বিচারপতি উর্মি রহমান :
এক উজ্জ্বল আলোকশিখা
আনোয়ার হোসেন রনি,
বাংলাদেশের বিচারাঙ্গনে যুক্ত হলো এক নতুন উজ্জ্বল নাম। সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন ব্যারিস্টার উর্মি রহমান। বড়লেখা উপজেলার মানুষের জন্য এটি নিঃসন্দেহে এক গর্বের সংবাদ। তাঁর এই অর্জন কেবল ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বরং পুরো অঞ্চল ও দেশের জন্য সম্মানের প্রতীক।
পারিবারিক ও ব্যক্তিগত পরিচয়
উর্মি রহমান জন্মেছেন এক প্রগতিশীল, শিক্ষামূলক ও মানবিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ পরিবারে। তাঁর পিতা মশিউর রহমান জীবন বীমা কর্পোরেশনের অবসরপ্রাপ্ত ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার এবং মাতা আরজুমান্দ বেগম বাংলাদেশ ব্যাংকের অবসরপ্রাপ্ত যুগ্ম পরিচালক। চার ভাইবোনের মধ্যে তিনি সর্বকনিষ্ঠ। বড় বোন প্রাথমিক শিক্ষায় প্রতিষ্ঠান প্রধান, বড় ভাই ইস্টার্ন ব্যাংকের সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট, দ্বিতীয় বোন চিকিৎসক। এই স্নেহময়, শিক্ষাবান্ধব পরিবেশেই গড়ে ওঠেন উর্মি রহমান।
পরবর্তীতে তিনি বিবাহসূত্রে যুক্ত হন আরেক ইতিহাসগর্বিত পরিবারে। তাঁর শ্বশুর ছিলেন অ্যাডভোকেট তবারক হোসেইন—বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাংবাদিক, গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অগ্রপথিক এবং শিক্ষা-সংস্কৃতির অগ্রযাত্রী। শাশুড়ি শামসুন্নাহার বেগমও ছিলেন সামাজিক নেতৃত্বের বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর। তাঁদের উদ্যোগে শাহবাজপুর হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজে প্রতিষ্ঠিত হয় আধুনিক তবারক হোসেইন-শামসুন্নাহার গ্রন্থাগার।
উর্মি রহমানের স্বামী ব্যারিস্টার তানিম হোসেইন শাওন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী। তাঁদের দুই কন্যা শামা ঊষসী হোসেইন ও শ্রেয়া উর্বশী হোসেইন যথাক্রমে হলিক্রস কলেজ ও উদয়ন বিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত।
শিক্ষা ও পেশাগত জীবন ভিকারুন্নেসা নুন স্কুল থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন উর্মি রহমান। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। ২০০৩ সালে তিনি বাংলাদেশ বার কাউন্সিলে তালিকাভুক্ত হন।
পরে স্বামীর সঙ্গে লন্ডনে গিয়ে ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন থেকে আইন বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি ও ২০০৮ সালে বার-এট-ল সম্পন্ন করেন। দেশে ফিরে যোগ দেন সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে। শ্বশুরের প্রতিষ্ঠিত হোসেইন ল’ হাউসে যুক্ত হয়ে দ্রুতই তিনি আইনজীবী হিসেবে সুনাম অর্জন করেন।
সংস্কৃতিমনা ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি পেশাগত জীবনের বাইরেও উর্মি রহমান সংস্কৃতিমনস্ক এক ব্যক্তিত্ব। রবীন্দ্রসংগীত ও নজরুলসংগীত তাঁর জীবনে নৈতিক শক্তি ও অনুপ্রেরণার উৎস। তাঁর দুই কন্যাও নিয়মিত সংগীতচর্চার সঙ্গে যুক্ত। পরিবারের এই সাংস্কৃতিক পরিবেশ সমাজের জন্য এক ইতিবাচক দৃষ্টান্ত।
সামাজিক দায়বদ্ধতা ও বিচারকের দায়িত্ব
বিচারপতি উর্মি রহমান বিশ্বাস করেন—ন্যায়বিচার কেবল আইনের বইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি হতে হবে মানুষের জীবনে সমতা, আস্থা ও আশ্বাসের আলোকবর্তিকা। বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশে নারী, শিশু, শ্রমিক কিংবা পরিবেশ সুরক্ষায় একজন দায়িত্বশীল বিচারপতির রায় ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পথনির্দেশ হয়ে থাকে।
তাঁর শিক্ষাগত সাফল্য, প্রগতিশীল পারিবারিক ঐতিহ্য, সংস্কৃতিমনা মনন ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের আস্থা দেয় যে তিনি সততা, প্রজ্ঞা ও ন্যায়পরায়ণতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করবেন।
অতঃপর বড়লেখা উপজেলায় এ পর্যন্ত মাত্র তিনজন বিচারপতি নিয়োগ পেয়েছেন—বিচারপতি সিকন্দর আলী, বিচারপতি বদরুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি উর্মি রহমান। প্রথম দুজন বিচার বিভাগ থেকে, আর উর্মি রহমান বার থেকে উঠে এসেছেন। ফলে শ্রীধরপুর ও নান্দুয়া—এই দুই গ্রাম আজ গর্বিত হয়ে উঠেছে ‘টুইন গ্রাম’ হিসেবে।
বিচারপতি উর্মি রহমানের নিয়োগ আমাদের প্রত্যাশা জাগায় যে তিনি হয়ে উঠবেন আমাদের সময়ের “ড্যানিয়েল”—ন্যায়পরায়ণতা ও প্রজ্ঞার প্রতীক। তাঁকে আবারও জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।
Leave a Reply