৩০ বছরে এত ভয়াবহ ভূমিকম্প
দেখেনি বাংলাদেশ
আনোয়ার হোসেন রনি
সারা দেশজুড়ে আতঙ্ক, প্রাণহানি, ভবন থেকে মানুষের বের হয়ে আসা, আর সামাজিক মাধ্যমে উৎকণ্ঠা—সব মিলিয়ে আজকের সকালটি যেন বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে এক দুঃসহ স্মৃতি হয়ে রইল।
শুক্রবার (২১ নভেম্বর) সকাল ১০টা ৩৯ মিনিটে সারা দেশে যে তীব্র ভূমিকম্প অনুভূত হলো, তা গত ৩০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প বলে নিশ্চিত করেছে ভূমিকম্প গবেষণা কেন্দ্র। মাত্রা ছিল ৫.৭। মুহূর্তের মধ্যেই মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে রাস্তায় নেমে আসে।
এই ভূমিকম্পে ঢাকা শহরে ৪ জনসহ সারা দেশে মোট ৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন অনেকেই। কোথাও ভবনের দেয়াল ধসে পড়েছে, কোথাও সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে লোকজন পড়ে গিয়ে আহত হয়েছেন। বিশেষ করে বয়স্ক এবং শিশুদের মধ্যে আতঙ্ক বেশি দেখা গেছে।
সকাল ১০:৩৯—মাত্র কয়েক সেকেন্ডের তীব্র কম্পন শুক্রবারের শান্ত সকাল—অফিস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ; তাই অনেকে তখনও ঘুমে বা ঘরের ভেতরে ছিলেন। ঠিক এই সময় হঠাৎ করে মাটি দোলার অনুভূতিতে স্তব্ধ হয়ে যায় রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলা। বাসা-বাড়ির ফ্যান, ঝাড়বাতি, জানালা-দরজা কাঁপতে থাকে প্রচণ্ডভাবে। মাত্র ১৫–২০ সেকেন্ডের কম্পনে মানুষ বুঝে যায়—এটি সাধারণ ভূমিকম্প নয়।
কেউ দৌড়ে বেরিয়ে আসে খোলা জায়গায়, কেউ ফোন হাতে উদ্বিগ্ন হয়ে প্রিয়জনের খোঁজ করতে থাকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে ভিডিও, লাইভ স্ট্রিমিং ও সতর্ক বার্তা। গত ৩০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় ভূমিকম্প”—ভূমিকম্প গবেষণা কেন্দ্র ভূমিকম্প গবেষণা কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রুবায়েত কবির দুপুরে সাংবাদিকদের জানান, বাংলাদেশের ভৌগোলিক কাঠামো অনুযায়ী আজকের ভূমিকম্পটিকে গত তিন দশকের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী বলা যায়। তিনি আরও বলেন—“এর উৎপত্তিস্থল ছিল নরসিংদীর মাধবদী। স্বল্প গভীরতার কারণে ভূমিকম্পের কম্পন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে।”
এই তথ্য নিশ্চিত হওয়ার পর বিশেষজ্ঞরা বলেন, উৎপত্তিস্থল যদি জনবহুল অঞ্চলের খুব কাছে হয়, তবে মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পও ভয়াবহ ক্ষতি করতে পারে। হিরোসিমা–নাগাসাকির বোমার সমান শক্তি মুক্তি পেয়েছে ভূমিকম্প গবেষণা কেন্দ্রের দেয়া আরও এক চমকপ্রদ তথ্য জনমনে আলোড়ন তুলেছে।
রুবায়েত কবির জানান—“হিরোসিমা বা নাগাসাকিতে ফেলা একটি পারমাণবিক বোমা যে শক্তি উৎপন্ন করে, আজকের ভূমিকম্প প্রায় সেই মাত্রার শক্তি রিলিজ করেছে।” বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূমিকম্পের মাত্রা ৫.৭ হলেও শক্তির ঘনত্ব ছিল অত্যন্ত বেশি। ভূ-তলের শক্তি-মুক্তির ধরন (Energy Release Pattern) অত্যন্ত বিস্ফোরক ছিল, যে কারণে কম্পনের সময় মানুষ বড় ক্ষতি হবে বলে ভয় পেয়েছে।
ঢাকায় প্রাণহানি—আতঙ্কে মৃত্যু, ধসে পড়া দেয়াল
ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে ৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ধানমন্ডিতে আতঙ্কে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে একজনের মৃত্যু মিরপুরে বাসার সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে পড়ে গিয়ে বৃদ্ধার মৃত্যু
পুরান ঢাকায় দেয়াল ধসে একজন নিহত উত্তরায় একজন বিষম খেয়ে শ্বাসরোধে মারা যান।
দেশের বিভিন্ন জেলা থেকেও আহতদের খবর আসছে। এদের মধ্যে অনেকে ভবন থেকে দ্রুত বের হওয়ার সময় পড়ে গিয়েছেন। কোথাও কোথাও পুরনো ভবনের ফাটল দেখা গেছে। ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, কিছু এলাকায় মানুষ আটকে পড়ার খবর পাওয়া গেলেও বড় ধরনের ধস বা অগ্নিকাণ্ড ঘটেনি।
উত্তরবঙ্গে, চট্টগ্রামেও অনুভূত শুধু ঢাকা নয়, ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে—সিলেট ময়মনসিংহ চট্টগ্রাম বগুড়া রংপুর
কুমিল্লা বরিশাল কিছু এলাকায় কম্পনের তীব্রতা এত প্রবল ছিল যে মানুষ মনে করেছে “ঘর ভেঙে পড়বে”। ভারতের পশ্চিমবঙ্গও কেঁপে ওঠে এ ভূমিকম্পের কম্পন শুধুমাত্র বাংলাদেশের ভেতরেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতা, হাওড়া, নদীয়া, মালদা, শিলিগুড়ি এলাকাতেও মৃদু ভূকম্পন অনুভূত হয়েছে। কলকাতা মেট্রো স্টেশনগুলোতে কিছুক্ষণ যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। কয়েকটি স্কুলের শিক্ষার্থীদের মাঠে নিয়ে যাওয়া হয় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে।
রাজধানীর মোবাইল নেটওয়ার্কে চাপ ভূমিকম্পের কয়েক মিনিট পরই মোবাইল নেটওয়ার্কে চাপ দেখা দেয়। অনেকেই জানান, একাধিকবার ফোন দিলেও কল কানেক্ট হয়নি।টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) জানায়, একই সময়ে লাখো মানুষ কল দেওয়ায় নেটওয়ার্কে চাপ তৈরি হয়েছিল, যার ফলে সাময়িক সমস্যার সৃষ্টি হয়। বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা—“টানা আফটারশক আসতে পারে” ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় ভূমিকম্পের পর ২৪–৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ছোট ছোট বেশ কয়েকটি আফটারশক আসতে পারে। এক বিশেষজ্ঞ বলেন—“এ ধরনের স্বল্প গভীরতার ভূমিকম্পের পরে মৃদু কম্পন আসা স্বাভাবিক। জনগণকে আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন থাকতে হবে।”
সরকারি নির্দেশনা—ভবনগুলো পরীক্ষা করা হচ্ছে
গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় জানায়, রাজধানীর ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো দ্রুত পরীক্ষা করা হবে। ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে—পুরনো ভবন ফাটল ধরা দালান ঝুঁকিপূর্ণ বহুতল এসব স্থাপনায় বিশেষ নজর দেওয়া হবে। জনমনে তীব্র আতঙ্ক—“এভাবে শুক্রবারেই কি কেয়ামত?”সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মন্তব্যগুলোতে দেখা গেছে অধিকাংশ মানুষ আতঙ্কিত ছিলেন। কেউ কেউ ধর্মীয় অনুভূতি থেকেই বলেন—“শুক্রবারেই তো কেয়ামত হবে বলা আছে, এ কি সেই ইঙ্গিত?” যদিও আলেমরা জানিয়েছেন—
“ভূমিকম্প আল্লাহর শক্তির নিদর্শন, কিন্তু এটি কেয়ামতের চিহ্ন বলে এককথায় বলা যাবে না।”।অতীতের ভূমিকম্পের তুলনায় কত ভয়াবহ ছিল? বাংলাদেশে ২০০৩, ২০১৬, ২০২২ সালেও মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছিল। তবে সেগুলো মূলত সীমান্তবর্তী অঞ্চল থেকে উৎপন্ন। কিন্তু আজকের ভূমিকম্প—ছিল স্বল্প গভীরতার ছিল জনবহুল এলাকায় ছিল বহু বছরের মধ্যে শক্তিশালী যে কারণে তার প্রভাব ছিল মারাত্মক।
সাধারণ মানুষের জন্য জরুরি পরামর্শ বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিয়েছেন— ভবনে কোনো ফাটল দেখা গেলে অবিলম্বে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাতে লিফট ব্যবহার না করতে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টা সতর্ক থাকতে অপ্রয়োজনে গুজবে কান না দিতে মোবাইল নেটওয়ার্কে অতিরিক্ত চাপ না দিতে শেষ কথা মাত্র কয়েক সেকেন্ডের কম্পনই গোটা দেশকে বুঝিয়ে দিল—ভূমিকম্প বাংলাদেশের জন্য কত বড় হুমকি হতে পারে। প্রাণহানি তুলনামূলক কম হলেও আতঙ্কের মাত্রা ছিল বিপুল।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন— বাংলাদেশ এখন এমন একটি ভূমিকম্প-সংবেদনশীল জোনে রয়েছে, যেখানে বড় ধরনের প্রস্তুতি ছাড়া ভবিষ্যতে আরও বড় বিপর্যয়ের ঝুঁকি রয়েছে। আজকের ভয়াবহ ভূমিকম্প তাই শুধু এক দিনের ঘটনা নয়—এটি দেশের দুর্বল ভবন কাঠামো, ভূমিকম্প প্রস্তুতি এবং শহর পরিকল্পনার বড় প্রশ্নচিহ্ন হয়ে সামনে এসেছে।
Leave a Reply