বেগম খালেদা জিয়া আর নেই
বাংলাদেশ হারালো এক আপোসহীন নেত্রীকে
নিজস্ব প্রতিবেদক | ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক যুগান্তকারী অধ্যায়ের অবসান ঘটিয়ে বিএনপির চেয়ারপার্সন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া আজ ৩০ ডিসেম্বর না–ফেরার দেশে চলে গেছেন—ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। দেশের রাজনীতিতে চার দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি ছিলেন আপসহীনতার প্রতীক, গণতন্ত্র রক্ষার এক দৃঢ় বর্ম। আজ তাঁর বিদায়ে শোকাতুর পুরো জাতি, শোকে স্তব্ধ রাজনীতি, স্তব্ধ লাখো মানুষ যারা তাকে দেখেছেন সংগ্রামে আন্দোলনে, নেতৃত্বে এবং অবিচল সাহসে।
রাজনীতিতে প্রবেশ—এক অপ্রত্যাশিত অথচ অনিবার্য যাত্রা
স্বামী রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যার পর ১৯৮১–৮২ সময়টা ছিল বাংলাদেশের রাজনীতির উত্তাল মুহূর্ত। এমন অস্থিরতার মধ্যে ১৯৮২ সালে খালেদা জিয়া দায়িত্ব নেন বিএনপির নেতৃত্বে। অনেকের কাছে এটা ছিল বিস্ময়,অনেকের কাছে প্রশ্ন—’তাঁর পক্ষে কি সম্ভব?’ কিন্তু বাস্তবতা খুব দ্রুতই বদলে যায়।
জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে যখন দেশের বাতাস আন্দোলনের দাবিতে উত্তপ্ত হয়ে উঠছিল, ঠিক তখনই তিনি রাজনীতিতে নিজের অবস্থান দৃঢ় করতে শুরু করেন। রাজপথের আন্দোলনের ভিড়ে তিনি আর দশজন রাজনীতিক হয়ে থাকেননি; বরং খুব অল্প সময়েই হয়ে ওঠেন প্রতিরোধের এক অদম্য নাম। নয় বছরের আন্দোলন—এক আপোষহীন নেত্রীর জন্ম ১৯৮৩ সালে। তিনি গঠন করেন সাতদলীয় ঐক্যজোট। এই জোট ছিল সামরিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী রাজনৈতিক বলয়। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে আটদলীয় এবং বামপন্থীদের নেতৃত্বে পাঁচদলীয় জোটও আন্দোলনে সক্রিয় ছিল। কিন্তু বিএনপির সাতদলীয় জোট ছিল সম্পূর্ণ নির্বাচন বর্জন করে রাজপথকেন্দ্রিক আন্দোলনের পক্ষে।
১৯৮৬ সালের নির্বাচনকে তিনি “প্রহসন ও স্বৈরাচারকে বৈধতা দেওয়ার আয়োজন” হিসেবে বর্জন করেন। যেদিন আওয়ামী লীগ অংশ নেয়, সেদিনও তিনি নড়েননি। তাঁর অবস্থান অটুট ছিল—স্বৈরশাসনের অধীনে নির্বাচন নয়, গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনা আগে। এই দৃঢ় অবস্থানের কারণেই তখনকার রাজনৈতিক মহল তাঁকে উপাধি দেয়—“আপোসহীন নেত্রী। এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলোতে খালেদা জিয়া তিনবার গ্রেপ্তার হন। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমেদ লিখেছেন,“এরশাদ বিরোধী আন্দোলন শুধুই সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ছিল না—এটি ছিল খালেদা জিয়াররাজনৈতিক পুনর্জাগরণের সময়। তিনি বিএনপিকে শুধু নেতৃত্বই দেননি, সম্পূর্ণভাবে পুনরুজ্জীবিত করেছিলেন। তার এই সংগ্রাম ছিল রাজপথের ধুলা-বালুর মধ্যে দাঁড়িয়ে গণতন্ত্রের আলো ধরার সংগ্রাম। অবশেষে গণতন্ত্রের বিজয়, ক্ষমতার শিখরে খালেদা জিয়া দীর্ঘ নয় বছরের আন্দোলনের পর ১৯৯০ সালে পতন হয় এরশাদ সরকারের। সেই বিজয়ের পথ ধরে ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় আসে। এ ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে এক ঐতিহাসিক নির্বাচন—সব দলের অংশগ্রহণ, পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা আর গণতন্ত্রের প্রত্যাশা নিয়ে। এই নির্বাচনে খালেদা জিয়া পাঁচটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং পাঁচটিতেই জয়ী হন—যা তাঁর জনপ্রিয়তার এক জ্বলন্ত প্রমাণ।
এভাবে তিনি হয়ে ওঠেন বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। এই অর্জন শুধু তাঁর ব্যক্তিগত সাফল্য ছিল না; ছিল নারীর ক্ষমতায়নের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। রাষ্ট্রপতি শাসন থেকে সংসদীয় পদ্ধতিতে ফিরে যাওয়া—তার আরেক ঐতিহাসিক ভূমিকা এরশাদ বিরোধী তিন জোটের ঐকমত্য ছিল—বাংলাদেশকে আবার সংসদীয় সরকার ব্যবস্থায় ফিরিয়ে আনা হবে। একজন সংসদ-নেতা হিসেবে খালেদা জিয়া এই অঙ্গীকার পূরণে নেতৃত্ব দেন। পঞ্চম সংসদে তিনি রাষ্ট্রপতি শাসন থেকে সম্পূর্ণভাবে সংসদীয় শাসনে ফিরে যাওয়ার জন্য যে বিল উত্থাপন করেন, তা ঐকমত্যে পাস হয়। এভাবেই দীর্ঘ ১৬ বছর পর দেশে পুনঃপ্রতিষ্ঠা পায় সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা, যার কৃতিত্ব তিনি আজীবন বহন করেছেন।
বিবাদ, লড়াই, রাজনীতি—সব ছাপিয়ে মানুষের মনে মানবী খালেদা জিয়া খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন ছিল আলো-অন্ধকারে ভরা, সাফল্য-ব্যর্থতার দ্বন্দ্বে রঙিন। কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল—দৃঢ়তা। বিরোধী দলে থাকলেও তিনি ছিলেন ভয়হীন, ক্ষমতায় থাকলেও করতেন আপোষহীন সিদ্ধান্ত। অনেক সময় কঠোরতার জন্য সমালোচিত হয়েছেন, আবার সেই কঠোরতাই তাঁকে এনে দিয়েছে সমর্থকদের অবিচল আস্থা। তাঁর জীবনে রাজনীতি এবং ত্যাগ ছিল একসঙ্গে জড়ানো। দীর্ঘদিন কারাবরণ, অসুস্থতা, রাজনীতির কঠিন বাস্তবতায়ও তিনি কখনো ভেঙে পড়েননি। তাঁর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের কাছেও তিনি ছিলেন লড়াকু, শক্তিশালী এবং সম্মানযোগ্য এক নেতা। শেষ দিকে দীর্ঘ অসুস্থতা জীবনের শেষ কয়েক বছর শারীরিকভাবে নানা জটিলতায় ভুগছিলেন তিনি। রাজনীতি থেকে দূরে থাকলেও তাঁর অবস্থার প্রতিটি দিন ছিল জাতির আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। তাঁর সুস্থতা নিয়ে দলীয় নেতাকর্মীদের প্রার্থনা আর অপেক্ষা কখনো কমেনি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সব প্রতিরোধ, সব চিকিৎসা, সব আশা থেমে গেল। আজ বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক বিশাল শূন্যতা তৈরি হলো—যে শূন্যতা সহজে পূরণ হবে না। জাতির শোক: দেশজুড়ে একই কান্না, একই শূন্যতা খালেদা জিয়ার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই দেশজুড়ে নেমে আসে শোকের ছায়া। দলমত নির্বিশেষে মানুষ শোক প্রকাশ করেছে এই অমর নেত্রীকে হারানোর বেদনায়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন—তিনি ছিলেন বাংলাদেশের রাজনীতির এক সম্পূর্ণ যুগ। তাঁর বিদায়ে একটি অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি হলো। ছোট বড় শহর, গ্রাম, রাজনৈতিক কার্যালয়—সব জায়গায় চলছে শোক মিছিল, দোয়া মাহফিলের আয়োজন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমও শোকে স্তব্ধ। বহু মানুষের কণ্ঠে একই কথা—একটা যুগ শেষ হয়ে গেল।”
দেশ কী হারালো? খালেদা জিয়ার মৃত্যু কেবল বিএনপির জন্যই বড় ক্ষতি নয়; বরং সমগ্র দেশের রাজনীতিতে এটি এক গভীর শূন্যতা। তিনি ছিলেন— একাধিকবার দেশের প্রধানমন্ত্রী গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের অন্যতম স্থপতি সংসদীয় পদ্ধতি পুনঃপ্রবর্তনের নেতৃত্বদাতা নারীর নেতৃত্বের এক শক্তিশালী প্রতীক এবং রাজনীতির কঠিন অধ্যায়ে এক দৃঢ় মনোভাবের নেত্রী এই সবকিছুর সমষ্টিই তাকে আজকের বাংলাদেশে এক অনন্য রাজনৈতিক মহীরূহ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। শেষ বিদায়—মানুষের ভালোবাসাই তাঁর প্রাপ্ত সর্বোচ্চ সম্মান।বাংলাদেশসহ বিশ্বের নানা প্রান্তের মানুষ আজ প্রার্থনা করছে তাঁর রুহের মাগফেরাতের জন্য। তাঁর রাজনৈতিক জীবন, আন্দোলন, ত্যাগ এবং অবদানের স্বীকৃতি আজ ছড়িয়ে পড়েছে মানুষের চোখের জলে, শ্রদ্ধায়, ভালোবাসায়।
তিনি রেখে গেলেন—সংগ্রামের ইতিহাস,নেতৃত্বের উদাহরণ,
এবং গণতন্ত্রের জন্য আজীবন লড়া এক নারীর শক্তিশালী উ
আজ তিনি নেই, কিন্তু তার রেখে যাওয়া অধ্যায় বাংলাদেশকে প্রভাবিত করবে বহু বছর।বাংলাদেশের রাজনীতিতে আজ শোকের দিন। ইতিহাস আজ এক অধ্যায়ের শেষ, আরেক অধ্যায়ের শুরু দেখে। বেগম খালেদা জিয়া—যিনি নিজেকে ইতিহাসের পাতায় লিখেছেন সংগ্রামের কালি দিয়ে—তিনি চলে গেলেন, কিন্তু তার রেখে যাওয়া সংগ্রামী উত্তরাধিকার চিরকাল থাকবে বাংলাদেশের রাজনীতির রক্তধারায়। আল্লাহ তাআলা তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন। আমিন।
Leave a Reply