সুনামগঞ্জ-৫ (ছাতক–দোয়ারাবাজার) আসনে রাজনৈতিক উত্তাপ বিএনপি মনোনীত প্রার্থী কলিম উদ্দিন আহমদ মিলনকে ঘিরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু
নিজস্ব প্রতিবেদক:
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে জমে উঠেছে রাজনৈতিক উত্তাপ। এরই মধ্যে সুনামগঞ্জ-৫ (ছাতক–দোয়ারাবাজার) আসনটি আলোচনার শীর্ষে উঠে এসেছে। এই আসনে বিএনপির মনোনীত ধানের শীষের প্রার্থী, কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ও সুনামগঞ্জ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক, সাবেক সংসদ সদস্য জনাব কলিম উদ্দিন আহমদ মিলনকে ঘিরে চলছে ব্যাপক আলোচনার ঝড়—সমর্থন, প্রত্যাশা, বিরোধিতা ও বিতর্ক মিলিয়ে নির্বাচনী অঙ্গন টইটুম্বুর।
আলোচনার কেন্দ্রে মিলন: সমর্থন ও বিতর্কে উত্তপ্ত মাঠ সম্প্রতি ঢাকা-ভিত্তিক এক সাংবাদিকের প্রতিবেদনকে কেন্দ্র করে দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। বিএনপি সমর্থকদের অভিযোগ—প্রতিবেদনে ‘ভিত্তিহীন ও সাজানো’ তথ্য প্রচার করে মিলনের জনপ্রিয়তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করা হয়েছে। তারা এটিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেন। অন্যদিকে সাংবাদিকতারনীতিমালায় এমন অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ওপরই বর্তায়। ফলে বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও স্থানীয় রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে নতুন মাত্রার আলোচনা সৃষ্টি করেছে।
স্থানীয় বিএনপি নেতারা বলছেন, “মিলন ভাই শুধুই রাজনৈতিক ব্যক্তি নন, তিনি ছাতক–দোয়ারাবাজারবাসীর আবেগ, প্রত্যাশা ও বিশ্বাসের প্রতীক। তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার জনগণ গ্রহণ করবে না। তবে অন্য রাজনৈতিক দলের নেতারা মনে করেন—নেতার জনপ্রিয়তা বিচার করতে হলে আবেগ নয়, বাস্তব উন্নয়নচিত্র ও নীতি-আদর্শ বিবেচনায় আনতে হবে।
২০০১–২০০৬: উন্নয়নের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন—দাবি স্থানীয়দের বিএনপি সমর্থকদের মতে, ২০০১ সালে সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর ছাতক ও দোয়ারাবাজারে অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও যোগাযোগ খাতে উল্লেখযোগ্য উন্নয়নের সূচনা করেন মিলন। তারা দাবি করেন—সড়ক নির্মাণ, কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান উন্নীতকরণ, স্বাস্থ্যসেবায় প্রকল্প গ্রহণ ও যোগাযোগব্যবস্থা সম্প্রসারণের মতো কর্মকাণ্ড তখনই এলাকাবাসীর প্রত্যাশা পূরণে ভূমিকা রাখে।
তাদের বক্তব্য, বর্তমান সরকার গত ১৬ বছরে নানা প্রকল্প গ্রহণ করলেও, মিলন ভাইয়ের আমলে যে উন্নয়ন শুরু হয়েছিল, তার ধারাবাহিকতা পুরোপুরি রক্ষা হয়নি। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ নেতাদের বক্তব্য তার সম্পূর্ণ বিপরীত। তারা দাবি করেন—টেকসই উন্নয়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে ছাতক–দোয়ারাবাজারে প্রকৃত পরিবর্তন এসেছেআওয়ামী লীগ সরকারের সময়েই। এই প্রসঙ্গে দুই পক্ষের যুক্তি-প্রতিযুক্তির মধ্যে রয়েছে সুস্পষ্ট ব্যবধান।
২০০৮ সালের নির্বাচন: প্রতিকূলতার মাঝেও ভোটের রেকর্ড—দাবি সমর্থকদের মিলন সমর্থকদের দাবি—২০০৮ সালের নির্বাচন ছিল বিএনপির জন্য কঠিন সময়। প্রশাসনিক চাপ, রাজনৈতিক প্রতিকূলতা, মামলা-হামলা—সব মিলিয়ে দল তখন বিপর্যস্ত। তবুও সেই নির্বাচনে মিলন প্রায় এক লক্ষ ভোট পাওয়ায় তারা এটিকে “জনগণের ভালোবাসা ও উন্নয়নের স্বীকৃতি” হিসেবে দেখেন।
সমর্থকদের ভাষ্যে, লোকজন তখন ভয়–ভীতির পরিবেশেও মিলন ভাইয়ের প্রতি আস্থা হারায়নি। ভালোবাসা দিয়ে তাকে সম্মানিত করেছে।”
যদিও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন—২০০৮ সালের ভোট ছিল জাতীয় প্রেক্ষাপটে ঢেউ তোলা এক নির্বাচন; স্থানীয় ভোটেও জাতীয় আবহ বড় ভূমিকা রেখেছিল। ফলে সে ভোটের বিশ্লেষণে স্থানীয় উন্নয়ন, জাতীয় রাজনীতি ও সাংগঠনিক শক্তি—সবকিছুই বিবেচনায় রাখা জরুরি।
আগামী নির্বাচনে ‘লক্ষাধিক ভোটে বিজয়’—সমর্থকদের আত্মবিশ্বাস। আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপি অঙ্গ সংগঠন ও দলীয় ইউনিটগুলো মাঠে ব্যাপক সক্রিয়তা দেখাচ্ছে। প্রচারণা, গণসংযোগ, উঠান বৈঠক, মিছিল—সব কার্যক্রমেই তরুণদের অংশগ্রহণ চোখে পড়ার মতো।
সমর্থকদের দাবি,মাঠের চিত্র পরিষ্কার—মিলন ভাই এবার লক্ষাধিক ভোটে জয় পাবেন। যে কোনো চক্রান্ত বা প্রতিবন্ধকতা থাকলেও উন্নয়ন, নেতৃত্ব আর মানুষের ভালোবাসা তার পক্ষে। তবে প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক শিবির এ ধরনের দাবি মানতে নারাজ। তাদের মতে—সুনামগঞ্জ-৫ বরাবরই প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসন, যেখানে নিশ্চিত জয়ের কোনও নিশ্চয়তা নেই। জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব বা অতীত ইতিহাস নয়—এবারের ভোট নির্ভর করবে প্রদান করবে উন্নয়নচিত্র, সংগঠনের শক্তি ও কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর। প্রচারণার উত্তাপ: গ্রাম–হাট–বাজারে সরব কর্মী–সমর্থক
নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে ছাতক ও দোয়ারাবাজারের ইউনিয়ন, গ্রামাঞ্চল, হাট–বাজার থেকে শুরু করে বিভিন্ন জনপদে চলছে নির্বাচনী প্রচার। বিএনপির মিছিলে তরুণদের উপস্থিতি বাড়ছে; অন্যদিকে আওয়ামী লীগও সমানতালে দোড়ঝাঁপ করছে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে।
বিএনপির সভা–মিছিল–পথসভায় হাজারো মানুষের অংশগ্রহণ দেখা যাচ্ছে। অন্যদিকে নৌকার প্রার্থীকেও কেন্দ্র করে অনুষ্ঠিত হচ্ছে সভা–সমাবেশ, উন্নয়ন চিত্র তুলে ধরা প্রচারণা। ফলে নির্বাচনী মাঠ দিনদিন আরও উত্তপ্ত হচ্ছে।
তরুণ প্রজন্মের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া মিলনকে ঘিরে তরুণদের মধ্যে দুই ধরনের আলোচনা লক্ষণীয়। কেউ বলছেন—“মিলন ভাই উন্নয়ন করেছেন, তিনি মাঠের মানুষ, সহজে পাওয়া যায়।”
কেউ বলছেন—“তিনি দীর্ঘদিন দলের নির্যাতিত নেতা হিসেবে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছেন। আবার কেউ কেউ সতর্ক করছেন ভোটের আগে প্রকৃত উন্নয়ন, নেতৃত্বের সক্ষমতা ও বাস্তব পরিকল্পনা যাচাই করা জরুরি। এটি প্রমাণ করে—তরুণদের সচেতনতা ও প্রত্যাশা এখন বেশ উচ্চমাত্রায়।
সমর্থকদের চোখে ‘গণমানুষের নেতা’বিএনপি সমর্থক ও স্থানীয় অনেক নেতাকর্মীর ভাষ্য—কলিম উদ্দিন আহমদ মিলন শুধু রাজনীতিক নন; তিনি দলের আন্দোলন–সংগ্রামে অগ্নিমশাল হিসেবে পরিচিত। তার বিরুদ্ধে মামলা–হামলা ও রাজনৈতিক বাধা–বিপত্তির অভিজ্ঞতা থাকায় তাকে ‘সংগ্রামী নেতা’ হিসেবেই দেখছেন অনেকে।
তাদের মতে,তিনি মানুষের দুঃখ–কষ্ট বোঝেন, প্রান্তিক মানুষের পাশে দাঁড়ান বলেই বারবার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের টার্গেটে পরিণত হয়েছেন।
ভোটারদের চাওয়া: উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, অবকাঠামোর আধুনিকায়ন,নির্বাচনী মাঠ ঘুরে দেখা গেছে—মানুষের প্রধান চাওয়া পাঁচটি খাতে:
টেকসই অবকাঠামো উন্নয়ন,যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন,বেকারত্ব ও কর্মসংস্থানের সমাধান
স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন শিক্ষাখাতে যুগোপযোগী বিনিয়োগ,মিলন সমর্থকরা মনে করেন—এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় মিলনই সক্ষম নেতৃত্ব দিতে পারবেন। অপরদিকে প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক নেতারা বলছেন—গত এক দশকের বেশি সময় ধরে সরকারের গ্রহণ করা প্রকল্পগুলোর ধারাবাহিকতা বজায় রাখাই এখন মূল লক্ষ্য।
প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসন, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
সুনামগঞ্জ-৫ আসনটি বিগত কয়েকটি জাতীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হিসেবে পরিচিত। ভোটের মাঠে দলীয় শক্তি, ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা এবং উন্নয়নচিত্র—সবকিছুরই প্রভাব থাকে।
এই আসনে মিলন যতটা সমর্থনের কেন্দ্র, ততটাই রাজনৈতিক বিতর্কেরও অংশ। সমর্থকরা তাকে জয়ী দেখছেন নিশ্চিতভাবেই; বিরোধীরা বলছেন—পরিস্থিতি আরও জটিল।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—এই আসনের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে এখন মিলন, এবং তাকে ঘিরেই নির্বাচনী উত্তাপ তুঙ্গে। আগামী নির্বাচনের ফল কী হবে—তা সময়ই বলে দেবে। কিন্তু ছাতক–দোয়ারাবাজারবাসী ইতোমধ্যে দেখিয়ে দিয়েছেন—
তারা তাদের নেতাকে ভালোবাসতে জানেন, আবার প্রয়োজন হলে পরিবর্তনের পক্ষে সিদ্ধান্ত দিতেও জানেন। এই আসনের নির্বাচন শুধু দুই প্রার্থীর লড়াই নয়—এটি উন্নয়ন, জনপ্রিয়তা, নেতৃত্ব ও রাজনীতির ভবিষ্যৎ পথচলারও পরীক্ষা।
Leave a Reply