মাঝরাতে সিলেটে তিন গ্রামের সংঘর্ষে পুলিশসহ আহত ১৫ জন
নিজস্ব প্রতিবেদক | সিলেট
সিলেট নগরীর তেমুখি পয়েন্টে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে তিন গ্রামের বাসিন্দাদের মধ্যে ভয়াবহ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। গভীর রাতে প্রায় দেড় ঘণ্টাব্যাপী চলা এ সংঘর্ষে পুলিশ সদস্যসহ কমপক্ষে ১৫ জন আহত হয়েছেন। বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) রাত সাড়ে ১২টার দিকে শুরু হওয়া এ সংঘর্ষে পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। তাৎক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ও সেনাবাহিনী মাঠে নামে এবং পরে সড়কের যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
জালালাবাদ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শামসুল হাবীব বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, “মধ্যরাতে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সাহেবেরগাঁও, কুমারগাঁও ও চারুগাঁও গ্রামের বাসিন্দাদের মধ্যে মারাত্মক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে। পরে সেনাবাহিনীও যোগ দেয়।”ঘটনার শুরু—কয়েকটি চেয়াকে কেন্দ্র করে পুলিশ ও স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে জানা যায়, রাতে তেমুখি পয়েন্টে একটি স্থানীয় রাজনৈতিক পথসভা চলছিল। সেখানে সামনের সারিতে বসাকে কেন্দ্র করে তিন গ্রামের কয়েকজন যুবকের মধ্যে প্রথমে তর্ক-বিতর্ক শুরু হয়। কে সামনের সারিতে বসবে, কার চেয়ার কার আগে রাখা হয়েছে—এ নিয়ে শুরু হওয়া কথাকাটাকাটি মুহূর্তের মধ্যে উত্তেজনায় রূপ নেয়। পরে উভয়পক্ষের আরও লোক ঘটনাস্থলে এসে যোগ দিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
স্থানীয়রা জানান, রাত তখন সাড়ে ১২টা ছুঁই ছুঁই। অধিকাংশ দোকান-পাট বন্ধ। হঠাৎ হৈচৈ, চিৎকার এবং পরে সংঘর্ষ শুরু হলে আশপাশের বাসিন্দারা আতঙ্কে ঘরে ঢুকে দরজা-জানালা বন্ধ করে ফেলেন। দুই পক্ষ লাঠি, ইট-পাথরসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম ব্যবহার করে একে অপরকে আক্রমণ করে। ফলে পুরো এলাকা যুদ্ধক্ষেত্রের মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
দেড় ঘণ্টা তাণ্ডব, অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে সিলেট–সুনামগঞ্জ সড়ক
প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে চলে উত্তাপ, ধাওয়া–পাল্টা ধাওয়া, ইট-পাটকেল নিক্ষেপ। সংঘর্ষের তীব্রতায় সিলেট–সুনামগঞ্জ মহাসড়কের তেমুখি অংশ সম্পূর্ণভাবে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। যেসব যানবাহন তখন সেখানে ছিল, সেগুলো আটকে পড়ে; যাত্রীরা আতঙ্কে গাড়ির ভেতরেই নিরাপত্তা খুঁজতে থাকে।
ধীরে ধীরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে থাকলে জালালাবাদ থানা পুলিশ অতিরিক্ত ফোর্স নিয়ে ঘটনাস্থলে আসে। তবে ততক্ষণে দুই পক্ষের মারামারি আরও বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে সেনাবাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে যোগ দেয়। যৌথভাবে অভিযান চালিয়ে সংঘর্ষকারীদের ছত্রভঙ্গ করা হয়।
আহতদের চিত্র
এ ঘটনায় পুলিশ সদস্যসহ কমপক্ষে ১৫ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। তবে স্থানীয় সূত্র বলছে, প্রকৃত আহতের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। অনেকেই গ্রাম এলাকায় প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে চলে গেছেন। আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। তাদের সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। সংঘর্ষ চলাকালীন কিছু বাড়িঘরের কাঁচ ভাঙচুরসহ কয়েকটি দোকানপাট ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। তবে সার্বিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখনো নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি।পুলিশ–সেনাবাহিনীর যৌথ টহল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসার পরও তেমুখি পয়েন্ট ও আশপাশের এলাকায় সেনাবাহিনী ও পুলিশের যৌথ টহল জোরদার করা হয়েছে। ভোর রাত পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অতিরিক্ত ফোর্স মোতায়েন থাকে, যাতে পুনরায় কোনো ধরনের সহিংসতা সৃষ্টি না হয়।
ওসি শামসুল হাবীব বলেন, “বর্তমানে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এলাকায় অতিরিক্ত ফোর্স টহল দিচ্ছে। সংঘর্ষকারীদের শনাক্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
স্থানীয়দের আতঙ্ক ও ক্ষোভ সংঘর্ষের ঘটনার পর স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। অনেকেই জানান, রাজনৈতিক বা সামান্য বিষয় নিয়ে গ্রামের যুবকদের মধ্যে উত্তেজনা বেশ কিছুদিন ধরেই থাকলেও এমন ভয়াবহ সংঘর্ষের ঘটনা সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যায়নি। ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেন, রাতে নিয়মিত পুলিশি টহল থাকলে পরিস্থিতি এত দূর গড়াত না। এক বাসিন্দা বলেন, “সিলেটের মতো একটি নগরীতে আধিপত্য নিয়ে তিন গ্রামের লোকজনের এমন ভাবে মারামারি খুবই দুঃখজনক। আমাদের মতো সাধারণ মানুষ আতঙ্কে রাত কাটিয়েছি।”তদন্ত ও পরবর্তী ব্যবস্থা পুলিশ জানিয়েছে, সংঘর্ষের পেছনে যারা পরিকল্পনা বা উস্কানি দিয়েছে তাদের শনাক্তে তদন্ত শুরু হয়েছে। পাশাপাশি এলাকার সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ নজরদারি চলছে। ঘটনাস্থলে থাকা ভিডিও ফুটেজ, সিসিটিভি ক্যামেরার ভিডিও এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনার ভিত্তিতে জড়িতদের বিরুদ্ধে মামলা করা হবে।
প্রশাসনের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে বিভিন্ন এলাকায় উত্তেজনা বাড়ছে। তেমুখির রাতের ঘটনাটিও এর একটি প্রতিফলন হতে পারে।
উপসংহার মাঝরাতে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে পরিণত হওয়া এই ঘটনা সিলেট নগরীর সাধারণ মানুষের জন্য উদ্বেগজনক। কর্তৃপক্ষ বলছে, আইনশৃঙ্খলার স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনতে তারা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। তবে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও সামাজিক সংগঠনগুলোর মধ্যস্থতা ছাড়া এ ধরনের সংঘর্ষের পুনরাবৃত্তি রোধ করা কঠিন হবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
Leave a Reply