সুনামগঞ্জে ৪০০ কোটি টাকার প্রকল্পে কাজ কলমে আছে বাস্তবে উন্নয়ন নেই—দুর্নীতির ঘূর্ণাবর্তে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগ
ষ্টাফরিপোটারঃ
সুনামগঞ্জে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের ৪০০ কোটি টাকার একটি বিশেষ প্রকল্প বাস্তবায়নকে ঘিরে উঠেছে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ। কেন্দ্রীয় বাজেট থেকে শুরু করে স্থানীয় প্রশাসন—সব জায়গায় তুমুল আলোচনায় এখন এই প্রকল্পটি। আর অভিযোগের কেন্দ্রে আছেন সুনামগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ খালেদুল ইসলাম, যার বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ ইতোমধ্যেই পৌঁছেছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে।
প্রকল্পে ৪০০ কোটি টাকার ‘হাওয়া’—কোথায় গেল উন্নয়ন? প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে থাকা পুকুর/দিঘি/জলাশয় পানি সংরক্ষণ প্রকল্প—যার লক্ষ্য ছিল সুনামগঞ্জের জলাধার পুনঃখনন, পানি ধরে রাখা এবং জনস্বার্থে ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি। কিন্তু স্থানীয় মানুষের অভিযোগ—প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে বিপুল অর্থ, কিন্তু মাঠে দেখা যায়নি তেমন কোনো দৃশ্যমান উন্নয়ন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রকল্পের বিভিন্ন প্যাকেজে বরাদ্দ ছিল প্রায় ৪০০ কোটি টাকা। এই বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও অধিকাংশ জায়গায় দিঘি–পুকুর আগের অবস্থায় রয়ে গেছে। কোথাও কোথাও নামমাত্র মাটি কাটার কাজ হলেও তা টেকসই হয়নি।
স্থানীয়দের ভাষায়—পুকুরে খনন তো দূরের কথা—মনে হয় কেউ শুধু নামমাত্র কাঁচি বসিয়েছে, আর বিল উঠেছে কোটি কোটি টাকা।”
ক্ষমতার ছায়ায় ‘প্রভাবশালী সিন্ডিকেট’অভিযোগ বলছে, সুনামগঞ্জে যোগদান করার পর থেকেই নির্বাহী প্রকৌশলী খালেদুল ইসলাম একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট তৈরি করেন। স্থানীয় ঠিকাদারদের বাদ দিয়ে নিজের পছন্দের একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে কাজ পাইয়ে দিতে শুরু করেন তিনি।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ২০১৭ সালে তৎকালীন এমপি নজরুল ইসলাম বাবু–র সুপারিশে তিনি জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে যোগ দেন। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ২৩ মে তিনি সুনামগঞ্জে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব নেন। এ সময় থেকেই তিনি সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক–এর রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে বিভিন্ন কাজ বণ্টন করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে।
৬৫ কোটি টাকার কাজ পেল ‘মেসার্স আদেল এন্টারপ্রাইজ’! অভিযোগে আরও বলা হয়েছে—একই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স আদেল এন্টারপ্রাইজ পেয়েছে প্রায় ৬৫ কোটি টাকার কাজ। স্থানীয় ঠিকাদাররা বলছেন,“টেন্ডারের আগেই ঠিক হয়ে যায় কে কোন কাজ পাবে। টেন্ডার শুধু কাগজে-কলমে হয়।”
ঠিকাদারদের অভিযোগ—চাইলে যোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ পেত, কিন্তু সিন্ডিকেটের বাইরে থাকা কাউকে সুযোগ দেয়া হয়নি। প্রতিপক্ষ ঠিকাদারকে ভয় দেখাতে ‘মিথ্যা মামলা’?
অভিযোগে একটি ভয়াবহ তথ্য উঠে এসেছে—
এক ঠিকাদার মো. উজ্জ্বল মিয়া–কে নাকি পরিকল্পিতভাবে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয় এবং গ্রেফতার পর্যন্ত করানো হয়। যাতে তিনি টেন্ডারে অংশ নিতে বা সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলতে না পারেন।
স্থানীয়দের প্রশ্ন—“সরকারি প্রকল্পের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণে যদি মামলা–হামলার ভয় থাকে, তবে সৎ ঠিকাদাররা কাজ করবে কীভাবে?”চিঠি গেছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এই সব অনিয়ম, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার—সব মিলিয়ে স্থানীয় নাগরিক, ঠিকাদার, জনপ্রতিনিধিরা ইতোমধ্যেই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ পাঠিয়েছেন। অভিযোগে সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ আছে— প্রকল্পে অর্থ আত্মসাৎ, নিয়মবহির্ভূত দরপত্র গ্রহণ, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে কাজ বণ্টন, প্রতিপক্ষকে হয়রানি, মাঠপর্যায়ে কাজের কোনো অগ্রগতি নেই একাধিক সূত্র বলছে—যাচাই–বাছাইয়ের জন্য বিষয়টি ইতোমধ্যেই সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নজরে এসেছে।
উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন নেই—ক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষ
প্রকল্পটি যেসব জলাশয়, দিঘি, পুকুরে বাস্তবায়ন হওয়ার কথা ছিল, সেখানে গিয়ে দেখা যায় পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা নেই, নেই খননের ছাপও। বর্ষায় পানি নামলেও শুকনো মৌসুমে জলাশয়গুলো ফেটে যাচ্ছে।
কৃষকরা বলছেন—যেখানে সামান্য খনন হলেই পানি থাকবে, সেখানে কোটি টাকা খরচ করেও কিছুই হয়নি। প্রধান প্রকৌশলীর অবস্থান
বিষয়টি জানতে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী তোষার মোহন সাধু খাঁ–র সাথে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন—কেউ যদি অনিয়ম বা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত থাকে, তার বিরুদ্ধে যথাযথ বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কোনো অভিযোগ তদন্ত ছাড়া উপেক্ষা করা হবে না। এদিকে অভিযোগ বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী খালেদুল ইসলামকে মেসেজ পাঠানো হলেও তিনি কোনো উত্তর দেননি। জনগণের প্রশ্ন—৪০০ কোটি টাকা গেল কোথায়?
সুনামগঞ্জবাসীর একটাই দাবি—স্বচ্ছ তদন্ত হোক, দায়ীদের শাস্তি হোক।”কারণ এ প্রকল্পের টাকা ছিল জনগণের, উন্নয়ন হওয়ার কথা ছিল জনস্বার্থে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগের পাহাড় জমলেও মাঠে উন্নয়নের ছিটেফোঁটাও নেই।
সুনামগঞ্জের এই ৪০০ কোটি টাকার প্রকল্পকে ঘিরে যে ভয়াবহ দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে, তা শুধু একটি জেলার নয়—সারা দেশের উন্নয়ন কাঠামোর জন্য বড় প্রশ্নচিহ্ন। সরকারি অর্থ যদি সিন্ডিকেটভিত্তিক ভাগ-বাটোয়ারার শিকার হয়, তবে দেশের উন্নয়ন থমকে যাবে—ক্ষতিগ্রস্ত হবে জনগণই।
সুনির্দিষ্ট, স্বচ্ছ এবং নিরপেক্ষ তদন্তই এখন একমাত্র দাবি—কাগজে–কলমে নয়, মাঠে উন্নয়ন দেখতে চায় সুনামগঞ্জবাসী।
Leave a Reply