বিদ্রোহী প্রার্থীদের কারণে বিএনপিতে গৃহদাহ,
স্বতন্ত্রদের নিয়ে তৎপর গুলশান কার্যালয়
স্টাফ রিপোর্টার:
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বড় ধরনের সাংগঠনিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে ক্ষমতাচ্যুত দল বিএনপি। জোটগত কৌশল ও দলীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে বেশ কয়েকজন নেতার স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ায় গুলশান থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যন্ত দলে তৈরি হয়েছে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্যকারীদের বিষয়ে এখন কঠোর অবস্থান নিতে শুরু করেছে বিএনপি।
দলীয় এবং গুলশান কার্যালয়ের সূত্র বলছে, বিভাগওয়ারি স্বতন্ত্র প্রার্থীদের পর্যায়ক্রমে ডেকে সাক্ষাৎ করছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। লন্ডন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে তিনি বিদ্রোহীদের সঙ্গে কথা বলে সিদ্ধান্ত পরিবর্তনে চাপ দিচ্ছেন। আলোচনা–সমঝোতার এই প্রক্রিয়ায় ইতোমধ্যে কয়েকজন স্বতন্ত্র প্রার্থী নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন।
এরই অংশ হিসেবে সুনামগঞ্জ–৫ (ছাতক–দোয়ারাবাজার) আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ও বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মিজানুর রহমান মিজান শুক্রবার রাতে তারেক রহমানের সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠকের পর শনিবার নির্বাচনী মাঠ থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন। দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত নেতা হিসেবে তার বিদ্রোহী হয়ে দাঁড়ানো বিষয়টি বিএনপির অন্দরে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। তবে গুলশান কার্যালয়ের সক্রিয় তৎপরতায় শেষ পর্যন্ত তিনি দলীয় সিদ্ধান্তে সমর্থন জানিয়ে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান।
সিলেট বিভাগজুড়ে বিদ্রোহী প্রার্থী—দলীয় অস্বস্তি বাড়ছে
সিলেট বিভাগে শুধু মিজানুর রহমান নন, আরও আটজন বিএনপি নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন জমাদিয়েছিলেন। এসব নেতার অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে দলের রাজনীতিতে সক্রিয়, কারও কারও নিজ এলাকায় উল্লেখযোগ্য প্রভাবও রয়েছে।
বিএনপি সূত্রে জানা যায়, সিলেট–৫ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়া মামুনুর রশীদ ওরফে চাকসু মামুনকে ইতোমধ্যে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ এনে কেন্দ্রীয় কমিটি কঠোর সিদ্ধান্ত নেয়। গুলশান কার্যালয় মনে করছে—যদি প্রার্থীতা প্রত্যাহারের আল্টিমেটাম না দেওয়া হতো, আরো অনেক নেতাই দলীয় প্রতীক উপেক্ষা করে স্বতন্ত্রভাবে লড়াইয়ে নেমে যেতেন। দলের একাধিক দায়িত্বশীল নেতা জানান, বিদ্রোহী প্রার্থীদের কারণে মূল প্রার্থীরা মাঠে অস্বস্তি বোধ করছেন। নির্বাচনের আগে বিএনপি আন্দোলনকেন্দ্রিক রাজনীতি করেছে। সে আলোকে অনেকেই দলে সাংগঠনিক পুরস্কার প্রত্যাশা করছিলেন। কিন্তু প্রার্থী বাছাইয়ের সময় কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তকে অমান্য করে বেশ কয়েকজন স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ায় দলীয় সংহতিতে একটি সুস্পষ্ট ভাঙন দৃশ্যমান হয়।“সময়সীমার মধ্যে সরে না দাঁড়ালে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা” — দলের কঠোর বার্তা বিএনপি নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা যুগান্তরকে জানান, তফসিল অনুযায়ী মনোনয়ন প্রত্যাহারের সময়সীমা শেষ না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করছে দল। যারা সময়ের মধ্যে প্রত্যাহার করবেন না, তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সাময়িক বহিষ্কার, পদ স্থগিত, এমনকি স্থায়ী বহিষ্কারও থাকতে পারে। দলের একজন স্থায়ী কমিটির সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “দলের সিদ্ধান্ত না মেনে স্বতন্ত্র হওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এটি শুধু শৃঙ্খলাভঙ্গ নয়, দলের সম্মিলিত আন্দোলন ও নির্বাচনি কৌশলকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। সুতরাং যারা এখনও প্রার্থী থাকবেন, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া ছাড়া বিকল্প নেই।” বাছাই পর্যায়ে ৩০ স্বতন্ত্রের মনোনয়ন বাতিল মনোনয়ন বাছাইয়ের প্রক্রিয়া শেষে দলীয় সূত্রে জানা যায়, তথ্যগত ত্রুটি এবং আইনগত অসঙ্গতি থাকায় অন্তত ৩০ জন স্বতন্ত্র প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে। ফলে আপাতদৃষ্টিতে অনেক আসনে স্বতন্ত্রদের চাপ কিছুটা কমলেও এখনও বহু আসনে প্রভাবশালী নেতারা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন।
গুলশান কার্যালয়ের একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বলেন—
“যাদের মনোনয়ন বাতিল হয়েছে, তাদের অনেকেই দলের কেন্দ্রীয় বা জেলা পর্যায়ে পরিচিত মুখ। কিন্তু যাদের মনোনয়ন বৈধ আছে, তারা নির্বাচন থেকে সরতে আপাতত অনীহা দেখাচ্ছেন। তাই কেন্দ্রীয় পর্যায়ে ব্যক্তিগত যোগাযোগ, আলোচনা এবং বোঝানোর কাজ চলছে।বিদ্রোহের নেপথ্য কারণ—মনোনয়ন নিয়ে হতাশা ও স্থানীয় কোন্দল
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, বিএনপির বহুদিনের আন্দোলন, গ্রেপ্তার–হামলা–মামলার প্রেক্ষাপটে তৃণমূলে অনেক নেতাই মনে করেছিলেন যে নির্বাচন হলে তারা দলীয় প্রতীক পেতে পারেন। কিন্তু দলের কৌশলগত সিদ্ধান্ত ও জোটগঠনের প্রভাবের কারণে অনেককে মনোনয়ন দেওয়া সম্ভব হয়নি।
স্থানীয় পর্যায়ে প্রার্থীদের মধ্যকার গ্রুপিং, দীর্ঘদিন সাংগঠনিক নিষ্ক্রিয়তা এবং কেন্দ্রীয় কমিটির ভেতর নানা মতপার্থক্যও বিদ্রোহের অন্যতম কারণ বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে সিলেট বিভাগের কয়েকটি আসনে একাধিক যোগ্য নেতা থাকায় মনোনয়ন পাওয়া–না–পাওয়ার বিষয়টি তীব্র অসন্তোষের জন্ম দেয়। গুলশান কার্যালয়ের তৎপরতা—তারেক রহমানের সরাসরি সম্পৃক্ততা দলের অভ্যন্তরীণ সংকট নিরসনে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সরাসরি তদারকি করছেন বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।।গুলশানে প্রতিদিন সন্ধ্যার পর থেকেই বিদ্রোহী প্রার্থীদের তালিকা অনুযায়ী তাদের ডেকে পাঠানো হচ্ছে। ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মে তারেক রহমান তাদের সঙ্গে কথা বলে দলের কৌশল ব্যাখ্যা করছেন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী না হয়ে দলীয় ঐক্য বজায় রাখার আহ্বান জানাচ্ছেন।
একজন জেলা পর্যায়ের নেতা বলেন—তারেক রহমান পরিষ্কার বলেছেন যে দল এখনো আন্দোলনকে মূলধারায় রাখবে। নির্বাচন কৌশলগতভাবে নেওয়া সিদ্ধান্ত। বিদ্রোহী হয়ে দাঁড়ালে দলের সামগ্রিক স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।”
সুনামগঞ্জ-৫ উদাহরণে স্বস্তি—মাঠে টান টান উত্তেজনা
সুনামগঞ্জ–৫ আসনে মিজানুর রহমান মিজানের সরে দাঁড়ানো বিএনপির জন্য একটি বড় স্বস্তি বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। এই আসনে ইতোমধ্যে ক্ষমতাসীন দলের অনুপস্থিতিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা মূলত স্বতন্ত্র ও অন্যান্য দলের প্রার্থীদের ওপর কেন্দ্রিত হচ্ছিল। মিজানের প্রার্থী হওয়া স্থানীয় রাজনীতিতে জটিলতা তৈরি করেছিল। তার সরিয়ে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্তে দলের মনোনয়ন পাওয়া নেতার জন্য পথ অনেকটা পরিষ্কার হয়েছে।
একজন স্থানীয় বিএনপি নেতা বলেন—“মিজান ভাই নির্বাচন করতেন, তাহলে দলের ভোট দ্বিখণ্ডিত হওয়ার আশঙ্কা ছিল। উনার সিদ্ধান্তে এখন আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে মাঠে নামতে পারব। বিদ্রোহীদের প্রভাব—নির্বাচনি কৌশল ব্যাহত হওয়ার শঙ্কা একাধিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং সাবেক নির্বাচন পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, বিএনপির বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান বিবেচনায় বিদ্রোহী প্রার্থীদের উত্থান দলটিকে এক ধরনের সাংগঠনিক দুর্বলতা প্রকাশ করে। নির্বাচন বয়কট বা আংশিক অংশগ্রহণ—উভয় কৌশলের সঙ্গেই বিদ্রোহী প্রার্থীদের ভূমিকা অস্বস্তিকর। তারা যদি মাঠে শক্ত অবস্থানে থাকেন, তাহলে দলীয় ভোট বিভক্ত হয়ে যেতে পারে। আবার প্রত্যাহারের পরও অনেক জায়গায় অভিমানের প্রভাব থেকে তৃণমূল–নেতাকর্মীদের মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টি হতে পারে।
দলীয় একতা পুনঃস্থাপনে প্রচেষ্টা
স্বতন্ত্র প্রার্থীদের প্রত্যাহার করানোই শেষ সমাধান নয়। দলের কেন্দ্রীয় কমিটি এখন তৃণমূলে নেতাকর্মীদের বোঝাতে বিশেষ নির্দেশনা পাঠাচ্ছে যেন কেউ বিদ্রোহীদের সঙ্গে কাজ না করেন। একই সঙ্গে জেলা–মহানগর পর্যায়ের কমিটিকে সাংগঠনিক সভা করতে বলা হয়েছে যাতে আসন্ন নির্বাচনে দলের ঘোষিত কৌশল বাস্তবায়ন নিশ্চিত হয়।
বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে বিএনপির অভ্যন্তরে বিদ্রোহী প্রার্থীদের ইস্যুটি বড় ধরনের আলোচনার জন্ম দিয়েছে। দলীয় শৃঙ্খলা, নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্য এবং কৌশলগত সিদ্ধান্তের প্রতি সমর্থন—এই সব প্রশ্নে বিএনপিকে এখন কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। গুলশান কার্যালয়ের তৎপরতা, তারেক রহমানের সরাসরি যোগাযোগ এবং সাংগঠনিক ব্যবস্থার হুঁশিয়ারির কারণে অনেকেই স্বতন্ত্রতা থেকে সরে আসছেন—যা দলটির জন্য ইতিবাচক ইঙ্গিত। তবে যারা এখনো মনোনয়ন প্রত্যাহার করেননি, তাদের বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিতে প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপি। অতএব, সিলেট বিভাগসহ সারাদেশে বিদ্রোহীদের ইস্যু একদিকে যেমন দলের জন্য অস্বস্তি তৈরি করেছে, অন্যদিকে সমঝোতার পথে সমাধান খুঁজে পাওয়ারও সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। নির্বাচন সামনে এগোতে থাকলে বিএনপির সাংগঠনিক ঐক্য কোন দিকে দাঁড়াবে—তা এখন সময়ের অপেক্ষা।
Leave a Reply