীবনের প্রধানতম মিশন। আল কাউলুস ছাদীদ, আনোয়ারুসসালিকিন, নালায়ে কলন্দর—এমন বহু গ্রন্থ তাঁর বৈপ্লবিক চিন্তা ও সাহিত্যিক প্রজ্ঞার প্রমাণ বহন করে। এসব রচনা শুধু ধর্মীয় গ্রন্থ নয়; এগুলো মানবিকতা, সামাজিক ন্যায় ও আধ্যাত্মিক শুদ্ধতার নির্যাস।
আহলে সুন্নাতের বাতিঘর ও তাগুতবিরোধী প্রখর কণ্ঠ ফুলতলী ছাহেব কিবলা (রহ.) ছিলেন মজলুমের আশ্রয়স্থল, নির্যাতিত মানুষের অভিভাবক এবং বাতিল শক্তির বিরুদ্ধে এক অগ্নিস্ফুলিঙ্গ। তাঁর কণ্ঠ ছিল সত্যের পক্ষে, অত্যাচারের বিরুদ্ধে, সমাজের প্রতিটি নিপীড়িত মানুষের জন্য বীরোচিত ঘোষণা।
তিনি কখনো কোমল, কখনো কঠোর—সময়ের দাবি অনুযায়ী তাঁর ব্যক্তিত্বে উঠে আসত অনন্য দৃঢ়তা। জালিম, তাগুত কিংবা রাসূল (সাঃ)-এর শত্রুদের সামনে তিনি সবচেয়ে দৃঢ় দেয়াল হয়ে দাঁড়াতেন; আর দরিদ্র, সাধারণ ও অবহেলিত মানুষের সামনে তিনি ছিলেন স্নেহময় অভিভাবক। সৈয়দপুরের ঘৃণ্য হামলায় তিনি আহত হলেও সত্যের পথ থেকে একচুলও বিচ্যুত হননি। বরং তাঁর অবস্থান আরও দৃঢ় হয়, ন্যায় প্রতিষ্ঠার আহ্বান আরও জোরালো হয়ে ওঠে।
এক বহুমাত্রিক সমাজসংস্কারক শিক্ষা, সমাজকল্যাণ, মানবসেবা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি রেখে গেছেন অনন্য সাফল্য। তাঁর হাতে প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলো আজও মুসলিম সমাজকে আলোকিত করছে। তাঁর উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আছে— দেওরাইল ফুলতলী কামিল মাদ্রাসা সোবহানীঘাট কামিল মাদ্রাসা,লতিফিয়া এতিমখানা,ফ্রি ডিসপেনসারি,বৃদ্ধাশ্রম প্রকল্প
লতিফিয়া শিক্ষা কল্যাণ ট্রাস্ট,শিক্ষক সংগঠন ‘জমিয়তুল মোদারিছীন’এবং সর্বাধিক ঐতিহাসিক দারুল ক্বিরাত মাজিদিয়া ফুলতলী ট্রাস্ট, যা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পবিত্র কুরআনের বিশুদ্ধ তিলাওয়াত শিক্ষা প্রতিষ্ঠায় বৈপ্লবিক ভূমিকা রেখেছে।
একজন আলেম হয়েও তিনি সমাজ, রাজনীতি, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং রাষ্ট্র ভাবনাকেএকসূত্রে গেঁথেছেন। হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান—সব ধর্ম-বর্ণের মানুষের সঙ্গে তাঁর ছিল এক আত্মিক সম্পর্ক। শান্তি, মানবিকতা এবং নিরাপত্তা ছিল তাঁর মূল্যবোধের মূল কেন্দ্রবিন্দু। মুসলিম জাতির সংকটময় সময়ে দিকনির্দেশনা বাংলার মুসলিম সমাজের ক্রান্তিকালে তিনি ছিলেন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন এক পথপ্রদর্শক। ঈমান–আক্বিদা রক্ষার প্রশ্নে তাঁর অবস্থান ছিল পাহাড়ের মতো দৃঢ়। ধর্মীয় বিভ্রান্তি, চরমপন্থা, বিদআত বা অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে তিনি যুক্তি-শরিয়তের আলোকে দাঁড়িয়েছেন সাহসের সঙ্গে। তিনি তরুণ প্রজন্মকে সুন্নতি আদর্শে ফিরিয়ে আনার জন্য ভাষণ, সাহিত্য, গবেষণা—সব ক্ষেত্রেই জাগরণ সৃষ্টি করেন। তাঁর কথায়, আচরণে, সিদ্ধান্তে ফুটে উঠত অদম্য আবেগ, গভীর ফিকহি প্রজ্ঞা এবং মানবিকতার সর্বোচ্চ রূপ।
অবিস্মরণীয় সেই ১৬ জানুয়ারি — সিলেট কেঁদেছিল ২০০৮ সালের ১৫ জানুয়ারি মধ্যরাতে—বাংলার আকাশে নেমে আসে এক গভীর শোক। রাত ২টা ৯ মিনিটে নিভে যায় এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। রাসূল প্রেমিক এই আলেম চলে যান তাঁর সৃষ্টিকর্তার ডাকে। এরপর যা ঘটে তা ছিল ইতিহাসের বিরলতম দৃশ্য।
১৫–১৬ জানুয়ারি—ফুলতলীর বালাই হাওরে লাখো মানুষের ঢল নামে। প্রবীণ, যুবক, নারী, শিশু—সবাই ভিড় করেন তাদের প্রিয় রাহবারকে শেষবার শ্রদ্ধা জানাতে। কান্নায় ভারি হয়ে ওঠে পুরো হাওরাঞ্চল। মানুষের স্রোত থামেনি দিনভর। তাঁকে দাফন করা হয় তাঁর ইচ্ছামতো নিজ বাড়ির মসজিদের উত্তর পাশে। এই দৃশ্য বাংলার আধ্যাত্মিক ইতিহাসে এক অনন্য দলিল হয়ে থাকবে চিরকাল। একটি আদর্শের নাম—ফুলতলী ছাহেব কিবলা (রহ.) আজ তিনি দেহে নেই, কিন্তু তাঁর আদর্শের শক্তি বেঁচে আছে লক্ষ হৃদয়ে। তাঁর নাম উচ্চারণ মানে কেবল একজন ব্যক্তির কথা বলা নয়—এ একটি আন্দোলনের নাম, একটি মূল্যবোধের নাম, একটি নৈতিক সংগ্রামের নাম। আজ যখন মানবতা নির্বাক, সমাজে অস্থিরতা, অন্যায়–জুলুমের বিস্তার—তখন তাঁর হুংকার স্মরণ হয়। তাঁর রেখে যাওয়া পথ অনুসরণই হতে পারে আমাদের মুক্তির দিশা।
আজকের প্রেক্ষাপটে তাঁর শিক্ষা আরও জরুরি
বর্তমান সময়ে—নৈতিক অবক্ষয়,ধর্মীয় ভ্রান্তি সামাজিক অন্যায়,গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সংকট —এইসবের বিরুদ্ধে তাঁর প্রজ্ঞা ও নির্দেশনা নতুন করে পথ দেখাতে পারে। তিনি শিখিয়েছেন—সত্যকে আঁকড়ে ধরো,নৈতিকতায় অটল থাকো,
মানবতার পক্ষে দাঁড়াও,রাসূল (সাঃ)-এর সুন্নাহই হলো সফলতার পথ। শেষবাণী : তাঁর রূহের ফয়েজ জাতির জন্য দোয়া আল্লামা ফুলতলী ছাহেব কিবলা (রহ.) আমাদের মাঝে আর ফিরে আসবেন না, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া আলো আমাদের পথচলা আলোকিত করে যাবে অনন্তকাল। তাঁর জীবনকর্ম জাতির আত্মশুদ্ধি, শিক্ষায় প্রগতি এবং আধ্যাত্মিক পুনর্জাগরণের চিরন্তন অনুপ্রেরণা। আমরা মহান আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ করি—আল্লাহ পাক যেন এই মহান অলিকে জান্নাতের সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করেন।তাঁর রূহানি ফয়েজ আমাদের জীবনকে সঠিক পথে পরিচালিত করুক। আমিন।
Leave a Reply