Breaking News

১৯৫৪ থেকে ২০২০ইং পর্যন্ত ইলমে দ্বীনের মহান খাদিম হযরত মাওলানা আব্দুল কাদির ঘোড়াডুম্বুরী (র.)

Print Friendly, PDF & Email

১৯৫৪ থেকে ২০২০ইং পর্যন্ত ইলমে দ্বীনের মহান খাদিম
হযরত মাওলানা আব্দুল কাদির ঘোড়াডুম্বুরী (র.)
——–অধ্যক্ষ মাওলানা মাইনুল ইসলাম পারভেজ
আমাদের শ্রদ্ধেয় উস্তাদ হযরত মাওলানা আব্দুল কাদির ঘোড়াডুম্বুরী (র.) ছিলেন একজন বরেণ্য আলিমে দ্বীন, আশিকে রাসূল, আবিদ ও পবিত্র কুরআনের একনিষ্ঠ মহান খাদিম। সমাজ সেবায় তিনি ছিলেন নিবেদিত প্রাণ, অশিক্ষার বিরুদ্ধে তিনি আজীবন সংগ্রাম করেছেন। বাস্তব জীবনে তিনি যেমন ছিলেন ইলমে দ্বীনের পতাকাবাহী একজন সফল কর্মবীর তেমনি আধ্যাত্মিক জগতেও ছিলেন উঁচু মাপের বুযুর্গ। বিনয়ী, উদার মানসিকতা ও শান্ত স্বভাবের একজন ঈমানদীপ্ত মহান ব্যক্তিত্ব, যিনি ‘বুরাইয়ার হুজুর’ নামে সকলের নিকট সুপরিচিত ছিলেন।
তিনি সুনামগঞ্জ জেলার দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার সবুজ ছায়াঘেরা নিভৃত পল্লী ঘোড়াডুম্বুরে ১৯৫৪ সালে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর পিতা হাজী রুশন আলী ও মাতা মোছা: আফতাবান বিবি। প্রাকৃতিক ও জন্মগতভাবে তীক্ষ্ম মেধার অধিকারী হযরত মাওলানা আব্দুল কাদির ঘোড়াডুম্বুরী (র.) গ্রামের মক্তবে প্রাথমিক ধর্মীয় শিক্ষা সংক্রান্ত বিষয়াবলীর জ্ঞান অর্জন শুরু করেন। পরবর্তীতে দারুল কিরাত মজিদিয়া ফুলতলী ট্রাস্টের অধীনে সিলেট সদর উপজেলায় অবস্থিত হাউসা আলিম মাদরাসা ও ছাতক উপজেলার লাকেশ্বর দাখিল মাদরাসা শাখা কেন্দ্রে বিশুদ্ধ কুরআন শিক্ষা অর্জন করেন। তাছাড়া উক্ত প্রতিষ্ঠানদ্বয়ে প্রাথমিক শিক্ষাও সমাপন করেন। অতঃপর ঐতিহ্যবাহী দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সৎপুর দারুল হাদীস কামিল মাদরাসায় ১৯৬৬ সালে সপ্তম শ্রেণীতে ভর্তি হন। উক্ত প্রতিষ্ঠান থেকে পূর্ব পাকিস্তান মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ১৯৬৯ সালে দাখিল পরীক্ষায় কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন। উক্ত প্রতিষ্ঠান থেকে বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ১৯৭১ সালে আলিম ১৯৭৩ সালে ফাযিল ও ১৯৭৫ সালে কামিল (হাদীস) পরীক্ষায় কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হন। তাছাড়া তিনি শামসুল উলামা আল্লামা ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (র.)-এর নিকট থেকে ১৯৭৪ সালে ইলমে কিরাতের সনদ লাভ করেন।
ছাত্রাবস্থায় তিনি যামানার মুজাদ্দিদ, আধ্যাত্মিক সম্রাট আল্লামা ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (র.)-এর দস্ত মুবারকে বাইয়াত গ্রহণ করে ধীরে ধীরে তাসাউফের উচ্চশিখের পৌঁছেন এবং স্বীয় মুর্শিদের নিকট থেকে তরিকতের খিলাফত লাভ করেন। তিনি তাঁর পীর ও মুরশিদের অনুমতি ক্রমে ১৬টি স্থানে নিয়মিত খানকাহ মাহফিল পরিচালনা করেন যেমন- বুরাইয়া কামিল (এম.এ) মাদরাসা, ঘোড়াডুম্বুর হাফিজিয়া দাখিল মাদরাসা, লতিফিয়া ইরশাদিয়া দাখিল মাদরাসা (গোয়াহরী), খাইরুল ওয়ারা হাফিজিয়া মাদরাসা সিচনী, রসুলগঞ্জ কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ (জগন্নাথপুর), হলিয়ারপাড়া জামে মসজিদ (জগন্নাথপুর), আক্তারপাড়া বাজার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ, সিঙ্গেরকাছ বাজার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ, আলমপুর জামে মসজিদ, জাহিদপুর জামে মসজিদ, পালপুর জামে মসজিদ, বরাটুকা মেওয়াতৈল জামে মসজিদ, মাওলানা আব্দুস সালাম (র.) তেলিকোনী সাহেবের বাড়ি, তেলিকোনা বাদশাহ মিয়া সাহেবের বাড়ি, জালালপুর আব্দুল মতিন সাহেবের বাড়ি, ভাটিপাড়া জামে মসজিদ তাছাড়া অনিয়মিতভাবে আরো ৪টি স্থানে খানকাহ মাহফিলের খেদমত আঞ্জাম দিয়েছেন। পারিবারিক জীবনে তিনি ১৯৭৬ সালে সুনামগঞ্জ জেলার দিরাই উপজেলার নাগেরগাঁও গ্রামের জনাবা রহিমা বেগমের সাথে প্রথম বিবাহ এবং ১৯৯৪ সালে একই উপজেলার বদলপুর গ্রামের জনাবা জুবেদা বেগমের সাথে দ্বিতীয় বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তিনি চার ছেলে এবং পাঁচ কন্যা সন্তানের গর্বিত জনক। তারা হলেন: আবু হেনা মো: ইয়াছিন, বাদেদেওরাইল ফুলতলী কামিল (এম.এ) মাদরাসায় অধ্যয়নরত, আবু ইউসুফ মো: ইমরান, আবু মুসা মো: সালমান, আহমদ হোসাইন মো: লুকমান, মোছা: তাহেরা বেগম, মোছা: সুলতানা বেগম, মোছা: সালমা বেগম, মোছা: মরিয়ম বেগম, মোছা: সোমা বেগম। তিনি ১৯৮৩ সালে সর্বপ্রথম হজব্রত পালনের জন্য পবিত্র ঘর কাবার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। পবিত্র মক্কা মুকাররামায় হজ্জের কার্যাদি সমাপন ও মদিনা মুনাওয়ারার যিয়ারত শেষে বাড়িতে ফিরে আসেন। মোট ১১ বার তিনি পবিত্র হজ্জব্রত পালন করেন। হযরত মাওলানা আব্দুল কাদির ঘোড়াডুম্বুরী (র.) ১৯৭৫ সালে বুরাইয়া কামিল মাদরাসায় সহকারী মাওলানা পদে যোগদান করে ইসলামী শিক্ষা বিস্তারে কার্যক্রম শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে সহকারী মাওলানা পদটি প্রভাষক (আরবী) পদে রূপান্তরিত হলে তিনি বুরাইয়া কামিল মাদরাসার প্রভাষক (আরবি) পদে সমাসীন হন। ৩১ ডিসেম্বর ২০১৪ সালে প্রভাষক (আরবি) পদে থাকাবস্থায় অবসর গ্রহণ করেন। ১৯৭৫ সাল থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত দারুল কিরাত মজিদিয়া ফুলতলী ট্রাস্ট বুরাইয়া কামিল মাদরাসায় পবিত্র কুরআনের খিদমতে ছিলেন। ১৯৮৯ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত একাধারে সুদীর্ঘ ৩০ বছর ফুলতলীতে দারুল কিরাত প্রধান কেন্দ্রে নিঃস্বার্থভাবে খিদমত আঞ্জাম দিয়েছেন। তিনি ইসলামী শিক্ষা বিস্তারের লক্ষে প্রতিষ্ঠা করেছেন ঘোড়াডুম্বুর হাফিজিয়া দাখিল মাদরাসা। তাছাড়া ছিলেন দারুল কিরাত মজিদিয়া ফুলতলী ট্রাস্ট বুরাইয়া কামিল মাদরাসা শাখার সভাপতি ও ঘোড়াডুম্বুর হাফিজিয়া মাদরাসা শাখার নাজিম। একাধারে ১২ বছর বুরাইয়া পূর্বপাড়া জামে মসজিদের ইমাম ও খতিব হিসেবে এবং ১৫ বছর ঘোড়াডুম্বুর কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের মোতাওয়াল্লী ও ক্যাশিয়ারের দায়িত্ব পালন করেন।
একজন দ্বীনের খাঁটি সেবক ও বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ হিসেবে তাঁর বিশেষ খ্যাতি ছিল। সিলেট বিভাগের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ওয়াজ নসিহত ও বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে পথহারা মানুষকে সঠিক পথের সন্ধান দানের নিমিত্ত তিনি গোটা জীবন অতিবাহিত করেন। ইলমে কিরাতে তাঁর লক্ষাধিক ছাত্র রয়েছেন। যারা দুনিয়ার বিভিন্ন দেশে কুরআন মজীদ বিশুদ্ধরূপে তিলাওয়াতের শিক্ষা বিস্তারে ভূমিকা রাখছেন। তাছাড়া সুদীর্ঘ ৪০ বছরের শিক্ষকতা জীবনে অসংখ্য শিক্ষার্থীর অন্তরে শিক্ষার আলো প্রজ্জলিত করেছেন। কুরআন সুন্নাহদীপ্ত এ খাদিমের নিকট থেকে হাজারো শিক্ষার্থী সুশিক্ষা অর্জনের মাধ্যমে দেশ বিদেশে ইসলামী শিক্ষা বিস্তারে নিয়োজিত রয়েছেন। ইলমে দ্বীনের মহান খাদিম, বিশিষ্ট বুযুর্গ হযরত মাওলানা আব্দুল কাদির ঘোড়াডুম্বুরী (র.) ১লা সেপ্টেম্বর ২০২০ সালে ফযরের নামায সমাপনান্তে মহান আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে অসংখ্য শিক্ষার্থী ও ভক্ত মুরিদানদের কাঁদিয়ে পরপারে পাড়ি জমান। হাজারো মানুষের উপস্থিতিতে বিশাল জানাযার নামাযে ইমামতি করেন তাঁর পীর ও মুরশিদ রাহনুমায়ে তরিকত আল্লামা ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (র.)-এর সুযোগ্য ছাহেবজাদা বাংলাদেশ আনজুমানে আল ইসলাহ’র সভাপতি হযরত মাওলানা হুছামুদ্দীন চৌধুরী ফুলতলী। জানাযা শেষে নিজ বাড়ির পূর্ব পাশে তাঁকে সমাহিত করা হয়। আল্লাহপাক আমাদের প্রিয় উস্তাদ হযরত মাওলানা আব্দুল কাদির ঘোড়াডুম্বুরী (র.)-এর ইলমে কিরাতসহ অন্যান্য খিদমত সমূহকে কবুল করে জান্নাতুল ফিদাউসের সুউচ্চ স্থান অধিষ্ঠিত করুন। আমীন।

About admin

Check Also

ছাতকে মরহুম মাওলানা আবদুল আজিজ স্মৃতি পাঠাগার উদ্বোধন: দোয়া মাহফিল

ছাতকে মরহুম মাওলানা আবদুল আজিজ স্মৃতি পাঠাগার উদ্বোধন: দোয়া মাহফিল ছাতক  প্রতিনিধি : সুনামগঞ্জের ছাতকে …

Leave a Reply

Your email address will not be published.

error: Content is protected !!