১৩ বছর পর নতুন বাঁধন: ইলিয়াস আলী
রহস্যে ট্রাইব্যুনালের গোপন তথ্য
ঢাকা, ১৩ অক্টোবর ২০২৫ – ১৩ বছর পেরিয়ে গেলো, কিন্তু বিএনপি নেতা ও সিলেট-২ আসনের সাবেক এমপি এম. ইলিয়াস আলী এখনও নিখোঁজ। কোথায় আছেন, কি অবস্থায় আছেন — এসব প্রশ্ন সে-সময় থেকেই অপেক্ষার দাবায় রইলো। গত রবিবার, ট্রাইব্যুনালে যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের সময়ে চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম এক দুর্লভ তথ্য ফাঁস করেন — যে ঘটনা গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার নায়ক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে; এবং এ ঘটনার ‘প্রথমহাতে’ জ্ঞান ছিল শেখ হাসিনার।
ঘটনা ও প্রেক্ষাপট ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল, ঢাকার বনানী এলাকায়, এম. ইলিয়াস আলী ও তার গাড়িচালক আনসার আলী এক সাথে নিখোঁজ হয়েছিলেন। গাড়িটি পরে উদ্ধার করা হয় বনানীর কাছাকাছি, তবে মর্মে ওঠে যে পুরো ঘটনাটিই পরিকল্পিত গুম ও নীরবতার মধ্য দিয়েই আড়াল করা হয়েছে।
সেইদিন থেকে ইলিয়াস আলীর পরিবারের মানুষের হাহাকার ও অপেক্ষাটা করতে পারেনি — তার স্ত্রী লুনা (তাহসিনা রুশদির লুনা), মা, সন্তান ও রাজনৈতিক সহযোদ্ধারা প্রত্যেক বছর স্মরণসভা, মানববন্ধন, চিঠি-পত্রসহ নানা দাবি–আন্দোলন করেছেন। তাদের দাবি: শুধু গুম নয়, বিচার, অনুসন্ধান ও সত্য উদঘাটন।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মানবাধিকার সংস্থা ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে “জোরপূর্বক নিখোঁজ” (enforced disappearance) ঘটনা হিসেবে এটি বহুল আলোচনায় এসেছে।
ট্রাইব্যুনালে ফাঁস হওয়া তথ্য: চিফ প্রসিকিউটরের যুক্তি ট্রাইব্যুনালে যুক্তিতর্ক উপস্থাপনকালে, চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম দাবি করেন:
ইলিয়াস আলীকে করেছেন তুলে নেওয়া, এবং যে তথ্য–প্রমাণ আছে, তা থেকে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায় গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যারপরিকল্পনাকারীরা ছিলেন অনেক ওপরে অবস্থানকারী কেউ।
প্রসিকিউটর বলেন, গুমের ঘটনাগুলোর “ফার্স্টহ্যান্ড নলেজ” ছিল শেখ হাসিনার, অর্থাৎ ঘটনাবলীর সঙ্গে সরাসরি জড়িত থাকার উদ্দ্যেশ্য বা জ্ঞান ছিল বলে অভিযোগ তোলেন তিনি।
“ছায়াস্বরে” বন্দিশালা — আয়নাঘর — নির্যাতন বা প্রচণ্ড শারীরিক ও মানসিক নির্মমতা প্রয়োগ করা হতো কি না, তা নির্ধারণ করতে চিঠি বা ফোনের মাধ্যমে নির্দেশ দিতেন, এমন কথাও তিনি উল্লেখ করেন। অর্থাৎ, এটি একবেত্তিক সরকারতান্ত্রিক ব্যবহারের অংশ ছিল।
প্রসিকিউটর আরও যুক্তি দেন, “শেখ হাসিনা চাইলে যা খুশি, সে করতেন” — এমন একটি দানবীয় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু তিনি হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, এবং সেইভাবে প্রতিটি গুমের ঘটনা গ্রাস করেছিল এই দানবীয় শক্তি।
তবে, চিফ প্রসিকিউটর কোনো নাম— যেমন ব্যাক্তি, এজেন্সি বা বাহিনী— প্রকাশ করেননি।
প্রতিক্রিয়া ও রাজনৈতিক বিক্রিয়া বিএনপি ও পরিবার বিএনপি নেতারা নতুন এই তথ্যকে “ট্রাইব্যুনালের মঞ্চে এক বিকল্প সত্য” হিসেবে দেখছেন। সিলেট বিএনপি, স্থানীয় নেতা ও সমর্থকরা ১৩ বছর পর এই বিবৃতি আলোচনায় এনে দাবি করছেন আরও স্বাধীন ও আন্তর্জাতিক মানের তদন্ত কমিশন গঠন করা হোক। ইলিয়াস আলীর স্ত্রী লুনা বারবার বলছেন — “এই সত্য একমাত্র মানুষের সরকারে আসলে দেশের সামনে প্রকাশ পাবে।
গত এপ্রিল ১৭ তারিখকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন কর্মসূচি ও মানববন্ধনও হয় সিলেটে — তারা বলেন, তারা বিশ্বাস করেন ইলিয়াস আলী এখনও বেঁচে আছেন।
সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি সরকার পক্ষের কোনো নির্দিষ্ট প্রতিক্রিয়া এখনো প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি (যেমন: বিষয়টি খোলস ছাড়িয়ে বিশ্লেষণ করা)।
তবে, পূর্বের সময়েও তদন্ত ও আদালতে দৃষ্টান্তমূলকভাবে গুম ও নিখোঁজ ঘটনাগুলোর প্রেক্ষাপটে সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা– সাধারণভাবে।
বাক্যপ্রয়োজন ও জটিলতা তদন্তের তথ্য ও প্রমাণগুলোর সত্যতা বিতর্কিত হতে পারে। আদালতের সামনে ‘যুক্তি’ এবং ‘প্রমাণ’ একে অপরের সঙ্গে বিচার করবে। ১৩ বছরের দীর্ঘ সময় — সাক্ষী স্মৃতিভ্রংশ, প্রমাণ ও দলিল হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা — এমনকি ব্যক্তিগত তথ্য-ক্লিয়ারেন্সের গুণমান— এসব সমস্যা একটি সুবিচার প্রক্রিয়াকে জটিল করে দেয়।
যে কোন অভিযোগের ক্ষেত্রে ‘আদালতের অপরাধপ্রমাণ’ মানদণ্ড ছাড়া রাজনৈতিক বয়ান বা দাবিগুলি প্রমাণ হিসেবে স্বীকৃত হয় না। যদি সরকারের উচিৎ স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত করে—যেমন, একটি আন্তর্জাতিক মানের নিরপেক্ষ কমিশন — তবে অনেক শঙ্কার জবাব মিলতে পারে
১৩ বছর আগের একটি গুম, আজও অজানাসূত্রে। ট্রাইব্যুনালে যে তথ্য ফাঁস হয়েছে—যাতে ইঙ্গিত আছে শীর্ষপর্যায়ের দৃষ্টান্তমূলক রাজনৈতিক অভিযানের—তা এক রূপে আলোচনায় নতুন খোলস ছিঁড়ে দেয়। কিন্তু অভিযোগ ও ‘নলেজ’ দাবি করা এক কথা, প্রমাণ ও বিচার নিয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া আরেক কথা। ইলিয়াস আলীর পরিবার, রাজনৈতিক দল ও জনসাধারণ আজও অপেক্ষমাণ — সত্য উদঘাটন হবে কিনা, বিচার হবে কিনা — সে প্রশ্নের উত্তরে ঝুলে আছে বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভবিষ্যৎ।
Leave a Reply