প্রতিহিংসার ঊর্ধ্বে এক রাষ্ট্রনায়িকা: ড. ওয়াজেদ মিয়াকে নিয়ে খালেদা জিয়ার মানবিক দৃষ্টান্ত
বিশেষ প্রতিবেদন
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে প্রতিহিংসা ও বিরোধিতার রাজনীতি বহুবার আলোচনায় এসেছে। কিন্তু এর মধ্যেও কিছু ঘটনা ইতিহাসে দৃষ্টান্ত হয়ে থাকে—যেখানে মানবিকতা ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধ জয়ী হয়েছে রাজনীতির ঊর্ধ্বে।
তেমনই এক বিরল ঘটনার নায়িকা ছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। সময়টা ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬—বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ক্ষমতায়। সেই সময়ে দেশের পরমাণু শক্তি কমিশনের চেয়ারম্যান ছিলেন ড. এম. এ. ওয়াজেদ মিয়া, যিনি আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার স্বামী হিসেবেও পরিচিত। একদিন পরমাণু শক্তি কমিশন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের এক সচিব একটি ফাইল নিয়ে হাজির হন দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী রফিকুল ইসলাম মিয়ার দপ্তরে।
ফাইলটি ছিল ড. ওয়াজেদ মিয়াকে চাকরিচ্যুত করার প্রস্তাব সংক্রান্ত। মন্ত্রী বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করেন, “চাকরিচ্যুত করার প্রস্তাব কেন?”সচিব নানা যুক্তি, প্রশাসনিক কারণ ও ব্যাখ্যা তুলে ধরেন। কিন্তু রফিকুল ইসলাম মিয়া বিষয়টি গুরুত্ব না দিয়ে ফাইলটি রেখে দেন পাশে।
এরপর তিনি সরাসরি ফোন করেন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে। বিস্তারিত সব শোনার পর প্রধানমন্ত্রী বলেন—
“ওয়াজেদ সাহেবকে যেন কোনোভাবেই চাকরি থেকে অপসারণ করা না হয়।”শুধু তাই নয়, তিনি আরও নির্দেশ দেন—“ঐ সচিবকে বলে দিন, তিনি যেন তার নিজ দায়িত্বের কাজ মনোযোগ দিয়ে করেন। এর বাইরে অন্য কোনো বিষয়ে নাক গলালে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” একটি সাধারণ ফাইলের সিদ্ধান্ত হয়ে উঠেছিল নৈতিকতার মাপকাঠি। সেই মুহূর্তে বেগম খালেদা জিয়া দেখিয়েছিলেন—রাষ্ট্রনেতা হিসেবে তার দৃষ্টিভঙ্গি কতটা পরিপক্ব ও উদার।রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের স্বামী হয়েও তিনি ড. ওয়াজেদ মিয়ার পেশাগত মর্যাদা ও স্বাধীনতাকে অক্ষুণ্ণ রাখেন।
আজ যখন রাজনীতিতে সহিষ্ণুতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে, তখন এই ঘটনা আবারও স্মরণ করিয়ে দেয়—বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়ার মতো উদার মনোভাবের নেত্রীদের উপস্থিতি কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। উল্লেখ্য, ২০১৪ সালের ২২ নভেম্বর দৈনিক কালের কণ্ঠে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এই ঘটনাটি প্রথমবার প্রকাশ্যে আসে। প্রতিবেদনে বলা হয়, তৎকালীন সেই সচিব এখন আওয়ামী লীগের পক্ষে সক্রিয়ভাবে লেখালেখি করেন।
রাজনীতির ইতিহাসে এই ঘটনাটি আজও এক অনন্য উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত—
রাষ্ট্রনায়কত্বের চেয়ে বড় কোনো দলীয় পরিচয় নেই, আর প্রতিহিংসার ঊর্ধ্বে মানবিকতা সর্বশ্রেষ্ঠ গুণ।
Leave a Reply