খালেদা জিয়ার জানাজা ইতিহাসের এক অনন্য অধ্যায়
আনোয়ার হোসেন রনি
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কিছু কিছু মুহূর্ত আসে, যেগুলো সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে কিংবদন্তিতে পরিণত হয়। ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর বিকেল ৩টা ৩ মিনিট—জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় সেই রকমই এক মুহূর্তের জন্ম হলো। বিএনপি চেয়ারপার্সন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জানাজা শুধু একটি ধর্মীয় অনুষঙ্গ নয়; এটি হয়ে উঠেছিল জাতির আবেগ, সম্মান, ইতিহাস ও রাজনৈতিক বাস্তবতার এক সম্মিলিত তীর্থস্থান।
মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ থেকে শুরু করে আশপাশের কয়েক কিলোমিটার—যেদিকে চোখ যায়, মানুষের ঢল থেমে থাকেনি। কেউ কাঁধে শিশুকে নিয়ে এসেছে, কেউ হুইলচেয়ারে বসে জীবনসায়াহ্নের দুর্বল নড়াচড়াটুকুও ব্যয় করেছে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে। রাস্তার মোড়ে মোড়ে মানুষ—দলমত, শ্রেণি-পেশা নির্বিশেষে—মুহূর্তটিকে ইতিহাসে লিখে রাখতে উপস্থিত ছিল। রাজধানী যেন এক অদৃশ্য স্রোতে ভেসে গিয়েছিল প্রিয় নেত্রীকে শেষবারের মতো দেখতে।
স্বতঃস্ফূর্ত মানুষের সাগর এই জনসমাবেশে কোনো মঞ্চ ছিল না, ছিল না উত্তেজনার মাইক বা রাজনৈতিক স্লোগানের হৈচৈ। কিন্তু ছিল মানুষের অন্তর থেকে উঠে আসা সম্মান, দীর্ঘ বছরের আনুগত্য, এক নেত্রীর প্রতি গভীর ঋণবোধ। রাজনীতির বিভাজন, আদর্শের তর্ক, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক উত্তাপ—সবকিছু যেন ঢাকা পড়ে গিয়েছিল মানুষের নীরব উপস্থিতিতে।
এ যেন একধরনের নৈঃশব্দ্যের মহাকাব্য—যেখানে লক্ষ মানুষের শোক একসূত্রে গাঁথা,যেখানে আবেগের ঢেউ এক নিমিষে ভেঙে দেয় সব দেয়াল। রাষ্ট্রীয় ব্যক্তিত্বদের অভূতপূর্ব উপস্থিতি
জানাজায় উপস্থিত ছিলেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যরা, সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর প্রধানরা, তিন বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ দলের সিনিয়র নেতারা। ধর্মীয় মর্যাদা বাড়াতে বায়তুল মোকাররমের খতিব ইমামতি করেন জানাজায়—যা এই বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদার উচ্চতর পর্যায়ে নিয়ে যায়।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন সম্মিলিত উপস্থিতি বিরল। রাষ্ট্রক্ষমতার উত্থান–পতন, বিরোধীদের আন্দোলন, ক্ষমতার পালাবদলের ধাক্কায় দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে যে বিভক্তি তৈরি হয়েছিল, এই জানাজায় সেই ফাটল আংশিক হলেও মুছে দিল। ইতিহাস কখনও কখনও এমন দৃশ্যই তৈরি করে—যেখানে সব তর্ক থেমে যায়, মানুষের সম্মানই হয়ে ওঠে মূল ভাষা।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও গভীর প্রতিক্রিয়া খালেদা জিয়ার মৃত্যু বাংলাদেশ সীমান্তে আটকে থাকেনি। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও নেমেছিল শোকের ছায়া। ভারতের পক্ষ থেকে গভীর শোক জানিয়ে পাঠানো হয় বিশেষ শোকবার্তা। বুধবার দুপুরে জাতীয় সংসদ ভবনে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের হাতে সেই চিঠি তুলে দেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এস জয়শঙ্কর।
এদিকে দক্ষিণ এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ আরেক দেশ পাকিস্তান থেকেও তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া আসে। ঢাকায় পৌঁছান পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের স্পিকার সারদার আয়াজ সাদিক। বাংলাদেশের প্রতি পাকিস্তানের কূটনৈতিক আগ্রহ, ঐতিহাসিক সম্পর্ক এবং খালেদা জিয়ার প্রতি বিশেষ সম্মান—সব মিলিয়ে এই সফর জানাজায় কূটনৈতিক গুরুত্বের নতুন মাত্রা যোগ করে। দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের এই উপস্থিতি স্পষ্ট করেই দেখায়—খালেদা জিয়ার রাজনীতি শুধু দেশের মাঠেই সীমাবদ্ধ ছিল না;এটি ছড়িয়েছিল আন্তর্জাতিক ডিপ্লোম্যাসির জটিল ভূগোলেও।
ফিরোজায় শেষবারের মতো জানাজার আগে সকাল ৯টার দিকে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতাল থেকে জাতীয় পতাকায় মোড়ানো গাড়িতে করে বেগম খালেদা জিয়ার মরদেহ নেওয়া হয় তার প্রিয় বাসভবন ফিরোজায়। সেই পথে সারিবদ্ধ মানুষের দৃষ্টি, কারও কারও চোখের জল, কারও নীরব স্যালুট—সব মিলিয়ে পথটি পরিণত হয়েছিল এক আবেগময় বিদায়মিছিলের প্রতীকী দৃশ্যে। ফিরোজার গেটের সামনে মানুষের ভিড় এক কথায় হৃদয়স্পর্শী।
কেউ কোরআন তিলাওয়াত করেছে,কেউ ফুল রেখে গেছে,
আবার কেউ শুধু নীরবে দাঁড়িয়ে থেকেছে—যেন শেষবারের মতো স্মৃতিকে ছুঁয়ে দেখছে। কেন এত মানুষের উপস্থিতি?
দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা, নানা রাজনৈতিক বিতর্কে জর্জরিত সময়, জেল-হাসপাতালের দোলাচল, বয়স ও অসুস্থতা—এসব সত্ত্বেও খালেদা জিয়া কীভাবে এত বিপুল মানুষের ভালোবাসা ধরে রাখলেন? এই প্রশ্নটির উত্তর লুকিয়ে আছে তার পুরো রাজনৈতিক জীবনের বিভিন্ন স্তরে।
১. আপসহীনতাই তার পরিচয় গণতন্ত্রের সংগ্রামে ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে তিনি পরিচিত ছিলেন। আন্দোলন–সংগ্রাম–আলোচনা—সব ক্ষেত্রেই তার ভূমিকা বিএনপি সমর্থকদের কাছে তাকে এক দৃঢ় প্রতীকে পরিণত করেছে।
২. ব্যক্তিত্বের শক্তি ও প্রভাব রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে তিনবার ক্ষমতায় থাকা, দেশের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক–বৈদেশিক নীতিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, নেতৃত্বের দৃঢ়তা—এসব তাকে এক অনন্য অবস্থানে নিয়ে গেছে।
৩. সমর্থকদের প্রতি আবেগী সম্পর্ক রাজনীতির মাঠের বাইরে সাধারণ মানুষের দুঃসময়ে পাশে দাঁড়ানো, মানবিক উদ্যোগ, দলীয় নেতা–কর্মীদের প্রতি মমত্ববোধ—এসব তাকে জনমানসে এক বিশেষ স্থানে পৌঁছে দেয়।
৪. রাজনৈতিক প্রতীকী শক্তি
বাংলাদেশের আধুনিক রাজনীতির দুই কেন্দ্রীয় চরিত্রের একজন হিসেবে তার প্রস্থান একটি যুগের অবসান। মানুষের উপস্থিতি প্রমাণ করে—কেবল একটি রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব নয়, তিনি ছিলেন এক প্রজন্মের আশা–সংগ্রাম–স্বপ্নের প্রতীক।
জানাজার ভেতরেই নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার নীরব ঘোষণা
বুধবারের এই জানাজা শুধু একটি রাষ্ট্রীয় বিদায় নয়; এটি ছিল বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের নীরব সূচনা।
জনতার ঢল দেখিয়ে দিয়েছে—যে রাজনীতিকে কেউ খাটো করে দেখতে চেয়েছে,যে নেত্রীকে কেউ রাজনৈতিক সমীকরণ থেকে বাদ দিতে চেয়েছে, তিনি মানুষের হৃদয়ে এখনো অটল, দৃঢ়, মাতৃসুলভ এক জায়গা ধরে রেখেছিলেন।
তার মৃত্যু তাই শুধু শূন্যতা নয়;এটি নতুন রাজনৈতিক প্রশ্ন, নতুন গণমানস, নতুন প্রতিক্রিয়ারও যাত্রা শুরু।
এক অধ্যায়ের সমাপ্তি, অন্য অধ্যায়ের সূচনা বেগম খালেদা জিয়ার জানাজা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ যতই কঠিন হোক, একজন নেতার প্রতি মানুষের ভালোবাসা মুছে দেয়া যায় না। ইতিহাসের পাতায় তার নাম ইতিমধ্যে লেখা হয়ে গেছে, কিন্তু ৩১ ডিসেম্বরের এই জনসমাগম সেই নামের পাশে আরও একটি দাগ টেনে দিয়েছে—এটি একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি এবং আরেক অধ্যায়ের নিঃশব্দ সূচনা। মিলিয়ন মানুষের অশ্রুসিক্ত বিদায়ের মধ্য দিয়ে বেগম খালেদা জিয়া বিদায় নিয়েছেন,কিন্তু তিনি রেখে গেছেন একটি প্রশ্ন—মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়া কি কখনো ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে? নাকি চরিত্র, শক্তি, সাহস আর ভালোবাসার ওপর? বুধবারের জানাজাই তার উত্তর—মানুষ শেষ পর্যন্ত হৃদয় দিয়েই নেতাকে বিচার করে।
Leave a Reply