সুনামগঞ্জে একুশে টিভি অফিসে ছাতকে
সাবেক আ’লীগ নেতা ইসলাম উদ্দিনের তাণ্ডব।
চাঁদা দাবি, ভাংচুর, মোবাইল ছিনতাই ও ফেসবুক লাইভে অপপ্রচার—থানায় মামলা।
জেলা প্রতিনিধি:
সুনামগঞ্জে একুশে টেলিভিশনের জেলা প্রতিনিধি ও দৈনিক জনকণ্ঠের সাংবাদিক মো. আব্দুস সালাম-এর অফিসে ঢুকে চাঁদা দাবি, ভাংচুর, হামলা ও মোবাইল ছিনতাইয়ের অভিযোগ উঠেছে ছাতকের ভাতগাঁও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ও চিহিৃত সন্ত্রাসী ইসলাম উদ্দিন।
তার নেতৃত্বে সন্ত্রাসীদের দিয়ে হামলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি—হামলার পর অভিযুক্ত আবার ফেসবুক লাইভে এসে উল্টো নিজের ওপর হামলার নাটক সাজিয়ে নানা অপপ্রচার চালিয়ে এলাকায় চরম ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
সে ফিল্মি স্টাইলে হামলা—অফিসে ঢুকেই ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি এ ঘটনা ঘটে। গত ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, শুক্রবার, সুনামগঞ্জ পৌরবিপণীস্থ একুশে টিভির জেলা অফিসে। বিকেলের দিকে সাংবাদিক আব্দুস সালাম নিজের ডেস্কে বসে নিয়মিত পেশাগত কাজে ব্যস্ত ছিলেন। ঠিক তখনই সন্ত্রাসী ইসলাম উদ্দিনের নেতৃত্বে ৩–৪ জন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি দেশীয় অস্ত্র হাতে সিনেমার দৃশ্যের মতো অফিসে ঢুকে পড়ে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান—অফিসে ঢুকেই ইসলাম উদ্দিন চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করেন। অভিযোগ করেন,আমার বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশের কারণে ১০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। আজই ৫ লাখ টাকা দিতে হবে—নইলে মেরে ফেলবো। হুমকির মাত্রা এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, সেখানে উপস্থিত প্রত্যেকে জীবন নিয়ে শঙ্কায় পড়ে। ক্যামেরার ট্রাইপড দিয়ে মাথায় আঘাত, হাতে জখম,চাঁদা না পেয়ে অভিযুক্তরা অফিসের আসবাবপত্র, চেয়ার-টেবিল ভাংচুর শুরু করে। সাংবাদিক সালাম বাধা দিতে গেলে ক্ষিপ্ত হয়ে ইসলাম উদ্দিন ক্যামেরা ট্রাইপড তুলে তাঁর মাথায় আঘাতের চেষ্টা করেন। সাংবাদিক হাত তুলে তা প্রতিহত করলে ডান হাত ও বাম হাতের কনুইয়ের নিচে গুরুতর ফোলা ও ব্যথাজনক জখম করা হয়।
এসময় হামলাকারীরা ধারালো চাকু প্রদর্শন করে ভয় দেখায় এবং অফিসের ভেতর বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। আহত সাংবাদিকের চিৎকারে আশপাশের কিছু লোক ছুটে এলে সন্ত্রাসীরা হত্যার হুমকি দিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। ১ লাখ টাকা মূল্যের স্যামসাং জেড ফোল্ড-৪ ছিনতাই হামলাকারীরা যাওয়ার আগে সাংবাদিক সালামের অফিস টেবিলে রাখা উচ্চমূল্যের একটি স্যামসাং Z Fold 4 মোবাইল ফোন (প্রায় ১ লাখ টাকা মূল্য) ছিনিয়ে নেয়। ঘটনাটি স্পষ্টভাবে “অন্যায় লাভের উদ্দেশ্যে সংঘটিত ছিনতাই”—যা ভুক্তভোগীর অভিযোগপত্রেও উল্লেখ রয়েছে।
হাসপাতালে চিকিৎসা—পরদিন থানায় মামলা হামলার পর আহত সাংবাদিককে স্থানীয়রা উদ্ধার করে সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে ভর্তি করেন। প্রাথমিক চিকিৎসার পর তিনি সুস্থ হয়ে পরদিন সুনামগঞ্জ সদর মডেল থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগের ভিত্তিতে ইসলাম উদ্দিনসহ অজ্ঞাতনামা কয়েকজনের বিরুদ্ধে একটি মামলা রুজু করা হয়েছে। হামলার পর উল্টো ফেসবুক লাইভে নাটক—‘আমাকেই নাকি মারতে গিয়েছিল! হামলার ঘটনা এখানেই শেষ নয়। ঘটনার পরপরই ইসলাম উদ্দিন নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে লাইভে গিয়ে দাবি করেন—
“আমাকেই নাকি মারতে চেয়েছে সাংবাদিক! তাঁর এই লাইভকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। স্থানীয় সাংবাদিক সমাজ ও সাধারণ মানুষ বলছেন হামলা, ভাংচুর, চাঁদাবাজি, মোবাইল ছিনতাই সব করে উল্টো লাইভে এসে ‘ভিকটিম’ সাজার এই মানসিকতা এলাকায় নতুন নয়।
ফেসবুকে দেওয়া ওই লাইভে সাংবাদিকের বিরুদ্ধে একের পর এক হুমকি, গালাগালি ও অপপ্রচার চালাতে দেখা যায়। যা আইন গতভাবেও দণ্ডনীয় অপরাধ। অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে’—ওসি রতন শেখ এ বিষয়ে সুনামগঞ্জ সদর মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) রতন শেখ বলেনঅভিযোগের প্রেক্ষিতে মামলা রুজু করা হয়েছে। বিষয়টি গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা হচ্ছে। অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। পুলিশ সূত্রে জানা যায়—ইসলাম উদ্দিন দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত। তাঁর বিরুদ্ধে পূর্বেও একাধিক অভিযোগ ছিল। তবে এবার সরাসরি সাংবাদিকের ওপর হামলা ও চাঁদাবাজির ঘটনায় প্রশাসন আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছে। স্থানীয় সাংবাদিক মহলের ক্ষোভ—‘প্রকাশ্যে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, দ্রুত গ্রেপ্তার চাই’ স্থানীয় সাংবাদিক সমিতি ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছেন—একজন সাংবাদিকের ওপর দিনের আলোয় এমন ন্যক্কারজনক হামলা গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর সরাসরি আঘাত। অভিযুক্তদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। এদিকে ঘটনার পর সাংবাদিক আব্দুস সালাম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। তিনি জানান—আমি আমার পেশাগত দায়িত্ব পালন করেছি। তার জন্য আজ জীবন দিতে বসেছিলাম। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি পূর্ণ আস্থা রয়েছে। ন্যায়বিচার চাই।
সুনামগঞ্জে একজন কর্মরত সাংবাদিকের ওপর চাঁদা দাবি, হামলা, ভাংচুর, ছিনতাই এবং পরবর্তীতে অপপ্রচার—সব মিলিয়ে ঘটনা এখন জেলার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। নাগরিক সমাজ ও সাংবাদিক মহল বলছে এই ঘটনায় যদি কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়া হয় তবে সন্ত্রাসীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠবে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার তৎপরতা ও আসামি গ্রেপ্তারই এখন সবার প্রত্যাশা।
Leave a Reply