থাইরয়েড: অদৃশ্য শত্রু, প্রতিদিনের লড়াই
নিজস্ব প্রতিবেদক
থাইরয়েড—শরীরের ছোট একটি গ্রন্থি। কিন্তু এর সামান্য অসামঞ্জস্য পুরো জীবনটাকেই ওলটপালট করে দিতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে থাইরয়েড রোগ সাধারণত দুই প্রকার হাইপোথাইরয়েডিজম ও হাইপারথাইরয়েডিজম। সমস্যা যতই গুরুতর হোক না কেন, এর কষ্ট বাইরে থেকে দৃশ্যমান নয়। অথচ ভেতর থেকে রোগী প্রতিদিন দারুণ এক যন্ত্রণার ভেতর দিয়ে যান।
অদৃশ্য উপসর্গ, অজানা যন্ত্রণা থাইরয়েড রোগীরা হঠাৎ হঠাৎ মুড সুইংয়ে ভোগেন, রাগান্বিত হয়ে পড়েন। শরীর থাকে প্রচণ্ড ক্লান্তিতে, কিন্তু ঘুম আসে না। অনেক সময় মাথা ঘোরানো, হাত-পা কাঁপা, চোখে অন্ধকার দেখা, শরীরে হুটহাট ব্যথা, ভুলে যাওয়া বা মনোযোগ হারানোর মতো উপসর্গ দেখা দেয়। কখনো ওজন বেড়ে যায়, কখনো আবার হঠাৎ কমে যায়।
চুল পড়া, ত্বক শুকিয়ে যাওয়া, ক্ষুধার তারতম্য—এসবকেই অনেকেই ভেবে নেন “নিজের যত্ন না নেওয়ার ফল।” আবার মানসিকভাবে হতাশা, মন খারাপ কিংবা বিষণ্নতা দেখা দিলে পরিবার-পরিজনরা অনেক সময় বিষয়টিকে ঢং বা বাড়াবাড়ি বলে উড়িয়ে দেন।
হরমোনাল ইম্ব্যালেন্সের প্রভাব বিশেষজ্ঞরা বলছেন, থাইরয়েড সমস্যার মূল কারণ হলো হরমোনাল ইম্ব্যালেন্স হাইপোথাইরয়েডিজমে মেটাবলিজম স্লো হয়ে যায়, ঘুমের চক্র ভেঙে পড়ে এবং মানসিক শক্তিও কমে আসে। অথচ আশপাশের মানুষরা ভাবেন, “হাঁটা-চলা, খাওয়া-দাওয়া সব ঠিক আছে, তাহলে কষ্ট কিসের?”
উন্নত বিশ্বে সচেতনতা, আমাদের সমাজে উদাসীনতা বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে থাইরয়েড রোগী থাকলে পরিবারের সদস্যদের কাউন্সেলিং করানো হয়। রোগীর সাথে কেমন আচরণ করলে তারা মানসিকভাবে সুস্থ থাকবেন, কী খেতে পারবেন বা কী খাওয়া উচিত নয়—এসব বিষয়ে পরিবারকে অবহিত করা হয়। কিন্তু আমাদের সমাজে এখনো এ নিয়ে সচেতনতার অভাব প্রকট। অনেক পরিবারেই থাইরয়েড রোগীর মানসিক পরিবর্তনকে “অলসতা” বা “অভিনয়” হিসেবে দেখা হয়। ফলে রোগীরা দ্বিগুণ কষ্টের ভেতর দিয়ে যান—একদিকে শারীরিক যন্ত্রণা, অন্যদিকে সামাজিক অবহেলা।
সচেতনতার বিকল্প নেই চিকিৎসকরা বলছেন, থাইরয়েড সমস্যা নিয়ন্ত্রণযোগ্য। তবে এজন্য নিয়মিত পরীক্ষা, সঠিক ওষুধ গ্রহণ, খাবারের প্রতি সচেতনতা এবং পরিবারের সহযোগিতা সবচেয়ে বেশি জরুরি। থাইরয়েড রোগীদের সহায়তায় পরিবার-পরিজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের ভূমিকা অপরিসীম। তাদের প্রতি সহানুভূতি, বোঝাপড়া এবং সহযোগিতাই একজন রোগীকে মানসিকভাবে শক্ত রাখে। থাইরয়েড কোনো ঢং নয়, কোনো অলসতাও নয়। এটি একটি বাস্তব ও জটিল স্বাস্থ্যসমস্যা। সচেতনতা ও সহমর্মিতাই পারে হাজারো রোগীর জীবনে স্বাভাবিকতার আলো ফিরিয়ে দিতে।
Leave a Reply