ব্রেকিং নিউজ
সুনামগঞ্জের ডিসিসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে ইসিতে অভিযোগ
স্টাফ রিপোর্টার:
সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক (ডিসি) ড. মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়াসহ জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ এনে নির্বাচন কমিশনে (ইসি) লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন পরিবেশকর্মী খোরশেদ আলম। অভিযোগে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন—আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যদি বর্তমান জেলা প্রশাসক ও তাঁর নেতৃত্বাধীন জেলা-উপজেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠিত হয়, তবে নির্বাচনটির নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতা প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
অভিযোগপত্রে জেলা প্রশাসক ড. ইলিয়াস মিয়া ছাড়াও তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মেহেদী হাসান মানিক এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি) শাহরুখ আলম শান্তনুর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগকারীর দাবি, এসব কর্মকর্তা দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার অপব্যবহার করে বিভিন্ন অনিয়মে জড়িত এবং রাজনৈতিকভাবে পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ করছেন। খোরশেদ আলমের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁদের কার্যক্রমের অন্যতম দিক হলো ‘ফ্যাসিস্টদের পুনর্বাসন’, যা চলমান গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও আইনের শাসনের পরিপন্থী।
অভিযোগে আরও বলা হয়, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় সংঘটিত একটি হত্যা মামলার পলাতক আসামি ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেতা শাহ রুবেলকে নাগালে পেয়েও পুলিশে সোপর্দ করা হয়নি। বরং হাইকোর্টের রায় অমান্য করে এবং প্রচলিত বিধি লঙ্ঘনের মাধ্যমে তাঁর নামে সরকারি বালুমহালের ইজারা বাস্তবায়ন করা হয়েছে। অভিযোগকারীর মতে, এ ধরনের সিদ্ধান্ত জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের আত্মার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার শামিল।
অভিযোগপত্রে উল্লিখিত বিষয়গুলো অনুসন্ধানে যাদুকাটা নদীর ২ নম্বর বালুমহাল ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়ায় গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ তোলা হয়েছে। এতে বলা হয়, প্রশাসনিকভাবে ঘোষিত হত্যামামলার আসামি শাহ রুবেলকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছে এবং বালুমহালের ইজারা হস্তান্তর-সংক্রান্ত সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আড়াল করা হয়েছে। থানা পুলিশের বিবৃতিতে রুবেলকে পলাতক আসামি হিসেবে উল্লেখ করা হলেও কীভাবে তিনি সরকারি বালুমহালের ইজারা পেলেন এবং জেনেশুনে কেন তাঁকে আইনের হাতে তুলে দেওয়া হয়নি—এমন প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারী।
ইজারা হস্তান্তর প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়েও অভিযোগপত্রে বিস্তারিত প্রশ্ন তোলা হয়েছে। খোরশেদ আলমের দাবি, স্থানীয় একাধিক প্রভাবশালী রাজনীতিবিদের ছত্রছায়ায় রুবেল বালুমহালের ইজারা প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন। ইজারা হস্তান্তর-সংক্রান্ত সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে বালুমহালটি রুবেলের কাছে ‘হস্তান্তর করা হয়েছে’ বলে উল্লেখ থাকলেও গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন এবং বালুমহাল হস্তান্তরের সময় উপস্থিত ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, হস্তান্তরের দিন ঘটনাস্থলে রুবেল উপস্থিত ছিলেন না। তাঁর পরিবর্তে নাসির মিয়া নামের স্থানীয় এক ব্যক্তির কাছে বালুমহাল হস্তান্তর করা হয়। অথচ এ সংক্রান্ত কোনো বৈধ নথি বা অনুমোদনের কাগজ সংযোজন করা হয়নি বলে অভিযোগ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, শাহ রুবেলকে আড়ালে নিরাপদে রাখতে এবং তাঁর আইনি জটিলতা এড়াতে সরকারি নথিতে তথ্য বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হয়েছে। এতে করে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে জনমনে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে বালুমহাল ইজারা ব্যবস্থাপনায় একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে বলেও অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়।
অভিযোগকারী আরও দাবি করেন, নির্বাচনের আগে দেশের বিভিন্ন জেলায় জেলা প্রশাসক, ইউএনও ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) পর্যায়ে একাধিক বদলি হলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ‘অদৃশ্য শক্তির ইশারায়’ বহাল তবিয়তে রয়েছেন। এ কারণে তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। এ নিয়ে একটি রাজনৈতিক দলের পক্ষে প্রশাসনের একটি অংশ সক্রিয়ভাবে কাজ করছে—এমন গুঞ্জন স্থানীয় পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
খোরশেদ আলম বলেন, ‘এ ধরনের কর্মকর্তাদের দ্বারা বহুল আকাঙ্ক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কোনোভাবেই নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।’ তিনি নির্বাচন কমিশনের কাছে অবিলম্বে অভিযোগগুলো তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়, আদালতের নির্দেশ অমান্য করে যাদুকাটা নদীসহ বিভিন্ন এলাকায় বেপরোয়া বালু উত্তোলন চলছে। এতে পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে এবং স্থানীয় জনগণের জীবন-জীবিকা হুমকির মুখে পড়ছে। স্থানীয় বাসিন্দা, রাজনৈতিক নেতা ও শ্রমিকদের অভিযোগ, অবৈধ সুবিধা প্রাপ্তির বিনিময়ে জেলা প্রশাসনের একটি অংশ বালু সিন্ডিকেটকে সহায়তা দিচ্ছে। এর ফলে নদীভাঙন বেড়েছে, কৃষিজমি ও বসতবাড়ি ঝুঁকিতে পড়েছে।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক ড. ইলিয়াস মিয়া বলেন, ‘সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে শাহ রুবেল বালুমহালের ইজারা পেয়েছেন।’ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের হত্যা মামলার একজন এজাহারভুক্ত আসামি হওয়া এক্ষেত্রে বিবেচ্য কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এখানে এসব নিয়ে কোনো সমস্যা নেই।’ জেলা প্রশাসকের ভাষ্য, ‘রুবেল কি আপনাদের কাছে আপত্তি জানিয়েছে এ ব্যাপারে? সেটি না হলে আপনাদের সমস্যা কী?’
অভিযোগকারীর উত্থাপিত বিষয়গুলো নিয়ে নির্বাচন কমিশন কী পদক্ষেপ নেয়, তা এখন দেখার বিষয়। স্থানীয়ভাবে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা চলছে। সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, নির্বাচন ও প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রশাসনের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা না গেলে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও পরিবেশ—দুটিই মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
Leave a Reply