প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি কামনা
সুনামগঞ্জবাসীর গভীর হতাশা: প্রবীণ নেতা কলিম উদ্দিন আহমদ মিলনকে মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্তির জোরালো দাবি
আনোয়ার হোসেন রনি, সুনামগঞ্জ
বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব সীমান্তঘেঁষা সুনামগঞ্জ—মেঘালয়ের পাহাড়ি ছায়ায় ঢাকা, হাওর–বেষ্টিত প্রকৃতি ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবহ এই জনপদ আজ রাজনৈতিক উপেক্ষার বেদনাবিধুর গল্প শুনাচ্ছে। ইতিহাস, জনমিতি, প্রাকৃতিক সম্পদ, রাজনৈতিক অবদান—সব দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ একটি জেলা হয়েও নতুন মন্ত্রিসভায় সুনামগঞ্জের কোনো প্রতিনিধিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এতে জেলাজুড়ে হতাশা বিরাজ করছে, বিশেষ করে তিনবার নির্বাচিত জনপ্রিয় সংসদ সদস্য কলিম উদ্দিন আহমদ মিলনকে মন্ত্রিসভায় ঠাঁই না দেওয়ায় ক্ষোভ আরও তীব্র হয়েছে।
ভৌগোলিক–ইতিহাস–উন্নয়ন: কেন সুনামগঞ্জ বিশেষ গুরুত্বের দাবিদার উত্তরে ভারতের মেঘালয়, পূর্বে সিলেট, দক্ষিণে হবিগঞ্জ, পশ্চিমে নেত্রকোণা ও কিশোরগঞ্জ—এই পাঁচদিকের মিলনবিন্দু সুনামগঞ্জ। পাহাড়ি ছড়া, হাওর, টিলা, নদী ও মাটির বৈচিত্র্য এই জেলার আর্থ–সামাজিক চরিত্রকে দিয়েছে একটি স্বতন্ত্র পরিচয়।
কেবল ভৌগোলিক গুরুত্বই নয়—ঐতিহাসিকভাবে সুনামগঞ্জ মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সাহসী অধ্যায়ের ধারক। হাওরের বুক চিরে চলা মুক্তিযোদ্ধাদের গেরিলা অভিযান, পাকহানাদারদের নির্মম হত্যাকাণ্ড, গ্রাম–শহরের প্রতিরোধ—সবকিছু মিলিয়ে সুনামগঞ্জকে জাতীয় স্বীকৃতির তালিকায় একটি বিশেষ স্থান দখল করে রাখা উচিত ছিল।
কিন্তু রাজনৈতিক ক্ষমতা বণ্টনের হিসাব, উন্নয়ন পরিকল্পনার অগ্রাধিকার কিংবা মন্ত্রিসভার আসন বণ্টন—এসব ক্ষেত্রে সুনামগঞ্জ যেন বারবার উপেক্ষার শিকার হয়। সর্বশেষ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর গঠিত নতুন মন্ত্রিসভাও এর ব্যতিক্রম হলো না।।জনমিতির বিশ্লেষণ: উন্নয়ন পরিকল্পনার জন্য শক্তিশালী যুক্তি ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী সুনামগঞ্জের মোট জনসংখ্যা ২৬ লাখ ৯৫ হাজার ৪৯৬ জন। এর মধ্যে—পুরুষ: ১৩,২৩,৫৯০
নারী: ১৩,৭১,৫১৭ মোট পরিবার: ৫ লাখ ২৮ হাজার ৫৫৩
নারী–পুরুষ অনুপাত ১০১:১০০—একটি ভারসাম্যপূর্ণ সামাজিক কাঠামোর নিদর্শন।
কিন্তু উদ্বেগজনক তথ্য হলো—১৫–২৪ বছর বয়সী তরুণদের ৪০.৯১% কোনো শিক্ষা–চাকরি–প্রশিক্ষণের বাইরে।
নারী: ৫৭.৯০% পুরুষ: ২১.৯৩% ডিজিটাল প্রবেশাধিকারেও বৈষম্য স্পষ্ট—মোবাইল ব্যবহারকারী: ৫৭.০৩% ইন্টারনেট ব্যবহারকারী মাত্র: ২৬.৯৪% আর্থিক প্রতিষ্ঠানে অ্যাকাউন্টধারী মাত্র: ১২.৫৮% যেকোনো জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনায় এই জনমিতিক বাস্তবতা সুনামগঞ্জকে “বিশেষ গুরুত্বের জনপদ” বানায়। বিশেষত কর্মসংস্থান, শিক্ষা, ডিজিটালাইজেশন ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে কেন্দ্রীয় সহায়তা ছাড়া এ জেলাকে এগিয়ে নেওয়া কঠিন। তাই স্থানীয় মানুষজন মনে করেন—মন্ত্রিসভায় জেলার একজন প্রতিনিয়ুক্ত মন্ত্রী থাকা ছিল অত্যন্ত যৌক্তিক।
মুক্তিযুদ্ধের বেদনাবিধুর ইতিহাস—বিশেষ সম্মানের দাবি
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে সুনামগঞ্জের অবদান অনস্বীকার্য। এখানে রয়েছে বেদনাবিধুর স্মৃতি, শোকের ইতিহাস, এবং সাহসের অগ্নিপরীক্ষা।
কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা:ছাতকে ১৩ মুক্তিযোদ্ধার শাহাদাত
জামালগঞ্জে শহীদ সিরাজুল ইসলাম—যাঁর স্মৃতিতে আজকের শহীদ সিরাজ লেক তেলিয়া গ্রামে ৮ গ্রামবাসীর হত্যা
দিরাইয়ে ৩ মুক্তিযোদ্ধা শহীদ শ্রীরামসীর ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড—১২৬ বেসামরিক মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা রাণীগঞ্জে ৩০ জনকে হত্যা, ১৫০ দোকান পুড়িয়ে দেওয়া মঙ্গলকাটার কৃষ্ণনগরে ৪৮ মুক্তিযোদ্ধার শহীদ হওয়া এই সব মিলিয়ে সুনামগঞ্জ বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে এক “বীর জেলা”—যা বিশেষ মর্যাদার দাবিদার। স্থানীয়দের ভাষায়—
“যে জেলা মুক্তিযুদ্ধে এত রক্ত দিয়েছে, সেই জেলাকে রাজনৈতিকভাবে পিছনের সারিতে রাখা অবিচার ছাড়া আর কিছু নয়।”
নির্বাচনের ফলাফল বলছে—মিলন জনপ্রিয়তার প্রতীক
সুনামগঞ্জ-৫ (ছাতক–দোয়ারাবাজার) আসনে ভোট পড়েছে মোট ২,৫২,৯২৫। এর মধ্যে—কলিম উদ্দিন আহমদ মিলন (ধানের শীষ): ১,৫২,৯১৫ ভোট আবু তাহির (দাঁড়িপাল্লা): ১,০২,১২১ ভোট বিজয়ের ব্যবধান: ৫৩,০৬৯ ভোট
এই ব্যবধান শুধু জেলা নয়, জাতীয় ফলাফলেও অন্যতম বড় ব্যবধান। পোস্টাল ভোটে প্রতিপক্ষ এগিয়ে থাকলেও সাধারণ ভোটের গণজোয়ার মিলনের জনপ্রিয়তাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছে।
একজন স্থানীয় ব্যবসায়ীর ভাষায়—“মিলন সাহেব শুধু নেতা নন, তিনি ছাতক–দোয়ারার মানুষের আশার প্রতীক। তাঁর নাম বাদ পড়ে যাওয়ায় আমরা সত্যিই ব্যথিত।”
সুনামগঞ্জে সর্বত্রই ক্ষোভ—জনগণের প্রশ্ন: ‘আমাদের অবদান কি মূল্যহীন?’নতুন মন্ত্রিসভায় সুনামগঞ্জের কোনো প্রতিনিধি নেই—এই খবর ছড়িয়ে পড়তেই পুরো জেলায় হতাশার ঢেউ ওঠে। ছোট দোকান থেকে চা–স্টল, ব্যবসায়ী মহল থেকে শিক্ষিত তরুণ—সব জায়গায় একই প্রশ্ন—আমরা পাঁচ আসনই একদলকে উপহার দিলাম, তারপরও আমাদের যোগ্য নেতার সম্মান কেন রইল না?”স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের বক্তব্য:সুনামগঞ্জের মতো বড় জনপদে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।মিলনের মতো অভিজ্ঞ ও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির নেতা মন্ত্রিসভায় থাকলে জেলার উন্নয়ন এগিয়ে যেত। তরুণদের শিক্ষাবঞ্চনা ও প্রযুক্তিগত পিছিয়ে পড়া কাটিয়ে উঠতে কেন্দ্রীয় বরাদ্দ ও নেতৃত্ব অপরিহার্য।
কলিম উদ্দিন আহমদ মিলন—অভিজ্ঞতা, গ্রহণযোগ্যতা ও সততার প্রতীক
চারবারের সাবেক সংসদ সদস্য মিলন দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে সুনামগঞ্জ–৫ আসনের মানুষের আস্থা অর্জন করেছেন। তাঁর নেতৃত্বের মূল বৈশিষ্ট্য—
সততা পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা
সর্বস্তরের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা দলীয় কর্মী থেকে সাধারণ মানুষের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক এই গুণাবলিই তাঁকে সুনামগঞ্জের রাজনীতিতে “অভিজ্ঞতার স্তম্ভ” হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
একজন প্রবীণ শিক্ষকের মন্তব্য—মিলন সাহেবকে বাদ দিলে সেটা কেবল তাঁর প্রতি নয়, সুনামগঞ্জের প্রতি অবিচার।”
কেন এই দাবি জোরালো?—রাজনীতি, উন্নয়ন ও ইতিহাসের যৌথ যুক্তি
রাজনৈতিক অবদান:সুনামগঞ্জের পাঁচটি আসনই বিজয়ী। এ জেলাকে মন্ত্রিসভায় উপেক্ষা করা কার্যত রাজনৈতিক অস্বীকৃতি।অর্থনীতি–উন্নয়ন:কর্মসংস্থানের ঘাটতি, শিক্ষাবঞ্চনা, ডিজিটাল পিছিয়ে পড়া—এই তিন বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব প্রয়োজন। মুক্তিযুদ্ধ:
শহীদদের আত্মত্যাগ এই জেলাকে জাতীয় মর্যাদায় অনন্য করেছে। গণআকাঙ্ক্ষা:মিলনকে ঘিরে জেলার মানুষের প্রত্যাশা প্রবল। নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা সরকারের ওপরও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারত। জনগণের কণ্ঠ—‘আমরা কাউকে বাদ দিতে চাই না, শুধু আমাদের প্রাপ্যটি চাই’ সুনামগঞ্জজুড়ে আজ যে বক্তব্য সর্বত্র শোনা যায় তা হলো—
“আমরা কারও বিরুদ্ধে কথা বলছি না। আমরা শুধু চাই—সুনামগঞ্জের ন্যায্য মর্যাদা নিশ্চিত হোক।”
একজন কৃষকের অনুভূতি—আমাদের জেলার মানুষ রক্ত দিয়েছে, ভোট দিয়েছে, বিশ্বাস দিয়েছে। কিন্তু আমাদের প্রাপ্য সম্মান মিলছে না কেন?”প্রধানমন্ত্রীর বিবেচনার জন্য জেলাবাসীর আবেদন সব বিশ্লেষণ, তথ্য, ইতিহাস ও রাজনৈতিক বাস্তবতা মিলিয়ে সুনামগঞ্জবাসীর দাবি—
প্রবীণ নেতা কলিম উদ্দিন আহমদ মিলনকে মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করে জেলা–জনগণের মনোবেদনা লাঘব করা হোক।
সুনামগঞ্জের মানুষ মনে করেন—
এটি শুধু একজন ব্যক্তির প্রশ্ন নয়, এটি জেলার আত্মমর্যাদা, ত্যাগ ও অবদানের স্বীকৃতির প্রশ্ন।
সমাপনী কথা: সুনামগঞ্জের ন্যায্য প্রত্যাশার প্রতি শ্রদ্ধা দিন
সুনামগঞ্জ কোনো প্রান্তিক জনপদ নয়— এটি মুক্তিযুদ্ধের ত্যাগ, হাওরের সোনালি ধান, প্রাকৃতিক সম্পদ, রাজনৈতিক ইতিহাস ও প্রায় ২৭ লক্ষ মানুষের স্বপ্নে গড়া এক সম্ভাবনাময় ভূমি জেলা–বাসীর আকুতিতে একটি সাধারণ বাক্যই সবচেয়ে বেশি প্রতিধ্বনিত হচ্ছে—“মিলন শুধু একজন রাজনীতিবিদ নন—তিনি সুনামগঞ্জের মর্যাদা ও অভিজ্ঞতার প্রতীক।”
প্রধানমন্ত্রীর সদয় বিবেচনায় সুনামগঞ্জ যেন তার প্রাপ্য মর্যাদা ফিরে পায়—এই প্রত্যাশাই আজ জেলার প্রতিটি মানুষের কণ্ঠে কণ্ঠে।
Leave a Reply