আল্লামা নূরউদ্দীন আহমদ গহরপুরী রহ.চলে যাওয়ার ২১ বছর—এক মহিমান্বিত আলোকপুরুষের অনুপস্থিতি
স্টাফ রিপোর্টার সিলেট
আজ তাঁর চলে যাওয়ার ২১ বছর। অথচ মনে হয় যেন খুব কাছের গতকালই তিনি ছিলেন—মাদ্রাসার বারান্দায় বসে ছাত্রদের দিকে স্নেহভরা চাহনি, মাঝে মাঝে মৃদু হাসি, আর গভীর ভাবনামগ্ন চোখে দুনিয়ার প্রতি নির্লিপ্ততা। কথা বলতেন ধীরে, নরম স্বরে; কিন্তু চিন্তা ও চরিত্রের দৃঢ়তায় ছিলেন অদম্য পাহাড়সম। তাঁর নাম আল্লামা নূরউদ্দীন আহমদ গহরপুরী রহ.—একজন আলোকিত মনীষী,একজন আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক, একজন নিবেদিতপ্রাণ আলেমে দ্বীন, যিনি তাঁর সারাটি জীবন কাটিয়েছেন জ্ঞানের পৃষ্ঠায়, মাদ্রাসার আঙিনায়, জনসেবার মাঠে এবং আধ্যাত্মিকতার নিভৃত আলোয়।
২০০৫ সালের ২৬ এপ্রিল বিকেল ৪টা ১০ মিনিটে যখন তিনি না-ফেরার দেশে চলে গেলেন, তখন সারা দেশজুড়ে যেন শোকের ধাক্কা নেমে এসেছিল। লক্ষ লক্ষ মানুষ তাঁর জনাজায় অংশ নেয়—এক গভীর ভালোবাসা আর শ্রদ্ধার বহ্নিশিখায় পরিণত হয় তাঁর বিদায়। আজ দুই দশকেরও বেশি সময় পরেও তিনি ভুলে যাওয়ার নন। তাঁর রেখে যাওয়া শিক্ষায়, মাদ্রাসাগুলোয়, তাঁর মুরিদদের চেতনায় এবং দেশের আলেমসমাজের স্মৃতির ভান্ডারে তিনি আজও জলজ্যান্ত উপস্থিত।
শৈশব: সিলেটের এক সম্ভ্রান্ত ঘরের শুরু
১৯২৪ সালের জুলাই। সিলেটের বালাগঞ্জ উপজেলার গহরপুর গ্রামের মোল্লাপাড়া। এ গ্রামেই জন্ম নেন নূরউদ্দীন আহমদ, যাকে পরবর্তী সময়ে ‘গহরপুরী’ উপাধি দিয়ে সম্মানিত করে মানুষ। জন্মের পর থেকেই তাঁর চারপাশে ছিল ধর্মীয় অনুপ্রেরণায় ভরপুর একটি পরিবেশ। তাঁর পিতা মাওলানা জহুরউদ্দীন রহ. ছিলেন তৎকালীন সিলেট অঞ্চলের একজন সুপরিচিত ও শ্রদ্ধেয় দ্বীনি ব্যক্তিত্ব।
অতি অল্প বয়সেই তিনি পিতাকে হারান। পিতার মৃত্যু তাঁর জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। তবে এই বিপর্যয়ই যেন তাঁর জন্য হয়ে ওঠে নতুন এক দিশার দরজা। তাঁর মা তাঁকে সোপর্দ করেন সিলেটের কিংবদন্তিতুল্য বুজুর্গ ওলি মাওলানা বশিরউদ্দীন শায়খে বাঘা রহ.-এর কাছে। সেখানেই তিনি গড়ে ওঠেন—শৈশবের কোমল বয়সে আধ্যাত্মিকতার স্নেহছায়ায়, কঠোর শৃঙ্খলা আর সুশিক্ষার অনুশীলনে।
শিক্ষাজীবন: বাঘা থেকে দেওবন্দ—এক মেধাবী শিক্ষার্থীর উত্থান
গহরপুরী রহ.-এর প্রথম পাঠশালা তাঁর পিতার কোলে। পরে বাঘা মাদ্রাসায় তাঁর মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা। কিন্তু তাঁর প্রকৃত শিক্ষার যাত্রা শুরু হয় যখন তিনি ভর্তি হন বিশ্বের অন্যতম সুপ্রাচীন ও সুপরিচিত দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান—দারুল উলুম দেওবন্দ।
দেওবন্দে তাঁর উত্থান ছিল বিস্ময়কর। ১৯৫০ সালে তাকমিল ফিল হাদিস বিভাগে তিনি সম্মিলিত মেধা তালিকায় প্রথম স্থান অর্জন করেন—যা সে সময় পুরো ভারত উপমহাদেশে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। মেধা, মনন, মনোযোগ—তিন ক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন অনন্য। এতেই থেমে থাকেননি। আরও এক বছর অধ্যয়ন করেন শায়খুল ইসলাম **মাওলানা হোসাইন আহমদ রহ.**সহ তৎকালীন বরেণ্য আলেমদের সান্নিধ্যে। অর্জন করেন হাদিস ও ফিকাহ শাস্ত্রে উচ্চতর ডিগ্রি।
শিক্ষক হিসেবে শুরু: বরিশাল থেকে ময়মনসিংহ
১৯৫২ সালে বরিশালের ঐতিহ্যবাহী পাঙ্গাসিয়া আলিয়া মাদ্রাসায় তিনি শায়খুল হাদিস পদে নিয়োগ পান। তখনো তাঁর বয়স কম, কিন্তু জ্ঞান, কর্মস্পৃহা এবং ব্যক্তিত্বের বলেই তিনি এ সম্মানজনক পদে আসীন হন—যা সে যুগে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গেই পাওয়া অত্যন্ত বিরল ঘটনা ছিল।
দুই বছর সেখানে কাটানোর পর তিনি যোগ দেন ময়মনসিংহের ঐতিহ্যবাহী বালিয়া মাদ্রাসায়। সেখানে প্রায় তিন বছর শিক্ষা-দীক্ষা প্রদান করেন, গড়ে তোলেন অসংখ্য আলেম, যাঁরা পরবর্তীতে দেশের বিভিন্ন মাদ্রাসায় জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দেন।
নিজ গ্রামে স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান: জামিয়া গহরপুর ১৯৫৭ সাল। নূরউদ্দীন আহমদ গহরপুরী রহ.-এর জীবনে এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। তিনি ফিরে এলেন নিজের গ্রামে, নিজের মাটিতে। প্রতিষ্ঠা করলেন গহরপুর হোসাইনিয়া মাদ্রাসা—যা আজ ‘জামিয়া গহরপুর’ নামে সিলেটসহ সারা দেশে সুপরিচিত।
তিনি এই প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা-প্রধান, মুহতামিম, শায়খুল হাদিস—সবই ছিলেন একসঙ্গে। মৃত্যুদিন পর্যন্ত এ দায়িত্ব পালন করেছেন নিষ্ঠা, ন্যায়, বিনয় এবং আত্মত্যাগ দিয়ে।
আজ দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা তাঁর ছাত্ররা সাক্ষ্য দেন—গহরপুরী রহ. শুধুই শিক্ষক ছিলেন না; তিনি ছিলেন দিকনির্দেশক, ছিলেন পিতৃসুলভ অভিভাবক, ছিলেন আধ্যাত্মিক রাহবার।
আধ্যাত্মিকতার যাত্রা: বাঘা থেকে রায়পুরী ১৯৬২ সালে তিনি খেলাফত লাভ করেন সিলেটের আরেক বরেণ্য ওলিয়ে কামিল মাওলানা হাবীবুর রহমান রায়পুরী রহ.-এর হাতে। তাঁর আধ্যাত্মিক শিক্ষা, তজকিয়া, ইরশাদ—সবকিছুই মানুষের অন্তরে স্পর্শ ফেলত। তাঁর হাতে বায়াত হয়ে অনেক মানুষ জীবনের পরিবর্তন খুঁজে পায়। তাঁর দরবারে ছিল না কোনো আড়ম্বর; ছিল বিনয়, সাদামাটা জীবনযাপন এবং আধ্যাত্মিক নীরবতা। তাঁর মুরিদদের কাছে তিনি ছিলেন একজন পথপ্রদর্শক, যিনি শিখিয়েছেন—ধর্ম মানে কেবল ইবাদত নয়; ধর্ম মানে চরিত্র, সহনশীলতা ও মানবতা।
জমিয়ত, বেফাক ও জাতীয় দায়িত্ব ১৯৬৮ সালে তিনি ‘ইসলামিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব পাকিস্তান’-এর আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলের অন্যতম সদস্য ছিলেন। ১৯৭০ সালে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন—যা তাঁর নেতৃত্বগুণের একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
১৯৯৬ সালে তিনি বাংলাদেশ কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড (বেফাক)-এর সভাপতি নির্বাচিত হন এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এ দায়িত্ব পালন করেন। এ সময়ে তিনি কওমি শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন, মাদ্রাসাগুলোর পাঠ্যক্রম বিন্যাস, দেশের আলেমদের ঐক্য সাধন—সবকিছুতেই অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।
তিনি ছিলেন ১৩টি মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা-পৃষ্ঠপোষক এবং অর্ধশতাধিক মাদ্রাসার কর্ণধার। দেশের সর্বত্র তাঁর প্রভাব বিস্তৃত ছিল—তবে কখনোই তা অহংকারে রূপ নেয়নি।
মানুষ হিসেবে তিনি কেমন ছিলেন?
অনেকেই বলেন—তাঁর মতো চরিত্রবান মানুষ খুব কম দেখা যায়।• তিনি সহজ-সরল জীবনযাপন করতেন।• খাবার, পোশাক, বসবাস—সবকিছুতে পরিমিতি ও সাদামাটা ছিল তাঁর পরিচয়।• রাগ করতেন না, কণ্ঠ উঁচু করতেন বিরলই।
• মানুষকে নিজে থেকে ভালোবাসতেন; কারও কষ্ট হলে নিজেও অস্থির হয়ে যেতেন। • কথায়-কথায় কাউকে হেয় করা তাঁর চরিত্রে ছিল না। একজন ছাত্র বলেছিলেন—
“আমরা যখন তাঁর সামনে বসতাম, মনে হতো যেন বরকত ছড়ানো কোনো ছায়ার নিচে বসেছি।”
দ্বীনি সেবার নানা অঙ্গনে নিরলস অবদান গহরপুরী রহ.-এর পুরো জীবনটাই ছিল সেবার। হাদিস শিক্ষা: তিনি ছিলেন শায়খুল হাদিস—হাদিসের গভীর ব্যাখ্যা, নির্ভুল বিশ্লেষণ এবং সহজবোধ্য উপস্থাপনায় তাঁর জুড়ি মেলা ভার। মাদ্রাসা পরিচালনা: তাঁর মাদ্রাসা পরিচালনার দক্ষতা ছিল নিখুঁত। তিনি নিয়মিত পাঠদান করেছেন; আবার প্রশাসনিক কাজও সামলেছেন সমান বিচক্ষণতায়। মাহফিল ও ওয়াজ: দেশজুড়ে তাঁর মাহফিলগুলোতে হাজারো মানুষ ভিড় জমাত। তাঁর বয়ানে ছিল মাধুর্য, কিন্তু সত্যনিষ্ঠা ছিল আরও প্রবল। ঐক্যের প্রচেষ্টা: দেশের আলেমসমাজকে একই প্ল্যাটফর্মে আনতে তিনি প্রদর্শন করেছেন অসাধারণ প্রজ্ঞা ও নেতৃত্ব।
বিদায়: লাখো মানুষের হাহাকার ২০০৫ সালের ২৬ এপ্রিল, বিকেল ৪টা ১০ মিনিট। সেদিন গহরপুরের বাতাস ছিল ভারী। মানুষ দলে দলে ছুটে আসে। রাস্তার দুই পাশে অসংখ্য মানুষের কান্না, বুকফাটা আহাজারি। কয়েক লাখ মানুষের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হয় তাঁর জানাজা—যা সে সময় সিলেটের ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ জানাজা হিসেবে বিবেচিত হয়।
তিনি শায়িত আছেন তাঁর প্রিয় মাদ্রাসার সামনে—যার জন্য তিনি সারাজীবন উৎসর্গ করেছিলেন। ২১ বছর পরেও তিনি অম্লান ২১ বছর পেরিয়ে গেছে—কিন্তু তাঁর স্মৃতি আজও সজীব।• তাঁর প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসাগুলো চলছে • তাঁর ছাত্ররা দেশ-বিদেশে দ্বীনের আলো বিলাচ্ছেন• তাঁর মুরিদরা আধ্যাত্মিকতায় বেড়ে উঠছেন • তাঁর বয়ানগুলো আজও মানুষের হৃদয়ে অনুরণিত হয় • তাঁর বিনয়, চরিত্র ও নেতৃত্ব আজও অনুকরণীয় তিনি ছিলেন এক আলোকময় মানুষ, যার আলো নিভে যায়নি—শুধু অন্য রূপে জ্বলছে।
আল্লামা নূরউদ্দীন আহমদ গহরপুরী রহ. ছিলেন এমন এক মহান বুজুর্গ, যাঁর জীবন আলোকবর্তিকার মতো। মানুষের জীবনে আলো ছড়ানোই ছিল যার মূল লক্ষ্য। তাঁর পুরো জীবনটাই ছিল ইলম, আমল, আধ্যাত্মিকতা, সেবা ও ত্যাগের সমন্বয়। আজ তাঁর চলে যাওয়ার ২১ বছর।
কিন্তু তিনি যে দুনিয়া রেখে গেছেন—তা তাঁরই আলোয় এখনো আলোকিত।
Leave a Reply