লাফার্জ-হোলসিম কারখানায় শ্রমিক
অসন্তোষ: শোকজ বিতর্কে উত্তাল পরিবেশ
ছাতক প্রতিনিধি
লাফার্জ-হোলসিম সিমেন্ট কারখানায় সম্প্রতি ঘটে যাওয়া একটি ঘটনার পর শ্রমিক মহলে ব্যাপক অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, কারখানায় জামায়াত-বিএনপি সমর্থিত শ্রমিকদের শোকজ নোটিশ দেওয়া হয়েছে পরিকল্পিতভাবে, যার মাধ্যমে তাদের হয়রানি করা হচ্ছে। এ ঘটনায় শ্রমিক ইউনিয়নের ভেতরে ভাঙন, দ্বন্দ্ব এবং অসন্তোষ আরও প্রকট হয়ে উঠেছে।
শ্রমিক মহলের দাবি, কারখানায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠন শ্রমিকলীগের প্রভাবশালী নেতারা প্রাধান্য বিস্তার করছে। শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি আনোয়ার মাহমুদ এবং সাধারণ সম্পাদক মো. জহির উদ্দিন আহমেদ দীর্ঘদিন ধরে এই কারখানায় আওয়ামী লীগ ঘরানার শ্রমিকদের আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। অভিযোগ রয়েছে, তারা শ্রমিক লীগের প্রভাবশালী সাবেক নেতা ও আওয়ামী লীগ আমলের সাবেক শ্রম প্রতিমন্ত্রী মন্নুজান সুফিয়ানের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত।
কারখানার শ্রমিকদের দাবি, সম্প্রতি শ্রমিকলীগ-সমর্থিত একটি চক্র লাফার্জ-হোলসিম কারখানায় নতুনভাবে সংগঠন সাজানোর উদ্যোগ নিয়েছে। এর নেতৃত্বে রয়েছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও শ্রমিক লীগের কর্মীরা—সাফাতুর চৌধুরী, হাবিব মিয়া, মমতাজ ও সাখাওয়াত খানসহ অনেকে। তাদের অভিযোগ, মূলত আওয়ামী লীগপন্থী এই কমিটি গঠনের মাধ্যমে কারখানায় বিরোধী রাজনৈতিক মতাদর্শী শ্রমিকদের দমন করা হচ্ছে।
সাধারণ সভা নিয়ে উত্তেজনা ৩১ জুলাই ২০২৫ তারিখে জাতীয় শ্রমিক লীগের প্যাড ব্যবহার করে কারখানায় একটি সাধারণ সভার আয়োজন করা হয়। তবে এ সভা করতে বাঁধা দেন শ্রমিক ইউনিয়নের একাংশ। অভিযোগ রয়েছে, ওই সভায় শ্রমিক লীগের ক্যাডার বাহিনী সক্রিয় ভূমিকা পালন করে এবং ভিন্নমত পোষণকারীদের ভয়ভীতি দেখায়। এ ঘটনার পরপরই ইউনিয়নের সাতজন প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্যকে শোকজ নোটিশ দেওয়া হয়।
শোকজ পাওয়া শ্রমিকদের অভিযোগ, এটি ছিল একটি পরিকল্পিত পদক্ষেপ, যাতে জামায়াত-বিএনপি সমর্থিত বলে চিহ্নিত শ্রমিকদের বাইরে রাখা যায় এবং শ্রমিক ইউনিয়নকে পুরোপুরি আওয়ামী লীগ নিয়ন্ত্রণে আনা যায়।
প্রশাসনের নীরব ভূমিকা অভিযোগ উঠেছে, প্রশাসন এবং কারখানার কর্তৃপক্ষ বিষয়টি জেনেও কোনো আইনি পদক্ষেপ নেয়নি। বরং এ ঘটনায় তারা নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে। ফলে শ্রমিকদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে এবং পরিবেশ উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। শ্রমিকরা মনে করছেন, প্রশাসনের নীরবতা আসলে রাজনৈতিক চাপের ফল।
একজন শ্রমিক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা কারখানায় কাজ করি আমাদের পেটের দায়ে। এখানে রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় থাকতে চাই না। অথচ এখন কারখানায় শুধু রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের লড়াই চলছে।”
শ্রমিকদের ক্ষোভ ও আশঙ্কা কারখানার অনেক শ্রমিক আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, এ ধরনের পরিস্থিতি চলতে থাকলে উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে। শ্রমিকরা একদিকে শোকজ আতঙ্কে ভুগছেন, অন্যদিকে রাজনৈতিক দমন-পীড়নের শিকার হচ্ছেন। এর ফলে তাদের মধ্যে অস্থিরতা ও হতাশা বাড়ছে। শ্রমিক ইউনিয়নের প্রভাবশালী এক নেতা বলেন, “শ্রমিকদের মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টি করে কারখানার পরিবেশকে অস্থিতিশীল করা হচ্ছে। এর ফল ভুগতে হবে কারখানার উৎপাদন এবং স্থানীয় শ্রমজীবী মানুষকে।”
স্থানীয় জনমত এ ঘটনার পর স্থানীয় এলাকাবাসীও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, লাফার্জ-হোলসিম কারখানা শুধু একটি শিল্প প্রতিষ্ঠান নয়, বরং এটি হাজারো শ্রমিকের জীবিকার কেন্দ্র। সেখানে যদি রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার ও হয়রানি চলতে থাকে, তবে শ্রমিকদের জীবন-জীবিকা হুমকির মুখে পড়বে।
একজন স্থানীয় ব্যবসায়ী জানান, “কারখানার শ্রমিকরা শান্তিপূর্ণভাবে কাজ করলে পুরো অঞ্চলের অর্থনীতি সচল থাকে। কিন্তু বারবার রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে শ্রমিকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, যা আমাদের স্থানীয় ব্যবসাকেও প্রভাবিত করছে।”
প্রশাসন ও কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
শ্রমিকদের অভিযোগ, লাফার্জ-হোলসিম কর্তৃপক্ষ যদি শুরুতেই নিরপেক্ষ অবস্থান নিত এবং শ্রমিক ইউনিয়নের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে রাজনৈতিক প্রভাব খাটতে না দিত, তবে এ পরিস্থিতি তৈরি হতো না। কিন্তু প্রশাসন ও কর্তৃপক্ষের নীরব ভূমিকা শ্রমিক অসন্তোষকে আরও তীব্র করেছে। লাফার্জ-হোলসিম কারখানার শ্রমিক অসন্তোষ এখনো থামেনি। শোকজ বিতর্ককে ঘিরে তৈরি হওয়া সংকট কারখানার সামগ্রিক উৎপাদন ও শ্রমিক পরিবেশকে প্রভাবিত করছে। জামায়াত-বিএনপি সমর্থিত শ্রমিকদের শোকজের মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ সামনে আসায় শ্রমিক মহলে আতঙ্ক বিরাজ করছে। শ্রমিকরা চান, তাদের কাজের জায়গা যেন রাজনীতির বলি না হয়। প্রশাসন ও কর্তৃপক্ষের উচিত দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে শ্রমিক ইউনিয়নকে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে পরিচালনার ব্যবস্থা করা। অন্যথায় এই অসন্তোষ আরও বিস্তার লাভ করবে, যার প্রভাব পড়বে কারখানার উৎপাদন, শ্রমিক জীবিকা এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে। এভাবে লাফার্জ-হোলসিম কারখানার অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এখন জাতীয় মনোযোগ কাড়ছে। শ্রমিকদের দাবি একটাই—“আমাদের কাজ করতে দিন, রাজনীতি নয়।”
Leave a Reply